অ্যান্ড্রয়েড ফোনে প্রতারণা ঠেকাতে গুগলের নতুন উদ্যোগ, এআইয়ে শনাক্ত হবে সন্দেহজনক বার্তা
অনলাইন প্রতারণা, ভুয়া বার্তা, ক্ষতিকর লিংক এবং ব্যক্তিগত তথ্য চুরির ঝুঁকি কমাতে অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম ও Google Messages-এ নতুন নিরাপত্তাসুবিধা যুক্ত করছে গুগল। এসব সুবিধার মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের সন্দেহজনক বার্তা সম্পর্কে সতর্ক করা, ক্ষতিকর লিংক শনাক্ত করা এবং স্ক্রিন শেয়ার করার সময় সংবেদনশীল তথ্য সুরক্ষিত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে স্মার্টফোন ব্যবহার করে ব্যাংকিং, অনলাইন কেনাকাটা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা হয়। ফলে প্রতারকেরা ভুয়া এসএমএস, জাল পরিচয়, সন্দেহজনক ওয়েবসাইট এবং ফোনকলের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে পাসওয়ার্ড, আর্থিক তথ্য ও ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় গুগলের নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থা ব্যবহারকারীদের জন্য বাড়তি সুরক্ষা দিতে পারে।
এআই দিয়ে শনাক্ত হবে প্রতারণামূলক বার্তা
গুগলের নতুন নিরাপত্তাসুবিধার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে সন্দেহজনক বার্তা শনাক্ত করা। প্রতারকেরা অনেক সময় ব্যাংক, পরিচিত প্রতিষ্ঠান, কুরিয়ার সেবা কিংবা সরকারি সংস্থার পরিচয় ব্যবহার করে ভুয়া বার্তা পাঠায়। এসব বার্তায় ব্যবহারকারীকে দ্রুত কোনো লিংকে প্রবেশ করতে, অ্যাকাউন্ট যাচাই করতে অথবা ব্যক্তিগত তথ্য দিতে বলা হতে পারে।
এআইভিত্তিক শনাক্তকরণব্যবস্থা এ ধরনের বার্তার প্রতারণামূলক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে ব্যবহারকারীকে সতর্ক করতে পারে। ফলে কোনো বার্তা বিশ্বাস করার আগে সেটি যাচাই করার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে এআইয়ের সতর্কবার্তাকে শতভাগ নির্ভুল ধরে নেওয়া উচিত নয়। নতুন কৌশলে তৈরি প্রতারণামূলক বার্তা কখনো শনাক্তকরণব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে পারে। তাই অপরিচিত নম্বর থেকে আসা বার্তা যাচাই না করে ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকা জরুরি।
ক্ষতিকর লিংকে প্রবেশের আগেই সতর্কবার্তা
অনলাইন প্রতারণার একটি পরিচিত কৌশল হলো ভুয়া ওয়েবসাইটের লিংক পাঠানো। এসব লিংক দেখতে অনেক সময় আসল ব্যাংক, অনলাইন সেবা বা পরিচিত প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের মতো মনে হয়। ব্যবহারকারী লিংকে প্রবেশ করে পাসওয়ার্ড, কার্ডের তথ্য কিংবা এককালীন পাসওয়ার্ড (OTP) দিলে প্রতারকেরা সেগুলো ব্যবহার করতে পারে।
নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থায় ক্ষতিকর লিংক শনাক্ত করে আগাম সতর্ক করার সুবিধা ব্যবহারকারীদের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করবে। কোনো লিংক সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত হলে সতর্কবার্তা দেখে ব্যবহারকারী সেটিতে প্রবেশ করার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারবেন।
