২০ বছর আগে চুরি হওয়া চিত্রকর্ম খুঁজে দিল এআই, রং বদলেও শেষরক্ষা হয়নি
২০০৪ সালে ইতালির সুলমোনার একটি গির্জা থেকে চুরি হওয়া ১৭ শতকের ‘সেইন্ট অ্যাগনেস’ চিত্রকর্মটি রং চাপিয়ে বদলে ফেলা হয়েছিল। তবু কারাবিনিয়েরির এআই ব্যবস্থা ‘সোয়াডস’ কয়েক ঘণ্টায় সেটি শনাক্ত করে।
প্রায় দুই দশক আগে ইতালির একটি ছোট গির্জা থেকে চুরি হয়ে যাওয়া ১৭ শতকের একটি চিত্রকর্ম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায় উদ্ধার করেছে দেশটির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষা পুলিশ। চোরেরা ছবিটির ওপর নতুন রং চাপিয়ে এর ধর্মীয় চিহ্নগুলো মুছে দিয়েছিল, যাতে কেউ চিনতে না পারে। তবু পুলিশের এআই ব্যবস্থা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেটিকে চুরি যাওয়া শিল্পকর্ম হিসেবে শনাক্ত করে। চলতি সপ্তাহে বিবিসিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ঘটনাটির বিস্তারিত উঠে এসেছে।
গির্জা থেকে চুরি, ২০ বছর পর মেলায় খোঁজ
প্রায় এক মিটার উঁচু চিত্রকর্মটির বিষয় খ্রিষ্টান সাধ্বী সেইন্ট অ্যাগনেস (ইতালীয় ভাষায় সান্ত’আনিয়েজে)। মূল ছবিতে তাঁর হাতে ছিল একটি ছোট সাদা মেষশাবক ও খেজুরপাতা, মাথার চারপাশে ছিল জ্যোতির্বলয়। ২০০৪ সালের ১১ আগস্ট রাতে মধ্য ইতালির আব্রুৎসো অঞ্চলের সুলমোনা শহরের ‘ভির্গো পোতেন্স’ গির্জা থেকে ছবিটি চুরি হয়।
২০২৪ সালের অক্টোবরে উত্তর ইতালির পারমা শহরে বার্ষিক এক অ্যান্টিক মেলায় নিয়মিত তদারকির অংশ হিসেবে প্রদর্শিত শিল্পকর্মগুলোর ছবি তুলে ডেটাবেইসে আপলোড করছিলেন কারাবিনিয়েরির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষা কমান্ডের (টিপিসি) সদস্যরা। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই সিস্টেম একটি ছবিকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করে। এতে দেখা যাচ্ছিল, এক তরুণী হাতে একটি কাগজের স্ক্রল ধরে আছেন। পরদিনই ছবিটি জব্দ করে বিশেষজ্ঞ পরীক্ষায় পাঠানো হয়।
মেষশাবক হয়ে গিয়েছিল কাগজের স্ক্রল
পরীক্ষায় দেখা যায়, চোরেরা মেষশাবকটির ওপর রং চাপিয়ে সেটিকে স্ক্রলের মতো করে তুলেছিল। জ্যোতির্বলয় ও খেজুরপাতাও মুছে ফেলা হয়েছিল। ফলে ধর্মীয় চিত্রকর্মটি দেখতে সাধারণ এক তরুণীর প্রতিকৃতির মতো হয়ে যায়। তদন্তকারীরা নিশ্চিত হন, এটিই সুলমোনার গির্জা থেকে হারিয়ে যাওয়া সেই ছবি।
বিবিসিকে দেওয়া বক্তব্যে টিপিসির কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল সালভাতোরে রাপিকাভোলি বলেন, ছবিটিতে ‘কিছু একটা গরমিল ছিল’। পরে ২০২৫ সালের ২০ মে চিত্রকর্মটি গির্জার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। সংস্কারের পর সেটি আবার আগের জায়গায় স্থাপন করার কথা। তবে চুরির পর দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ায় এ ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আর নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যেভাবে কাজ করে ‘সোয়াডস’
ছবিটি শনাক্ত করা এআই ব্যবস্থার নাম ‘স্টোলেন ওয়ার্কস অব আর্ট ডিটেকশন সিস্টেম’, সংক্ষেপে সোয়াডস। ২০২০ সালে এর পরিকল্পনা শুরু হয় এবং ২০২৩ সালের নভেম্বরে এটি চালু হয়। ব্যবস্থাটি কোনো শিল্পকর্মের রং, রেখা ও গঠনবিন্যাসের মতো দৃশ্যগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে ১৯৬৯ সাল থেকে সংরক্ষিত চুরি যাওয়া সাংস্কৃতিক সম্পদের ডেটাবেইসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। এই ডেটাবেইসে ১০ লাখের বেশি বস্তুর তথ্য রয়েছে, যদিও সবগুলোর ছবি নেই।
শুধু মেলা বা প্রদর্শনী নয়, নিলামঘর ও বাণিজ্যিক ওয়েবসাইটের ছবিও স্ক্যান করে সোয়াডস। ইউনিটটির নিজস্ব হিসাবে, এর সহায়তায় এ পর্যন্ত ৩০০টির বেশি বড় চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্য এবং মুদ্রা, পাণ্ডুলিপি, ধর্মীয় নিদর্শনসহ ১ লাখ ৬৫ হাজারের বেশি ছোট বস্তু উদ্ধার হয়েছে, যার মোট মূল্য ২০ কোটি ৩০ লাখ ইউরোর বেশি। রাপিকাভোলির ভাষায়, ‘যন্ত্র কখনো ক্লান্ত হয় না’।
সীমাবদ্ধতাও আছে
বিশেষজ্ঞরা অবশ্য মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এআইয়ের দেওয়া মিল কেবল তদন্তের একটি সূত্র, চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। পুরোনো রেকর্ড অসম্পূর্ণ থাকতে পারে, আবার মূল কাজ ও তার অনুলিপির পার্থক্য সব সময় যন্ত্র ধরতে পারে না। তাই প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ যাচাই ও আইনি প্রক্রিয়া অপরিহার্য। এদিকে চলতি বছর তুরিনেও ১৯৭২ সালে চুরি হওয়া চিত্রশিল্পী ফিলিপ্পো পালিৎসির একটি ছবি নিলামঘরের ওয়েবসাইটে এআই স্ক্যানের মাধ্যমে শনাক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
ইতালির কারাবিনিয়েরির শিল্প সুরক্ষা ইউনিট ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত, যা বিশ্বে এ ধরনের প্রথম বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট হিসেবে পরিচিত। প্রযুক্তির সহায়তায় হারানো ঐতিহ্য উদ্ধারের এই উদাহরণ অন্যান্য দেশের জন্যও দৃষ্টান্ত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, দুনিয়া নিউজ, প্রথম আলো





মন্তব্য (০)