মজুরি আন্দোলনের চতুর্থ দিনেও বন্ধ প্রায় ৫০০ পোশাক কারখানা
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে টানা চতুর্থ দিনের মতো বিক্ষোভ করেছেন পোশাকশ্রমিকেরা। মঙ্গলবার গাজীপুর ও আশুলিয়ায় প্রায় ৫০০ কারখানা বন্ধ ছিল।
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে টানা চতুর্থ দিনের মতো রাস্তায় ছিলেন তৈরি পোশাকশ্রমিকেরা। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া ও রাজধানীর মিরপুরে সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ এবং পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর এক সহসভাপতির হিসাবে, এদিন গাজীপুর ও আশুলিয়ায় প্রায় ৫০০ কারখানা বন্ধ ছিল। গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) এ আন্দোলন শুরু হয়।
কারখানা বন্ধের চিত্র
বিজিএমইএর ওই নেতা জানান, আগের দিনের তুলনায় পরিস্থিতি কিছুটা ভালো, তবে বন্ধ কারখানার সংখ্যা ৫০০ ছাড়াতে পারে। সোমবার (২ নভেম্বর) বিভিন্ন হিসাবে ৬০০ থেকে প্রায় ৭০০ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল বলে শিল্পসংশ্লিষ্টরা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে মঙ্গলবার প্রায় ৭০টি কারখানা ছুটি ঘোষণা করে।
আন্দোলনের প্রথম দিকেই সাভার-আশুলিয়ায় ১৭৭টি এবং গাজীপুরে শতাধিক কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছিল বলে শিল্প পুলিশ জানিয়েছিল। মালিকপক্ষ সতর্ক করেছে, অস্থিরতা দীর্ঘ হলে রপ্তানি চালান পিছিয়ে যেতে পারে এবং বিদেশি ক্রেতাদের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা কঠিন হবে।
মিরপুরে মেট্রোর দুই স্টেশনে বিরতি বন্ধ
মঙ্গলবার সকালে মিরপুরে শ্রমিকেরা সড়ক অবরোধ করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। নিরাপত্তার কারণে মিরপুর-১০ ও মিরপুর-১১ মেট্রো স্টেশনে ট্রেন থামানো সাময়িক বন্ধ রাখা হয়, তবে উত্তরা-মতিঝিল রুটে ট্রেন চলাচল অব্যাহত ছিল। মিরপুর-১১ স্টেশনের নিচে ফেলে রাখা কাঠ-বাঁশে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
আশুলিয়ায় বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধের সময় পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে বলে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলো জানিয়েছে। গাজীপুরে কয়েকটি স্থানে শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাঁদের সরিয়ে দেয় বলে জানিয়েছেন গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন।
গ্রেপ্তার, আহত ও বিজিবি মোতায়েন
বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্যমতে, আন্দোলন শুরুর পর থেকে অন্তত ৫৮ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন; আহত শ্রমিকদের সংখ্যা জানা যায়নি। গ্রেপ্তারের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে—এএফপি অন্তত ৫৭ জনের কথা বললেও দেশীয় কিছু গণমাধ্যম মঙ্গলবার পর্যন্ত এ সংখ্যা শতাধিক বলে জানিয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০ প্লাটুন গাজীপুরের সফিপুর, কালিয়াকৈর ও কোনাবাড়ীতে এবং দুই প্লাটুন নারায়ণগঞ্জের চাষাড়ায় দায়িত্ব পালন করছে। ড্রোন ও বডি ক্যামেরা দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে বিজিবি জানিয়েছে।
মজুরি বোর্ড গঠনের পরও থামেনি আন্দোলন
শ্রমিকদের দাবির মুখে রোববার (১ নভেম্বর) পোশাক খাতের ন্যূনতম মজুরি পর্যালোচনায় ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার। মালিক, শ্রমিক ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত এই বোর্ড বিদ্যমান কাঠামো পর্যালোচনা করে নতুন ন্যূনতম মজুরির সুপারিশ করবে। তবে বোর্ড গঠনের পরও আন্দোলন থামেনি। শ্রমিকনেতারা বলছেন, মজুরির পাশাপাশি অন্যান্য অমীমাংসিত দাবিও এর পেছনে রয়েছে।
বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা, যা ২০২৩ সালের আন্দোলনের পর নির্ধারিত হয়েছিল। শ্রমিকেরা বলছেন, চাল-ডাল, রান্নার গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায় এই আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে মালিকপক্ষ বাড়তি পরিচালন ব্যয়, জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা ও প্রধান রপ্তানি বাজারে চাহিদা কমার কথা তুলে ধরছে।
চীনের পর বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন এই খাতে, আর দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে পোশাক থেকে। এমন সময়ে এই অস্থিরতা দেখা দিল, যখন বিদেশি ক্রেতাদের বসন্ত-গ্রীষ্ম মৌসুমের রপ্তানি আদেশের উৎপাদন চলছে।
তথ্যসূত্র: এএফপি, রয়টার্স/ডন, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর, ডেইলি ওয়াদা


মন্তব্য (০)