আজ হ্যালোইন: কেল্টিক ফসল উৎসব থেকে ১৩৫০ কোটি ডলারের উদ্যাপন
শনিবার (৩১ অক্টোবর) পালিত হচ্ছে হ্যালোইন। প্রাচীন কেল্টিক উৎসব ‘সাওইন’ থেকে জন্ম নেওয়া এই রীতিতে এবার শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রায় ১ হাজার ৩৫০ কোটি ডলার খরচের পূর্বাভাস দিয়েছে এনআরএফ।
আজ শনিবার (৩১ অক্টোবর) বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হচ্ছে হ্যালোইন। কুমড়া কেটে বানানো লণ্ঠন, ভুতুড়ে সাজপোশাক আর শিশুদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে চকলেট সংগ্রহ—এসবের মধ্য দিয়ে দিনটি উদ্যাপন করেন অনেকে। প্রায় দুই হাজার বছরের পুরোনো এক ফসল-উৎসব থেকে শুরু হওয়া এই রীতি এখন বিশাল এক বাণিজ্যিক আয়োজনে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল রিটেইল ফেডারেশনের (এনআরএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবার শুধু দেশটিতেই হ্যালোইন ঘিরে খরচ দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ হাজার ৩৫০ কোটি ডলারে।
শুরুটা ‘সাওইন’ থেকে
ইতিহাসবিদদের মতে, হ্যালোইনের শিকড় প্রাচীন কেল্টিক উৎসব ‘সাওইন’-এ। গেলিক ভাষায় শব্দটির মোটামুটি অর্থ ‘গ্রীষ্মের সমাপ্তি’। বর্তমান আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও উত্তর ফ্রান্সের কেল্টিক জনগোষ্ঠী নভেম্বরের শুরুর দিকে ফসল তোলা শেষ হওয়া এবং শীতের আগমন উপলক্ষে এ উৎসব পালন করত। এ সময় শীতের জন্য খাবার মজুত করা হতো, চারণভূমি থেকে গবাদিপশু ফিরিয়ে আনা হতো।
প্রচলিত বিশ্বাস ছিল, এই রাতে জীবিত ও মৃতদের জগতের সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়। তাই মানুষ আগুন জ্বালাত এবং পশুর চামড়া বা খড়ের তৈরি ছদ্মবেশ পরত। তবে কিছু ইতিহাসবিদ মনে করেন, উৎসবটি মৃতদের চেয়ে ঋতু বদলের সঙ্গেই বেশি সম্পর্কিত ছিল।
নাম এল গির্জার দিনপঞ্জি থেকে
নবম শতকের মধ্যে খ্রিষ্টান গির্জা ১ নভেম্বরকে ‘অল সেইন্টস ডে’ বা ‘অল হ্যালোস ডে’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এর আগের সন্ধ্যা পরিচিতি পায় ‘অল হ্যালোস ইভ’ নামে, যা কালক্রমে সংক্ষিপ্ত হয়ে দাঁড়ায় ‘হ্যালোইন’। গবেষকদের অনেকে মনে করেন, ক্যালেন্ডারে কাছাকাছি হওয়ায় সাওইন ও অল সেইন্টস ডের রীতিনীতি একে অপরকে প্রভাবিত করেছে।
মধ্যযুগে ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ডে ‘সোলিং’ নামে একটি প্রথা ছিল। দরিদ্র মানুষ বাড়ি বাড়ি গিয়ে মৃতদের জন্য প্রার্থনার বিনিময়ে ‘সোল কেক’ নামের খাবার পেতেন। পরে শিশুরা এই রীতি গ্রহণ করে। ছদ্মবেশ ধরে খাবার চাওয়ার ‘গাইজিং’ প্রথাকেও আজকের ট্রিক-অর-ট্রিটের পূর্বসূরি ধরা হয়।
শালগম থেকে কুমড়া, আয়ারল্যান্ড থেকে আমেরিকা
হ্যালোইনের পরিচিত প্রতীক ‘জ্যাক-ও’-ল্যান্টার্ন’-এর উৎস আইরিশ লোককথার চরিত্র ‘স্টিঞ্জি জ্যাক’। গল্প অনুযায়ী, সে খোদাই করা শালগমের ভেতরে আলো রেখে লণ্ঠন বানিয়েছিল। ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে দুর্ভিক্ষ থেকে বাঁচতে বিপুলসংখ্যক আইরিশ অভিবাসী উত্তর আমেরিকায় পাড়ি জমালে তাঁদের সঙ্গে এই রীতিও সেখানে যায়। আমেরিকায় কুমড়া সহজলভ্য ও খোদাই করা সহজ হওয়ায় শালগমের জায়গা নেয় কুমড়া।
উনিশ শতকের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রে হ্যালোইনের রাতে নানা রকম দুষ্টুমি ও ভাঙচুর বাড়তে থাকে। সেটি ঠেকাতে অভিভাবক ও স্থানীয় নেতারা সাজপোশাক পরে বাড়ি বাড়ি ঘোরার মতো নিরাপদ বিকল্পে উৎসাহ দেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শহরতলির বিস্তার ও চকলেট কোম্পানিগুলোর প্রচারে ট্রিক-অর-ট্রিট ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
এবার খরচের নতুন রেকর্ডের পূর্বাভাস
এনআরএফের বার্ষিক জরিপ অনুযায়ী, এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের ৭৪ শতাংশ ভোক্তা হ্যালোইন উদ্যাপনের পরিকল্পনা করেছেন, যা গত বছর ছিল ৭৩ শতাংশ। মোট খরচ গত বছরের রেকর্ড ১ হাজার ৩১০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে প্রায় ১ হাজার ৩৫০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। মাথাপিছু গড় খরচ ধরা হয়েছে ১১৫ দশমিক ১৪ ডলার। প্রসপার ইনসাইটস অ্যান্ড অ্যানালিটিকস ১ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর ৭ হাজার ৮৮৯ জন ভোক্তার ওপর জরিপটি চালায়।
খাতভিত্তিক হিসাবে পোশাকে প্রায় ৪৪০ কোটি, সাজসজ্জায় ৪৩০ কোটি এবং ক্যান্ডিতে প্রায় ৪১০ কোটি ডলার খরচের সম্ভাবনা রয়েছে। শিশুদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে সুপারহিরো ও কমিক চরিত্র, এরপর রাজকন্যা, ডাইনি ও ভূতের সাজ। বড়দের মধ্যে জনপ্রিয় ডাইনি ও ভ্যাম্পায়ারের পোশাক। পোষা প্রাণীর সাজে খরচ হতে পারে প্রায় ৯২ কোটি ডলার।
বাংলাদেশে হ্যালোইন প্রথাগত উৎসব না হলেও রাজধানীর কিছু ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, রেস্তোরাঁ ও তরুণদের মধ্যে থিমভিত্তিক আয়োজনে দিনটির উপস্থিতি চোখে পড়ে।
তথ্যসূত্র: লাইভ সায়েন্স, ন্যাশনাল রিটেইল ফেডারেশন (এনআরএফ), টক বিজনেস অ্যান্ড পলিটিকস, ওয়ার্ল্ড ফুটওয়্যার


মন্তব্য (০)