আয়কর

টিআইএন নেওয়ার পর রিটার্ন না দিলেই বিপদ? জরিমানা এড়াতে করদাতাদের যা জানা জরুরি

বাংলাদেশে ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিআইএন) বা ই-টিআইএন নেওয়ার পর আয়কর রিটার্ন দাখিলের নিয়ম নিয়ে করদাতাদের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে যাঁরা কয়েক বছর আগে টিআইএন নিয়েছেন, কিন্তু বর্তমানে আয় করছেন না কিংবা তাঁদের আয় করমুক্ত সীমার নিচে, তাঁদের অনেকেই মনে করেন রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। আয়কর আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে করযোগ্য আয় না থাকলেও রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নামে প্রচারিত একটি সচেতনতামূলক পোস্টারে টিআইএনধারীদের সময়মতো রিটার্ন দাখিলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেখানে রিটার্ন জমা না দিলে জরিমানার আশঙ্কা এবং শূন্য রিটার্ন দাখিলের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। তবে পোস্টারে উল্লেখ করা জরিমানার অঙ্ক ও নতুন নিয়ম কার্যকরের তারিখ যাচাই ছাড়া নিশ্চিত সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়।

করদাতাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, টিআইএন থাকলেই প্রত্যেক ব্যক্তিকে আয়কর দিতে হবে—এমন নয়; তবে আইন অনুযায়ী রিটার্ন দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলে তা উপেক্ষা করা যাবে না। তাই জরিমানা ও ভবিষ্যৎ কর-সংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে নিজের অবস্থান বুঝে সময়মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

টিআইএন থাকলে কখন আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হয়?

আয়কর রিটার্ন হলো করদাতার আয়, সম্পদ, দায়, বিনিয়োগ এবং প্রযোজ্য অন্যান্য আর্থিক তথ্যের আনুষ্ঠানিক বিবরণ। এর মাধ্যমে কর কর্তৃপক্ষ করদাতার আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য পায় এবং প্রযোজ্য কর নির্ধারণ করতে পারে।

বাংলাদেশে আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হয়। শুধু আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকার কারণে সব ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায় না।

যেসব ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • নির্ধারিত করমুক্ত সীমার বেশি করযোগ্য আয় থাকা।

  • আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট পেশা, পদ বা শ্রেণির করদাতা হওয়া।

  • সরকারি চাকরি বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকা।

  • নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণ, লেনদেন বা আইনগত কাজে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ প্রয়োজন হওয়া।

  • পূর্ববর্তী করবর্ষের কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণ না করা।

তবে সব টিআইএনধারীর ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। ব্যক্তির আয়, পেশা, টিআইএন নেওয়ার কারণ এবং প্রযোজ্য আইনি বিধান বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

আয় না থাকলেও কি রিটার্ন দিতে হবে?

টিআইএনধারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি দেখা যায় এই বিষয়টি নিয়ে। অনেকেই মনে করেন, কোনো আয় না থাকলে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু আইন অনুযায়ী যাঁদের রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক, তাঁদের ক্ষেত্রে আয় না থাকলেও রিটার্ন দিতে হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে ‘শূন্য রিটার্ন’ কথাটির অর্থও বুঝতে হবে। কোনো ব্যক্তির করযোগ্য আয় বা প্রদেয় কর না থাকলে তাঁর প্রকৃত আর্থিক তথ্যের ভিত্তিতে রিটার্ন প্রস্তুত করা যায়। কিন্তু আয়, সম্পদ ও ব্যয়ের তথ্য যাচাই না করে সব ঘরে শূন্য বসিয়ে দেওয়া সঠিক পদ্ধতি নয়।

উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তি কয়েক বছর আগে ব্যাংকঋণ বা অন্য কোনো প্রয়োজনীয় কাজে টিআইএন নিয়েছিলেন। বর্তমানে তাঁর নিয়মিত আয় নেই। এমন পরিস্থিতিতে তাঁকে রিটার্ন দিতে হবে কি না, তা নির্ভর করবে তাঁর বর্তমান অবস্থা এবং প্রযোজ্য আইনি বিধানের ওপর। শুধু আয় নেই—এই যুক্তিতে রিটার্নের বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা করা উচিত নয়।

রিটার্ন দাখিল না করলে জরিমানার ঝুঁকি কতটা?

