ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিংয়ে ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা: ৪০ হাজার পরিবারকে মাসে ২,৫০০ টাকা, ৩ লাখ ২০ হাজার পরিবারের তথ্য সংগ্রহ
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে পরিবারভিত্তিক, তথ্যনির্ভর ও ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনতে ‘ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন, ২০২৬’-এ বড় ধরনের কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। গাইডলাইন অনুযায়ী, পাইলট পর্যায়ে মোট ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা সরাসরি নগদ সহায়তায় এবং বাকি ১২ কোটি ৯২ লাখ টাকা তথ্য সংগ্রহ, স্মার্ট কার্ড, অনলাইন সিস্টেম, প্রশিক্ষণ, ডাটা এন্ট্রি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের ফ্যামিলি কার্ড বিষয়ক ওয়েবসাইটেও পাইলটিং পর্যায়ে প্রথমে ১৪টি ইউনিটে ১০ হাজার পরিবারকে যুক্ত করে পর্যায়ক্রমে জুন ২০২৬-এর মধ্যে ৪০ হাজার পরিবারকে কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা উল্লেখ রয়েছে।
মাসে ২,৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা
পাইলট কর্মসূচির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নির্বাচিত পরিবারকে সরাসরি নগদ সহায়তা দেওয়া। গাইডলাইন অনুযায়ী, একটি যোগ্য পরিবারকে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়ার কাঠামো রাখা হয়েছে। চার মাসের পাইলটিং পর্যায়ে প্রতি মাসে পর্যায়ক্রমে নতুন পরিবার যুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল।
বাজেটের হিসাবে ৪০ হাজার পরিবারকে বিভিন্ন মেয়াদে সহায়তা দেওয়ার জন্য ২৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এটি মোট ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকার বাজেটের প্রায় ৬৬ শতাংশ।
অর্থাৎ পাইলট প্রকল্পের অর্থের সবচেয়ে বড় অংশই অবকাঠামো বা প্রশাসনিক ব্যয়ের পরিবর্তে সরাসরি উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছানোর জন্য রাখা হয়েছে।
তবে পরিকল্পিত ৪০ হাজারের মধ্যে বাস্তবে প্রথম ধাপে ৩৭,৫৬৭ পরিবার
গাইডলাইনে পাইলটিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪০ হাজার পরিবার। পরবর্তী যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রথম ধাপে ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবারকে সুবিধার জন্য চূড়ান্ত করা হয়। সরকারি ও সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পাইলট পর্যায়ে ৬৭ হাজার ৮৫৪টি নারীপ্রধান পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। এরপর দারিদ্র্য সূচক ও অন্যান্য যোগ্যতা যাচাই করে চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করা হয়।
এ কারণে ৪০ হাজার পরিবার হলো পাইলটিংয়ের বাজেটভিত্তিক/পরিকল্পিত লক্ষ্যমাত্রা, আর ৩৭ হাজার ৫৬৭ হলো প্রথম ধাপে নির্বাচিত পরিবারের সংখ্যা—দুটি সংখ্যাকে একই অর্থে দেখলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
৩ লাখ ২০ হাজার পরিবারের তথ্য সংগ্রহ
ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক শুধু ভাতা দেওয়া নয়; বরং একটি বড় পরিবারভিত্তিক তথ্যভান্ডার তৈরি করা।
গাইডলাইনে ৩ লাখ ২০ হাজার পরিবারের তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা, পরিবারের সদস্যসংখ্যা, আয়, সম্পদসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে উপকারভোগী নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ সামাজিক নিরাপত্তা পরিকল্পনায় ব্যবহার করার কাঠামো রাখা হয়েছে।
এ জন্য মাঠপর্যায়ের জরিপ ও তথ্য সংগ্রহে ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। মোট বাজেটের হিসাবে এ খাতের অংশ প্রায় ১২ দশমিক ৬১ শতাংশ।
অর্থাৎ, ফ্যামিলি কার্ডকে শুধু একটি ভাতা দেওয়ার কার্ড হিসেবে না দেখে একটি পরিবারভিত্তিক সামাজিক তথ্যব্যবস্থা তৈরির অংশ হিসেবেও গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্মার্ট কার্ডে কিউআর কোড ও এনএফসি প্রযুক্তি
ফ্যামিলি কার্ডের প্রযুক্তিগত কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, কার্ডে QR Code, NFC এবং Contactless Chip প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। কিউআর কোড স্ক্যান করে পরিবার আইডি, সদস্যসংখ্যা ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করা যাবে। NFC প্রযুক্তির মাধ্যমে রিডারের কাছে কার্ড ধরেও তথ্য আদান-প্রদান করা সম্ভব হবে।
কার্ড মুদ্রণ, ফরম ও সংশ্লিষ্ট সরবরাহ বাবদ গাইডলাইনে ৫ কোটি ৮ লাখ ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এই ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিভিন্ন সুবিধা একটি অভিন্ন পরিবারভিত্তিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।
নারীপ্রধান পরিবারের নামে কার্ড
ফ্যামিলি কার্ডের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি পরিবারের মা বা নারীপ্রধান সদস্যের নামে দেওয়ার পরিকল্পনা। সরকারি ফ্যামিলি কার্ড পোর্টালেও নারীকে কেন্দ্র করে কার্ড ইস্যুর বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
এর ফলে পরিবারের সামাজিক নিরাপত্তা সহায়তা সরাসরি নারী সদস্যের নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার একটি কাঠামো তৈরি হচ্ছে।
পাইলট পর্যায়ে ভাতার অর্থ G2P—Government to Person পদ্ধতিতে সুবিধাভোগী নারীর পছন্দ অনুযায়ী মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক হিসাবে পাঠানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
উপকারভোগী নির্বাচন হবে PMT স্কোরিংয়ের মাধ্যমে
ফ্যামিলি কার্ডে কে সুবিধা পাবেন, তা নির্ধারণের জন্য Proxy Means Test বা PMT পদ্ধতি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
সরকারি পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা ও সম্পদের বিভিন্ন সূচক বিবেচনায় নিয়ে PMT স্কোরিংয়ের মাধ্যমে অতি দরিদ্র, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত পরিবার শনাক্ত করার কাঠামো রাখা হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পাইলট পর্যায়ে কোনো পরিবারের সদস্য সরকারি চাকরি বা পেনশনভোগী হলে, পরিবারে নির্দিষ্ট ধরনের আয় বা সম্পদ থাকলে, বড় ব্যবসা বা বাণিজ্যিক লাইসেন্স থাকলে কিংবা নির্দিষ্ট বিলাসী সম্পদ থাকলে যোগ্যতার বাইরে পড়তে পারে।
এর ফলে শুধু আয় নয়, আয়-সম্পদ ও পারিবারিক পরিস্থিতি মিলিয়ে যোগ্যতা নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়েছে।
বাজেটের খাতভিত্তিক হিসাব
গাইডলাইনের বাজেট অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিংয়ে ব্যয়ের কাঠামো হলো—
| ব্যয়ের খাত | বরাদ্দ | মোট বাজেটের আনুমানিক অংশ |
|---|---|---|
| সরাসরি নগদ সহায়তা | ২৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা | ৬৬.০৬% |
| মাঠ জরিপ ও তথ্য সংগ্রহ | ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা | ১২.৬১% |
| স্মার্ট কার্ড, ফরম ও সরবরাহ | ৫ কোটি ৮ লাখ ১০ হাজার টাকা | ১৩.৩৫% |
| প্রশিক্ষণ, সম্মানী ও প্রশাসনিক ব্যয় | ১ কোটি ২৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা | ৩.৩৫% |
| ডাটা এন্ট্রি ও আইটি | ৮৬ লাখ টাকা | ২.২৬% |
| প্রচার, ডকুমেন্টেশন ও অন্যান্য | প্রায় ৯০ লাখ টাকা | প্রায় ২.৩৭% |
| সর্বমোট | ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা | ১০০% |
এখানে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য—গাইডলাইনের বিস্তারিত টেবিল ও বিভিন্ন সরকারি/সংবাদ প্রতিবেদনের খাতভিত্তিক উপস্থাপনায় শেষ কয়েকটি প্রশাসনিক/প্রচার খাতে সামান্য শ্রেণিবিন্যাসগত পার্থক্য দেখা যায়। তবে মোট বাজেট ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা এবং সরাসরি নগদ সহায়তায় ২৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা—এই দুটি মূল সংখ্যা একাধিক সূত্রে একইভাবে এসেছে।
ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরিতে গুরুত্ব
ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য ভবিষ্যতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য একটি সমন্বিত ডাটাবেজ তৈরিতে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারি ফ্যামিলি কার্ড পোর্টালে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডকে একটি ‘সর্বজনীন সোশ্যাল আইডি কার্ডে’ রূপান্তরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এর অর্থ হলো, বর্তমান পাইলটিংকে শুধু চার মাসের নগদ সহায়তা কর্মসূচি হিসেবে দেখলে এর দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্যের একটি অংশ বাদ পড়ে যায়। এর সঙ্গে পরিবারভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ, ডিজিটাল পরিচয়, সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা সমন্বয় এবং ভবিষ্যৎ কর্মসূচির লক্ষ্য নির্ধারণও যুক্ত।
একই ব্যক্তি একাধিক সুবিধা নেওয়ার বিষয়েও নজর
সরকারি ফ্যামিলি কার্ড পোর্টালে বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একই ব্যক্তি একাধিক সুবিধা নেওয়া বা Double-dipping এবং প্রকৃত দরিদ্র পরিবার বাদ পড়ার মতো সমস্যার কথা উল্লেখ করে একটি সমন্বিত তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে।
ফলে ফ্যামিলি কার্ডের ডাটাবেজ ভবিষ্যতে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উপকারভোগী শনাক্তকরণ ও যাচাইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চার মাসের পাইলটিং থেকে বড় কর্মসূচির পরিকল্পনা
২০২৬ সালের গাইডলাইনে শুরুতে সীমিত পরিসরে কর্মসূচিটি পরীক্ষা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। সরকারি ঘোষণায় ১৪টি উপজেলায় পাইলটিং শুরুর কথা জানানো হয় এবং চার মাসের মধ্যে পাইলটিং শেষ করে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য উপজেলায় সম্প্রসারণের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
পরবর্তীতে পাইলট কর্মসূচির আওতায় দেশের ১৩টি জেলার ১৩টি সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডে কার্যক্রম বাস্তবায়নের তথ্য প্রকাশিত হয়।
এখানে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে বড় পরিসরে পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করে পরে PMT স্কোরিং ও অন্যান্য যাচাইয়ের মাধ্যমে চূড়ান্ত তালিকা করা হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ডের মূল উদ্দেশ্য কী?
পুরো বাজেট ও বাস্তবায়ন কাঠামো বিশ্লেষণ করলে কর্মসূচিটির তিনটি প্রধান স্তর স্পষ্ট হয়।
প্রথমত—নগদ সহায়তা:
নির্বাচিত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া।
দ্বিতীয়ত—তথ্যভিত্তিক শনাক্তকরণ:
লক্ষাধিক পরিবারের আর্থসামাজিক তথ্য সংগ্রহ করে PMT-এর মাধ্যমে প্রকৃত দরিদ্র পরিবার শনাক্ত করা।
তৃতীয়ত—ডিজিটাল সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো:
QR, NFC ও Contactless Chip-যুক্ত কার্ড এবং ডিজিটাল ডাটাবেজের মাধ্যমে পরিবারভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর করা।
সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাস্তবায়ন
ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিংয়ের বাজেট ও গাইডলাইন থেকে দেখা যায়, সরকারের পরিকল্পনা শুধু নগদ সহায়তা বিতরণে সীমাবদ্ধ নয়। বরং একটি বড় পরিবারভিত্তিক তথ্যভান্ডার, ডিজিটাল কার্ড এবং সরাসরি অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা একসঙ্গে তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে এই ধরনের কর্মসূচির বাস্তব ফলাফল নির্ভর করবে তথ্য সংগ্রহের নির্ভুলতা, উপকারভোগী নির্বাচনের স্বচ্ছতা, ডাটাবেজের নিরাপত্তা, সময়মতো অর্থপ্রদান এবং মাঠপর্যায়ের যাচাই-বাছাইয়ের কার্যকারিতার ওপর।
সব মিলিয়ে, ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকার ফ্যামিলি কার্ড পাইলট বাজেটের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ৪০ হাজার পরিবারকে পর্যায়ক্রমে নগদ সহায়তা দেওয়া এবং একই সঙ্গে বৃহত্তর সংখ্যক পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করে একটি ডিজিটাল সামাজিক নিরাপত্তা অবকাঠামোর ভিত্তি তৈরি করা। সরকারি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই পাইলট কাঠামো ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত পরিবারভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহারের লক্ষ্য রয়েছে।