বিশেষ করে পুরস্কার জেতার দাবি, জরুরি অ্যাকাউন্ট যাচাই, অস্বাভাবিক ছাড় কিংবা টাকা ফেরত পাওয়ার প্রলোভন দেখানো বার্তার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। পরিচিত ব্যক্তির নাম বা প্রতিষ্ঠানের লোগো ব্যবহার করা হলেও লিংকটি নিরাপদ—এমন নিশ্চয়তা নেই।
স্ক্রিন শেয়ার করার সময় গোপন থাকবে সংবেদনশীল তথ্য
অনেক সময় প্রযুক্তিগত সহায়তা নেওয়া, অনলাইন মিটিং করা কিংবা অন্য কাউকে ফোনের সমস্যা দেখানোর জন্য স্ক্রিন শেয়ার করতে হয়। কিন্তু এ সময় স্ক্রিনে পাসওয়ার্ড, ব্যাংকিং তথ্য, পেমেন্টের বিবরণ বা ব্যক্তিগত বার্তা দেখা গেলে তা গোপনীয়তার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গুগলের নতুন নিরাপত্তাসুবিধার একটি লক্ষ্য হলো স্ক্রিন শেয়ারিংয়ের সময় সংবেদনশীল তথ্য সুরক্ষিত রাখা। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পাসওয়ার্ড ও পেমেন্ট-সংক্রান্ত তথ্য আড়াল রাখার ব্যবস্থা ব্যবহারকারীদের অনিচ্ছাকৃত তথ্য প্রকাশের ঝুঁকি কমাতে পারে।
এ সুবিধা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রতারকেরা অনেক সময় ভুয়া কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধি পরিচয়ে ফোন করে ব্যবহারকারীকে স্ক্রিন শেয়ার করতে বলে। এরপর তাঁকে ব্যাংকিং অ্যাপ খুলতে বা গোপন তথ্য দেখাতে প্ররোচিত করতে পারে।
তাই অপরিচিত কারও অনুরোধে স্ক্রিন শেয়ার করা উচিত নয়। ব্যাংক বা কোনো সেবা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় দিলেও ব্যক্তির পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অনুমতি ছাড়া কল ফরোয়ার্ডিং চালু করা ঠেকানোর উদ্যোগ
ফোনকলের নিরাপত্তা বাড়াতেও নতুন ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কল ফরোয়ার্ডিং চালু থাকলে একটি নম্বরে আসা কল অন্য নম্বরে চলে যেতে পারে। এই সুবিধা বৈধ প্রয়োজনে ব্যবহার করা হলেও প্রতারকেরা ব্যবহারকারীর অজান্তে কল ফরোয়ার্ডিং চালু করার চেষ্টা করতে পারে।
এভাবে গুরুত্বপূর্ণ ফোনকল অন্য নম্বরে চলে গেলে ব্যবহারকারী তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি বুঝতে নাও পারেন। পরিস্থিতিভেদে যাচাইকরণসংক্রান্ত কল বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থার লক্ষ্য হলো ব্যবহারকারীর অজান্তে কল ফরোয়ার্ডিং চালু করার সুযোগ সীমিত করা। এর ফলে ফোনের কল-সংক্রান্ত সেটিংসের অপব্যবহার ঠেকাতে বাড়তি সুরক্ষা পাওয়া যেতে পারে।
ব্যবহারকারীদেরও নিয়মিত ফোনের কল সেটিংস পরীক্ষা করা উচিত। অপ্রত্যাশিতভাবে কল অন্য নম্বরে চলে যাওয়া, অপরিচিত সেটিংস পরিবর্তন কিংবা সন্দেহজনক নির্দেশনা পেলে দ্রুত বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন।
সন্দেহজনক বার্তা নিয়ে নোটিফিকেশনে সতর্কতা
নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সন্দেহজনক বার্তা সম্পর্কে নোটিফিকেশনের মাধ্যমে সতর্ক করা। অনেক ব্যবহারকারী ব্যস্ততার কারণে বার্তার উৎস বা লিংক যাচাই না করেই তাতে ক্লিক করেন। প্রতারকেরা এই তাড়াহুড়োর সুযোগ নেয়।