আয়কর রিটার্ন দাখিলের আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা না দিলে সংশ্লিষ্ট করদাতার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এতে জরিমানা আরোপের পাশাপাশি কর-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬৬-এ রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতার জন্য জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট করদাতার পরিস্থিতি, প্রযোজ্য বিধান এবং আইনে নির্ধারিত শর্ত বিবেচনা করা হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত পোস্টারে প্রতি বছরের জন্য ৫ হাজার টাকা জরিমানা এবং ২০২২ সালে টিআইএন নেওয়া ব্যক্তির তিন বছরে ১৫ হাজার টাকা জরিমানার উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই অঙ্ককে সব করদাতার জন্য প্রযোজ্য নির্দিষ্ট জরিমানা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। এ বিষয়ে এনবিআরের প্রামাণিক নির্দেশনা ও আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা যাচাই করা প্রয়োজন।

মনে রাখতে হবে, জরিমানা এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হলো নিজের রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা যাচাই করা এবং প্রযোজ্য সময়সীমার মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।

এনবিআরের চিঠি আসার আগেই রিটার্ন জমা দেওয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ?

অনেক করদাতা মনে করেন, এনবিআর থেকে চিঠি বা নোটিশ না পাওয়া পর্যন্ত রিটার্ন জমা না দিলেও সমস্যা হবে না। কিন্তু রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকলে শুধু নোটিশের অপেক্ষা করা নিরাপদ সিদ্ধান্ত নয়।

আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল করতে হলে করদাতাকে নিজ দায়িত্বেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। নোটিশ না পাওয়া মানেই রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা নেই—এমন ধারণা সঠিক নয়।

তাই যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে রিটার্ন জমা দেননি, তাঁদের উচিত প্রথমে কোন কোন করবর্ষের রিটার্ন দেওয়া প্রয়োজন, তা যাচাই করা। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল বা অভিজ্ঞ কর পরামর্শকের সহায়তা নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা যেতে পারে।

অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের নিয়ম

বর্তমানে এনবিআরের ই-রিটার্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করা যায়। অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আর্থিক তথ্য প্রস্তুত রাখা ভালো।

রিটার্ন দাখিলের সাধারণ ধাপগুলো হলো—

প্রথম ধাপ: ই-রিটার্ন পোর্টালে প্রবেশ। এনবিআরের সরকারি ওয়েবসাইট etaxnbr.gov.bd ব্যবহার করে রিটার্ন দাখিলের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।

দ্বিতীয় ধাপ: নিবন্ধন ও লগইন। প্রয়োজনীয় পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য দিয়ে অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে হবে। পোর্টালের নির্দেশনা অনুযায়ী টিআইএন ও অন্যান্য তথ্য প্রস্তুত রাখতে হবে।

তৃতীয় ধাপ: আর্থিক তথ্য পূরণ। বেতন, ব্যবসা, বাড়িভাড়া, বিনিয়োগসহ প্রযোজ্য আয়ের বিবরণ, সম্পদ, দায় এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য সঠিকভাবে উল্লেখ করতে হবে।

চতুর্থ ধাপ: তথ্য যাচাই। রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে সব তথ্য ও হিসাব পুনরায় পরীক্ষা করতে হবে। কোনো তথ্য ভুল থাকলে তা সংশোধন করা জরুরি।

পঞ্চম ধাপ: রিটার্ন জমা ও প্রমাণ সংরক্ষণ। রিটার্ন দাখিল সম্পন্ন হলে প্রাপ্তি স্বীকারপত্র বা পোর্টালে পাওয়া সংশ্লিষ্ট প্রমাণপত্র সংরক্ষণ করতে হবে।

উল্লেখ্য, অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা, ছাড় এবং বিকল্প পদ্ধতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট করবর্ষের সর্বশেষ এনবিআর নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।

পুরোনো টিআইএনধারীদের এখন কী করা উচিত?

