নাগরিক সেবা

সরকারি সেবায় ঘুষের থাবা: শীর্ষে বিআরটিএ, দ্বিতীয় স্থানে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন সরকার গঠনের পর দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত সেবা পাওয়ার বড় ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র এবং সেবাগ্রহীতাদের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির শিকড় এখনো বেশ গভীর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত ‘সিটিজেন পারসেপশন সার্ভে (সিপিএস)’-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সরকারি সেবা খাতে ঘুষ ও দুর্নীতির এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রতি তিনজনে একজন নাগরিক (৩১.৬৭%) কোনো না কোনো সরকারি সেবা নিতে গিয়ে সরাসরি ঘুষের শিকার হয়েছেন। সেবাগ্রহীতাদের মতে, ঘুষ না দিলে ফাইল আটকে থাকা বা হয়রানির শিকার হওয়া নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত ৪ খাত

ইনফোগ্রাফিকস ও বিবিএসের ডাটা বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেবাগ্রহীতারা সবচেয়ে বেশি ঘুষ ও দুর্নীতির মুখোমুখি হয়েছেন ৪টি নির্দিষ্ট দপ্তরে:

  • বিআরটিএ (BRTA): সেবা নিতে যাওয়া নাগরিকদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৩.২৯% মানুষ এখানে দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। লাইসেন্স ও ফিটনেস সার্টিফিকেটের মতো কাজে দালালি ও ঘুষের আধিপত্য এখনো প্রবল।

  • আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা: তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পুলিশ ও অন্যান্য আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা। সেবাগ্রহীতাদের ৬১.৯৪% (ইনফোগ্রাফিকে ৬১.৯৪%) জানিয়েছেন, তাদের সেবা পেতে অবৈধ অর্থ লেনদেন করতে হয়েছে।

  • পাসপোর্ট অফিস: পাসপোর্ট সেবা ডিজিটাল করার নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও ৫৭.৪৫% নাগরিককে এখানে অতিরিক্ত অর্থ বা ঘুষ দিতে হয়েছে।

  • ভূমি নিবন্ধন অফিস: জমিজমা সংক্রান্ত কাজে এখনো হয়রানি কমেনি। ৫৪.৯২% সেবাগ্রহীতা ভূমি নিবন্ধন অফিসে ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন।

ধনী বনাম দরিদ্র: কার অভিজ্ঞতা কেমন?

বিবিএসের জরিপ থেকে একটি চমকপ্রদ ও বৈসাদৃশ্যপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। সাধারণত ধারণা করা হয় দরিদ্ররাই বেশি দুর্নীতির শিকার হন, তবে জরিপ বলছে ভিন্ন কথা। সবচেয়ে ধনী শ্রেণির মানুষের মধ্যে ৩৫.১৬% ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন, যেখানে সবচেয়ে দরিদ্র শ্রেণির ক্ষেত্রে এই হার ২৫.৯২%। বিশ্লেষকদের মতে, ধনী বা উচ্চবিত্তরা সরকারি কাজ দ্রুত শেষ করতে বা বিশেষ সুবিধা নিতে টাকা দিয়ে ‘সেবা কিনে নেওয়া’র সংস্কৃতি তৈরি করেছেন।

নগদ টাকার আধিপত্য ও লিঙ্গভিত্তিক ব্যবধান

ডিজিটাল পেমেন্টের যুগেও দুর্নীতির ক্ষেত্রে নগদ টাকার ব্যবহার কমেনি। জরিপে অংশ নেওয়া ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৯৮.৪৮% ব্যক্তিই জানিয়েছেন যে তারা নগদ টাকায় (ক্যাশ) ঘুষ দিয়েছেন। অন্যদিকে, পুরুষ সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে ঘুষ দেওয়ার হার (৩৮.৬২%) নারীদের (২২.৭১%) তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

জেলাভিত্তিক বিশ্লেষণ: শীর্ষে নোয়াখালী ও কুমিল্লা

সারাদেশের ৬৪ জেলায় পরিচালিত এই জরিপে দেখা গেছে, জেলাভিত্তিক ঘুষের হারে বড় রকমের পার্থক্য রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন নোয়াখালী (৫৭.১৭%) এবং কুমিল্লা (৫৩.৪৭%) জেলার মানুষ। বিপরীতে সবচেয়ে কম ঘুষের প্রবণতা দেখা গেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ (১০.৪৯%) ও মাগুরায়।

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও করণীয়

পরিকল্পনা ও অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকার আসার পর উচ্চপর্যায়ে শুদ্ধি অভিযান বা সংস্কারের কথা বলা হলেও, মাঠপর্যায়ের বা তৃণমূলের সেবা খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মানসিকতা এবং মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালদের দৌরাত্ম্য এখনো পুরোপুরি ভাঙা সম্ভব হয়নি।

তারা বলছেন, সেবাগ্রহীতাদের এই অভিজ্ঞতা বদলাতে হলে শুধু মুখের কথা নয়, বরং সেবা খাতগুলোকে সম্পূর্ণ কাগজবিহীন ও ডিজিটাল করা, কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত সক্রিয় করা জরুরি। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের সুশাসনের স্বপ্ন কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

সোর্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *