চিকিৎসা খরচে দরিদ্র ১ কোটি ৮ লাখ মানুষ, আর্থিক কষ্টে ৪১.৭%
নিজের পকেট থেকে চিকিৎসা খরচ মেটাতে গিয়ে ২০২২ সালে দেশের ১ কোটি ৮ লাখের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন। আর্থিক কষ্টে পড়া মানুষের হার দাঁড়িয়েছে ৪১.৭ শতাংশে, যা বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে অনেক বেশি।
নিজের পকেট থেকে চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে ২০২২ সালে দেশের ১ কোটি ৮ লাখের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন, যা মোট জনসংখ্যার ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। একই বছরে চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে আর্থিক কষ্টে পড়েছেন ৪১ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ, অর্থাৎ প্রতি দশজনে প্রায় চারজন। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের (এইচইইউ) এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও সুইডেন দূতাবাসের সহায়তায় পরিচালিত এই গবেষণায় ২০০৫, ২০১০, ২০১৬ ও ২০২২ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপের (হায়েস) তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
দারিদ্র্য কমলেও বেড়েছে চিকিৎসাজনিত দারিদ্র্য
গবেষণা অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশে সামগ্রিক দারিদ্র্যের হার ৪০ শতাংশ থেকে কমে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে। কিন্তু একই সময়ে চিকিৎসা খরচের কারণে দরিদ্র হয়ে পড়া মানুষের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০০৫ সালে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ৫৬ লাখ, যা তখনকার জনসংখ্যার ৩ দশমিক ৯ শতাংশ।
আর্থিক কষ্টে পড়া মানুষের হার ২০০৫ সালের ২৮ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ৪১ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২২ সালে এ হারের বৈশ্বিক গড় ছিল ২৬ শতাংশ। গবেষণায় মৌলিক চাহিদা মেটানোর পর অবশিষ্ট আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি স্বাস্থ্যে খরচ হলে তাকে আর্থিক কষ্ট হিসেবে ধরা হয়েছে।
পরিবারের মোট ভোগব্যয়ের ১০ শতাংশের বেশি স্বাস্থ্যে খরচ হওয়া, অর্থাৎ বিপর্যয়কর স্বাস্থ্য ব্যয়ের মুখে পড়া খানার হারও ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর পরিবারপ্রতি মাসিক গড় স্বাস্থ্য ব্যয় ১ হাজার ২৪১ টাকা থেকে বেড়ে ৩ হাজার ২৩৮ টাকায় পৌঁছেছে। নিজের পকেট থেকে চিকিৎসা খরচ বহন করা খানার হার ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৯২ দশমিক ৭ শতাংশ।
সবচেয়ে বেশি চাপে দরিদ্র ও গ্রামের মানুষ
চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা সবচেয়ে বেশি পড়ছে দরিদ্র পরিবারের ওপর। ২০২২ সালে সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষের মধ্যে ৯০ দশমিক ৮ শতাংশ আর্থিক কষ্টে পড়েছেন; সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশের ক্ষেত্রে এ হার মাত্র ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে এ হার ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ, শহরে ২৮ দশমিক ২ শতাংশ।
বিভাগভিত্তিক চিত্রে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে বরিশালে। ২০০৫ সালে এই বিভাগে আর্থিক কষ্টের হার ছিল সবচেয়ে কম, ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২২ সালে সেটিই হয়েছে সর্বোচ্চ, ৫৯ দশমিক ১ শতাংশ।
ফার্মেসিনির্ভরতা বাড়ছে, কমছে সরকারি হাসপাতালের অংশ
বহির্বিভাগীয় চিকিৎসার জন্য ফার্মেসির ওপর নির্ভরতা ২০১৬ সালের ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ৫৫ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নেওয়ার হার ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৫৬ শতাংশে নেমেছে, আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তা ৩৬ দশমিক ৯ থেকে বেড়ে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। গবেষকদের মতে, ভর্তি রোগীদের প্রধান ভরসা এখনো সরকারি হাসপাতাল হলেও দরিদ্রদের কাছে সরকারি সেবা পৌঁছানোর প্রবণতা ২০১৬ সালের তুলনায় দুর্বল হয়েছে।
যেসব সুপারিশ এসেছে
গবেষণায় স্বাস্থ্য খাতে সরকারি অর্থায়ন বাড়ানো, ব্যয়ের দক্ষতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও রোগনির্ণয় পরীক্ষা বিনা মূল্যে ও নিয়মিত সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগের জন্য সাশ্রয়ী নিয়মিত চিকিৎসার ব্যবস্থা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে এইচইইউর ফোকাল পারসন সুব্রত পাল গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন। ডব্লিউএইচও বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা গবেষণার বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধিতে উদ্বেগ জানিয়ে স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম রোধে সরকারের অঙ্গীকারের কথা বলেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশই সরাসরি রোগী ও তাঁর পরিবারকে বহন করতে হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ হারগুলোর একটি। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই স্বাস্থ্য বাজেট বাড়ানো ও স্বাস্থ্যবিমা সম্প্রসারণের তাগিদ দিয়ে আসছেন।
তথ্যসূত্র: দৈনিক বাংলা, স্বদেশ বিদেশ, প্রথম আলো



মন্তব্য (০)