যাঁরা আগে টিআইএন নিয়েছেন, কিন্তু নিয়মিত রিটার্ন জমা দেননি, তাঁদের বিষয়টি অবহেলা না করে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

1. টিআইএন নেওয়ার কারণ পর্যালোচনা করুন: ব্যাংকঋণ, সম্পত্তি, ব্যবসা, চাকরি বা অন্য কোনো প্রয়োজনে টিআইএন নেওয়া হয়েছিল কি না, তা বিবেচনা করুন।

2. রিটার্নের বাধ্যবাধকতা যাচাই করুন: বর্তমান আয়, পেশা ও অন্যান্য পরিস্থিতির ভিত্তিতে রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক কি না, তা নিশ্চিত হোন।

3. বকেয়া করবর্ষ সম্পর্কে জানুন: আগের কোনো বছরের রিটার্ন বাকি থাকলে সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নিয়ে করণীয় নির্ধারণ করুন।

4. সঠিক তথ্য দিয়ে রিটার্ন প্রস্তুত করুন: আয় না থাকলেও প্রয়োজনীয় তথ্য গোপন না করে প্রকৃত আর্থিক অবস্থা তুলে ধরুন।

5. টিআইএন বাতিলের যোগ্যতা যাচাই করুন: টিআইএন আর প্রয়োজন না হলে এবং আইন অনুযায়ী যোগ্যতা থাকলে নিবন্ধন বাতিলের আবেদন করা যায় কি না, তা যাচাই করুন। তবে টিআইএন বাতিলের আবেদন করলেই আগের সব কর-সংক্রান্ত দায় শেষ হয়ে যায় না।

আগস্ট ২০২৬ থেকে নতুন নিয়ম কার্যকর—দাবিটি কতটা নিশ্চিত?

প্রচারিত পোস্টারে বলা হয়েছে, নতুন নিয়ম আগস্ট ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে। পাশাপাশি শূন্য রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা এবং নির্দিষ্ট অঙ্কের জরিমানার কথাও উল্লেখ রয়েছে।

তবে পোস্টারের এই নির্দিষ্ট তারিখ ও জরিমানার অঙ্কের পক্ষে স্বতন্ত্র সরকারি প্রজ্ঞাপন এখানে নিশ্চিত করা যায়নি। তাই এ তথ্যগুলো প্রকাশের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। এনবিআরের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নির্দেশনা, প্রজ্ঞাপন এবং আয়কর আইন, ২০২৩-এর সংশ্লিষ্ট বিধান মিলিয়ে দেখেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

করদাতাদের মনে রাখতে হবে, প্রচারমূলক পোস্টার সচেতনতা তৈরিতে সহায়ক হলেও সেটিই সব ক্ষেত্রে আইনের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা নয়।

শেষ কথা

টিআইএন নেওয়ার পর আয়কর রিটার্ন দাখিলের বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে যাঁরা দীর্ঘদিন রিটার্ন জমা দেননি, তাঁদের উচিত নিজের কর-সংক্রান্ত অবস্থা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। আয় না থাকলে কর দিতে নাও হতে পারে, কিন্তু তাই বলে সব ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা শেষ হয়ে যায় না।

এনবিআরের চিঠির অপেক্ষা না করে নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়া, সঠিক তথ্য দিয়ে রিটার্ন প্রস্তুত করা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা জমা দেওয়া জরুরি। এতে সম্ভাব্য জরিমানা ও ভবিষ্যৎ কর-সংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে সহায়তা পাওয়া যাবে।

সরকারি তথ্যসূত্র: জাতীয় রাজস্ব বোর্ড | অনলাইন আয়কর রিটার্ন | বাংলাদেশের আইনভান্ডার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *