বিডি সার্ভিস রুলস

পে-ফিকেশনের চূড়ান্ত অনুমোদন নিয়ে নতুন আলোচনা: ডিডিও ফরওয়ার্ডের পর হিসাবরক্ষণ অফিসে কী হচ্ছে, স্বাক্ষর লাগবে কোথায়?

জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন নির্ধারণ বা পে-ফিকেশন কার্যক্রমে এখন গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো হিসাবরক্ষণ অফিসের যাচাই ও চূড়ান্ত অনুমোদন। iBAS++ সিস্টেমে বেতন নির্ধারণী বিবরণী প্রস্তুত ও ডিডিওর মাধ্যমে ফরওয়ার্ড করার পর সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিস তথ্য যাচাই করে অনুমোদন দেবে। অনুমোদন সম্পন্ন হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেরিফিকেশন নম্বর তৈরি হওয়ার বিধান রয়েছে।

তবে অনলাইন বিবরণীতে ম্যানুয়াল স্বাক্ষর প্রয়োজন না হওয়ার বিধান থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে কিছু ক্ষেত্রে ডিডিও ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার স্বাক্ষর চাওয়া হচ্ছে বলে কর্মচারীদের অভিজ্ঞতায় আলোচনা তৈরি হয়েছে। ফলে কোন নথিতে স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক, চূড়ান্ত অনুমোদন কীভাবে বোঝা যাবে এবং ডিডিওর কাছে থেকে বিবরণী ফরওয়ার্ড হওয়ার পর পরবর্তী করণীয় কী—এসব বিষয় নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে।

অর্থ বিভাগের জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-সংক্রান্ত সরকারি পাতা এবং পে-ফিকেশন বিষয়ে প্রকাশিত নির্দেশনাভিত্তিক প্রতিবেদনে অনলাইন যাচাই, অনুমোদন ও ভেরিফিকেশন নম্বর তৈরির প্রক্রিয়া তুলে ধরা হয়েছে। তবে প্রতিটি হিসাবরক্ষণ অফিসে কতটি বিবরণী অনুমোদিত হয়েছে, সে বিষয়ে সমন্বিত ও যাচাইকৃত পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।

অনুচ্ছেদ ৩২-এর উপধারা (৬), (৭) ও (৮)-এ কী বলা হয়েছে?

জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর অনুচ্ছেদ ৩২-এর সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো বিশ্লেষণ করলে পে-ফিকেশনের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সামনে আসে—ডিডিওর মাধ্যমে বিবরণী ফরওয়ার্ড, হিসাবরক্ষণ অফিসের অনলাইন যাচাই ও অনুমোদন এবং চাকরির নথিতে প্রয়োজনীয় তথ্য লিপিবদ্ধ করা।

ডিডিওর দায়িত্ব: বিবরণী ফরওয়ার্ড ও তথ্যের সঠিকতা নিশ্চিত করা

অনুচ্ছেদ ৩২-এর উপধারা (৬) অনুযায়ী, গেজেটেড সরকারি কর্মচারীর বেতন নির্ধারণী বিবরণী হিসাবরক্ষণ অফিসে ফরওয়ার্ড করতে হবে। নন-গেজেটেড কর্মচারীদের ক্ষেত্রে সার্ভিস বহি অনুযায়ী পূর্ববর্তী চাকরি ও বেতনের তথ্য সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।

এ ছাড়া iBAS++ সিস্টেম থেকে বেতন নির্ধারণী বিবরণীর একটি কপি প্রিন্ট করে সার্ভিস বহিসহ হিসাবরক্ষণ অফিসে পাঠানোর বিধান রয়েছে।

অর্থাৎ, ডিডিওর কাজ শুধু অনলাইনে ফরওয়ার্ড করেই শেষ নয়; প্রযোজ্য ক্ষেত্রে চাকরির পূর্ববর্তী তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট নথির সঠিকতাও নিশ্চিত করতে হবে।

হিসাবরক্ষণ অফিসের অনুমোদন: অনলাইনে যাচাইয়ের পর ভেরিফিকেশন নম্বর

উপধারা (৭) অনুযায়ী, অনলাইনে দাখিল করা বেতন নির্ধারণী বিবরণী সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসে পাওয়া যাবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারী বিবরণী অনলাইনে যাচাই করে সঠিক মনে করলে তা প্রতিপাদন করবেন। হিসাবরক্ষণ অফিসের অনুমোদনের পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেরিফিকেশন নম্বর তৈরি হবে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গেজেটের ভাষ্য অনুযায়ী অনলাইন বেতন নির্ধারণী বিবরণীতে হিসাবরক্ষণ অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারীর ম্যানুয়াল স্বাক্ষর প্রয়োজন হবে না।

এই বিধানটি অনলাইন প্রক্রিয়াকে সহজ ও দ্রুত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তবে অনলাইন অনুমোদনের পর অন্য দাপ্তরিক নথিতে স্বাক্ষরের প্রয়োজনীয়তা আলাদা বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।

সার্ভিস বহি ও অডিট রেজিস্টারে স্বাক্ষরের বিধান

উপধারা (৮)-এ অনলাইন বিবরণীর বাইরে চাকরির নথিতে তথ্য লিপিবদ্ধ ও স্বাক্ষরের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