নোটিফিকেশনভিত্তিক সতর্কতা ব্যবহারকারীকে সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে দ্রুত অবহিত করতে পারে। ফলে কোনো বার্তায় অস্বাভাবিক দাবি, সন্দেহজনক লিংক কিংবা প্রতারণার লক্ষণ থাকলে সেটি খোলার আগে সতর্ক হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে নোটিফিকেশন পাওয়া মানেই বার্তাটি নিশ্চিতভাবে প্রতারণামূলক, এমন নয়। একইভাবে কোনো সতর্কবার্তা না এলেই বার্তাটি নিরাপদ—এমন সিদ্ধান্তও নেওয়া যাবে না। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইট বা যাচাইকৃত যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তথ্য নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশি অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশে স্মার্টফোনের মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, অনলাইন কেনাকাটা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা ব্যবহারের কারণে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভুয়া পুরস্কার, চাকরির প্রলোভন, অ্যাকাউন্ট বন্ধ হওয়ার ভয় দেখানো বার্তা এবং ভুয়া কাস্টমার কেয়ার নম্বর ব্যবহার করে প্রতারণার চেষ্টা হতে পারে।
গুগলের নতুন নিরাপত্তাসুবিধাগুলো ব্যবহারকারীদের এমন ঝুঁকি শনাক্ত করতে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত অপরিচিত নম্বর থেকে বার্তা পান বা স্মার্টফোনে আর্থিক লেনদেন করেন, তাঁদের জন্য এসব সুবিধা উপকারী হতে পারে।
তবে সব সুবিধা সব অ্যান্ড্রয়েড ফোনে একই সময়ে পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ফোনের মডেল, অ্যান্ড্রয়েড সংস্করণ, Google Messages অ্যাপের সংস্করণ, অঞ্চল এবং সংশ্লিষ্ট ফিচারের প্রাপ্যতার ওপর সুবিধাগুলো নির্ভর করতে পারে। তাই ব্যবহারকারীদের ফোন ও অ্যাপ হালনাগাদ রাখা এবং সংশ্লিষ্ট সেটিংসে নিরাপত্তাসুবিধা চালু আছে কি না, তা পরীক্ষা করা উচিত।
নিরাপদ থাকতে ব্যবহারকারীদের করণীয়
গুগলের নিরাপত্তাব্যবস্থার পাশাপাশি কয়েকটি অভ্যাস অনুসরণ করলে অনলাইন প্রতারণার ঝুঁকি আরও কমানো সম্ভব।
- অপরিচিত নম্বর থেকে আসা সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক করবেন না।
- কাউকে পাসওয়ার্ড, পিন বা OTP জানাবেন না।
- ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবার পরিচয়ে যোগাযোগ করা ব্যক্তির পরিচয় যাচাই করুন।
- অপরিচিত ব্যক্তির অনুরোধে স্ক্রিন শেয়ার করবেন না।
- ফোনের কল ফরোয়ার্ডিং ও অন্যান্য নিরাপত্তাসেটিংস নিয়মিত পরীক্ষা করুন।
- অ্যান্ড্রয়েড, Google Messages এবং অন্যান্য অ্যাপের নিরাপত্তা আপডেট ইনস্টল করুন।
- সন্দেহজনক বার্তা পেলে প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক মাধ্যমে যাচাই করুন।
শেষ কথা
অনলাইন প্রতারণার ধরন ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই শুধু ব্যবহারকারীর সচেতনতার ওপর নির্ভর না করে প্রযুক্তিগতভাবে প্রতারণা শনাক্ত ও প্রতিরোধের ব্যবস্থা জোরদার করাও জরুরি। অ্যান্ড্রয়েড ও Google Messages-এ গুগলের নতুন নিরাপত্তাসুবিধাগুলো এই লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হতে পারে।
তবে প্রযুক্তিগত সুরক্ষা কখনোই শতভাগ নিশ্চয়তা দেয় না। সন্দেহজনক বার্তা যাচাই করা, গোপন তথ্য প্রকাশ না করা এবং ফোনের নিরাপত্তাসেটিংস সম্পর্কে সচেতন থাকাই অনলাইন প্রতারণা থেকে সুরক্ষিত থাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়।


