রূপপুরের প্রথম ইউনিটে ‘পাওয়ার স্টার্টআপের’ অনুমোদন, গ্রিডে বিদ্যুৎ আসার পথে
পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া বা ‘পাওয়ার স্টার্টআপ’ শুরুর অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা)। ধাপে ধাপে ক্ষমতা বাড়িয়ে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক সরবরাহের প্রস্তুতি চলছে।
পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া, অর্থাৎ ‘পাওয়ার স্টার্টআপ’ শুরুর অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা)। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) এ অনুমোদন দেওয়া হয়। ‘বি-২’ ধাপের ফিজিক্স টেস্টসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হওয়ার পর ইউনিটটি এখন ‘স্টেজ-সি’ বা পাওয়ার স্টার্টআপ পর্বে প্রবেশ করছে। এর মধ্য দিয়ে কেন্দ্রটি থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের পথে আরেক ধাপ এগোল দেশ।
স্টেজ-সিতে কী হবে
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের বরাতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই পর্বে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা একবারে নয়, ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে। প্রতিটি ধাপে রিঅ্যাক্টর, প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি সার্কিট, টারবাইন-জেনারেটর, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, ইনস্ট্রুমেন্টেশন ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করা হবে।
এ পর্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলো জেনারেটরকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সিনক্রোনাইজ বা যুক্ত করা। গ্রিডে যুক্ত হওয়ার পর সরবরাহ স্থিতিশীল থাকছে কি না এবং ফ্রিকোয়েন্সি ও মান ঠিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করা হবে। প্রকল্প কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, পরীক্ষা সফল হলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হতে পারে। তবে এই সময়সূচি পরীক্ষার ফলাফল ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত পূরণের ওপর নির্ভর করবে।
বাণিজ্যিক উৎপাদন এখনো আলাদা ধাপ
সংশ্লিষ্টরা স্পষ্ট করেছেন, স্টেজ-সিতে প্রবেশ, গ্রিডে পরীক্ষামূলক সরবরাহ এবং বাণিজ্যিক উৎপাদন—এই তিনটি আলাদা মাইলফলক। পাওয়ার স্টার্টআপের পরীক্ষাগুলো সন্তোষজনক হলে এবং কমিশনিংয়ের শর্ত পূরণ হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন সাপেক্ষে পাইলট অপারেশন বা পরীক্ষামূলক চালনা শুরু হতে পারে। এরপর আরও কারিগরি পরীক্ষা ও কমিশনিং শেষে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে ইউনিটটি।
দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানিও এসেছে
রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রটির দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য প্রথম চালানের জ্বালানি অ্যাসেম্বলি সাইবেরিয়া থেকে বাংলাদেশে পৌঁছেছে। বাংলাদেশি কর্মকর্তা, প্রধান ঠিকাদার ও জ্বালানি প্রস্তুতকারকের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি যৌথ কমিশন ব্যবহারের আগে এসব জ্বালানি পরিদর্শন ও পরীক্ষা করবে। প্রথম ইউনিটের প্রথম দফা জ্বালানি পুনঃভরণের (রিফুয়েলিং) জন্যও নতুন জ্বালানি এসেছে বলে জানানো হয়েছে।
প্রকল্পের পটভূমি
রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভিভিইআর-১২০০ মডেলের দুটি রিঅ্যাক্টর রয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট; দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। রোসাটমের সঙ্গে প্রকল্পের মূল চুক্তি সই হয় ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে, যার মূল্য ছিল প্রায় ১ হাজার ২৬৫ কোটি মার্কিন ডলার। প্রথম ইউনিটের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের নভেম্বরে এবং দ্বিতীয়টির ২০১৮ সালের জুলাইয়ে।
চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল প্রথম ইউনিটের জন্য অপারেটিং লাইসেন্স দেয় বায়েরা। এরপর রিঅ্যাক্টর কোরে জ্বালানি লোডিং, প্রথম ক্রিটিক্যালিটি বা নিয়ন্ত্রিত চেইন বিক্রিয়া শুরু এবং ন্যূনতম নিয়ন্ত্রণযোগ্য ক্ষমতায় পরীক্ষার ধাপগুলো পার করে ইউনিটটি। প্রতিটি রিঅ্যাক্টরের প্রাথমিক নকশাগত আয়ুষ্কাল ৬০ বছর, যা আরও ২০ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। দেশের প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমা ও বেস-লোড বিদ্যুতের জোগান বাড়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্যসূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা, ভিউজ বাংলাদেশ, দৈনিক বাংলা, স্টার নিউজ, ওয়ার্ল্ড নিউক্লিয়ার নিউজ



মন্তব্য (০)