পকেটে ফোন রাখলে কি শুক্রাণুর ক্ষতি হয়? যা বলছে বড় গবেষণা
প্রায় ২ হাজার ৯০০ তরুণের ওপর সুইস গবেষণায় ফোন বেশি ব্যবহারের সঙ্গে শুক্রাণুর ঘনত্ব কম থাকার সম্পর্ক মিলেছে। তবে পকেটে ফোন রাখার সঙ্গে এমন সম্পর্ক পাওয়া যায়নি, আর কার্যকারণও প্রমাণিত নয়।
মুঠোফোন সঙ্গে না থাকলে এখন অনেকেরই অস্বস্তি লাগে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, সারা দিন প্যান্টের পকেটে ফোন রাখলে কি পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়? এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় পরিসরের গবেষণাগুলোর একটি করেছে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয় ও সুইস ট্রপিক্যাল অ্যান্ড পাবলিক হেলথ ইনস্টিটিউট (সুইস টিপিএইচ)। চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘ফার্টিলিটি অ্যান্ড স্টেরিলিটি’-তে প্রকাশিত ওই গবেষণায় দেখা গেছে, ফোন বেশি ব্যবহারের সঙ্গে শুক্রাণুর ঘনত্ব কম থাকার একটি সম্পর্ক রয়েছে। তবে ফোন পকেটে রাখা হচ্ছে কি না, তার সঙ্গে এমন কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
কীভাবে হয়েছিল গবেষণা
গবেষকেরা ২০০৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডের ছয়টি সামরিক নিয়োগকেন্দ্রে আসা ১৮ থেকে ২২ বছর বয়সী ২ হাজার ৮৮৬ জন তরুণের বীর্যের নমুনা বিশ্লেষণ করেন। অংশগ্রহণকারীরা একটি প্রশ্নপত্রে জীবনযাপন, সাধারণ স্বাস্থ্য, দিনে কতবার ফোন ব্যবহার করেন এবং ব্যবহার না করার সময় ফোন কোথায় রাখেন—এসব তথ্য দেন।
এটি ছিল একটি ‘ক্রস-সেকশনাল’ গবেষণা, অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ে তথ্য সংগ্রহ করে তুলনা করা হয়েছে। এ ধরনের গবেষণায় দুটি বিষয়ের মধ্যে সম্পর্ক দেখা গেলেও একটি অন্যটির কারণ কি না, তা প্রমাণ হয় না।
ফলাফলে যা পাওয়া গেছে
যাঁরা সপ্তাহে এক বারের বেশি ফোন ব্যবহার করেন না, তাঁদের শুক্রাণুর মধ্যমা ঘনত্ব ছিল প্রতি মিলিলিটারে প্রায় ৫ কোটি ৬৫ লাখ। অন্যদিকে দিনে ২০ বারের বেশি ফোন ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে তা ছিল প্রায় ৪ কোটি ৪৫ লাখ, যা প্রায় ২১ শতাংশ কম। বেশি ব্যবহারের সঙ্গে মোট শুক্রাণুর সংখ্যাও কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে শুক্রাণুর চলনক্ষমতা বা গঠনের সঙ্গে ফোন ব্যবহারের কোনো সম্পর্ক মেলেনি।
সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন ছিল পকেটে ফোন রাখা নিয়ে। গবেষণায় ফোন রাখার স্থানের সঙ্গে শুক্রাণুর মান কমার কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। তবে গবেষকেরা নিজেরাই বলেছেন, শরীরের কাছে ফোন রাখেন না এমন অংশগ্রহণকারী খুব কম ছিলেন, তাই এ বিষয়ে দৃঢ় সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এই সম্পর্ক ২০০৫-২০০৭ সময়ে সবচেয়ে স্পষ্ট ছিল এবং পরের বছরগুলোতে দুর্বল হয়ে আসে। গবেষকদের ধারণা, টুজি থেকে থ্রিজি ও ফোরজিতে রূপান্তরের ফলে ফোনের সংকেত পাঠানোর শক্তি কমে যাওয়া এর একটি কারণ হতে পারে। যদিও এটি সময়ের প্রবণতা দেখে করা অনুমান, সরাসরি প্রমাণিত নয়।
সতর্কতা ও বিশেষজ্ঞদের মত
গবেষণার সীমাবদ্ধতাও কম নয়। ফোন ব্যবহারের তথ্য অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের দেওয়া, ফলে প্রকৃত বিকিরণের মাত্রা মাপা হয়নি। অংশগ্রহণকারীরা সবাই তরুণ সুইস নাগরিক, তাই ফলাফল সব জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না, তা নিশ্চিত নয়। প্রধান গবেষক রিতা রাহবানের মতে, প্রভাবটি সরাসরি নাকি পরোক্ষ, কিংবা অণ্ডকোষের তাপমাত্রা বা হরমোনের ওপর কোনো ভূমিকা আছে কি না, তা এখনো জানার বাকি।
যুক্তরাজ্যের বিশেষজ্ঞরাও ফলাফল নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। প্রজননবিশেষজ্ঞ অ্যালিসন ক্যাম্পবেল বলেছেন, গবেষণাটি অভ্যাসে ‘নাটকীয় পরিবর্তনের কারণ হওয়া উচিত নয়’। ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালান পেসি মনে করেন, চিন্তিত হলে ফোন ব্যাগে রাখা একটি সহজ পদক্ষেপ হতে পারে, তবে এতে শুক্রাণুর মান বাড়ে—এমন প্রমাণ এখনো নেই।
প্রেক্ষাপট
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, শুক্রাণুর ঘনত্ব প্রতি মিলিলিটারে ৪ কোটির নিচে নামলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। গবেষকদের তথ্য বলছে, গত পাঁচ দশকে গড় ঘনত্ব প্রতি মিলিলিটারে প্রায় ৯ কোটি ৯০ লাখ থেকে কমে ৪ কোটি ৭০ লাখে নেমেছে। খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, স্থূলতা, পরিবেশদূষণসহ নানা কারণ এর পেছনে থাকতে পারে বলে মনে করা হয়। বিশেষজ্ঞরা সুষম খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর ওজন, ধূমপান বর্জন ও মদ্যপান সীমিত রাখার ওপর জোর দেন। গর্ভধারণে সমস্যা হলে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই উত্তম। সরাসরি বিকিরণ মেপে বিষয়টি আরও নিশ্চিত হতে সুইজারল্যান্ডে একটি নতুন গবেষণাও চলছে।
তথ্যসূত্র: সুইস টিপিএইচ, আইটিভি নিউজ


মন্তব্য (০)