নন-গেজেটেড কর্মচারীদের ক্ষেত্রে: ডিডিওর করা এন্ট্রি যাচাই করে সার্ভিস বহিতে ভেরিফিকেশন নম্বর ও নির্ধারিত বেতন লিপিবদ্ধ করতে হবে এবং সেখানে স্বাক্ষর করতে হবে।

গেজেটেড কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে: অনলাইনে বেতন নির্ধারণ অনুমোদনের সময় নির্ধারিত বেতন ও ভেরিফিকেশন নম্বর অডিট রেজিস্টারের মানি-কলামে লিপিবদ্ধ করে স্বাক্ষর করতে হবে।

সুতরাং, অনলাইন বিবরণীতে স্বাক্ষর প্রয়োজন না হওয়া এবং সার্ভিস বহি বা অডিট রেজিস্টারে স্বাক্ষর করার বিধান এক নয়। এই পার্থক্যটি বুঝতে না পারলে পে-ফিকেশনের কাগজপত্র নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

বাস্তবে ডিডিও ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার স্বাক্ষর চাওয়া হচ্ছে কেন?

কর্মচারীদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কিছু ক্ষেত্রে ডিডিওর স্বাক্ষরযুক্ত কপি এবং হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার স্বাক্ষর চাওয়ার কথা আলোচনায় এসেছে। তবে কোন অফিসে কী ধরনের নথিতে স্বাক্ষর চাওয়া হচ্ছে, তা যাচাই ছাড়া সব হিসাবরক্ষণ অফিসের ক্ষেত্রে একই দাবি করা ঠিক হবে না।

এ বিষয়ে তিনটি বিষয় বিবেচনা করা জরুরি।

প্রথমত, সার্ভিস বহি, অডিট রেজিস্টার বা অন্য কোনো দাপ্তরিক নথিতে স্বাক্ষর চাওয়া হলে সেটিকে সরাসরি অনলাইন বিবরণীতে স্বাক্ষর চাওয়ার সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না।

দ্বিতীয়ত, iBAS++ থেকে তৈরি অনলাইন বিবরণীতেই অতিরিক্ত স্বাক্ষর চাওয়া হলে সংশ্লিষ্ট অফিসের কাছে এর বিধিগত ভিত্তি জানতে চাওয়া যেতে পারে। কারণ উপধারা (৭)-এ অনলাইন বিবরণীর ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল স্বাক্ষরের প্রয়োজন নেই বলে উল্লেখ রয়েছে।

তৃতীয়ত, কোনো অফিস অতিরিক্ত কাগজপত্র বা স্বাক্ষর চাইলে সেটি গেজেটের বিধানের সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। লিখিত নির্দেশনা বা নির্দিষ্ট আপত্তির কারণ না জেনে কোনো অফিসকে বিধান অমান্যকারী হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।

১০ অক্টোবর ডিডিও ফরওয়ার্ড করলে এখন কী করবেন?

যেসব সরকারি কর্মচারীর বেতন নির্ধারণী বিবরণী ১০ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ডিডিও হিসাবরক্ষণ অফিসে ফরওয়ার্ড করেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে পরবর্তী ধাপ হলো সংশ্লিষ্ট বিবরণীর বর্তমান অবস্থা যাচাই করা।

তবে শুধু ফরওয়ার্ডের তারিখ দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় না যে হিসাবরক্ষণ অফিস বিবরণীটি যাচাই করেছে কিংবা অনুমোদন দিয়েছে।

কর্মচারীরা নিচের বিষয়গুলো যাচাই করতে পারেন:

১. iBAS++-এ বর্তমান অবস্থা: বিবরণী ফরওয়ার্ড হয়েছে, যাচাইাধীন রয়েছে, নাকি অনুমোদিত হয়েছে—তা দেখুন।

২. কোনো আপত্তি আছে কি না: সার্ভিস বহি, পূর্ববর্তী বেতন, পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড বা চাকরির তথ্যের সঙ্গে অসংগতি পাওয়া গেছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট অফিসে জেনে নিন।

৩. ভেরিফিকেশন নম্বর তৈরি হয়েছে কি না: চূড়ান্ত অনুমোদনের পর নম্বর তৈরি হলে তা সংরক্ষণ করুন।

৪. চাকরির নথিতে তথ্য লিপিবদ্ধ হয়েছে কি না: প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সার্ভিস বহি বা অডিট রেজিস্টারে নির্ধারিত বেতন ও ভেরিফিকেশন নম্বর সঠিকভাবে লেখা হয়েছে কি না, নিশ্চিত করুন।

৫. বিলম্ব হলে কারণ জানুন: নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও অনুমোদন না হলে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসে বিবরণীর অবস্থা ও কোনো আপত্তি থাকলে তার কারণ জানতে চান।

চূড়ান্ত অনুমোদন হলে কি বেতন পাওয়া নিশ্চিত?

হিসাবরক্ষণ অফিসের চূড়ান্ত অনুমোদন পে-ফিকেশন প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে অনুমোদন, বেতন বিল প্রস্তুত এবং অর্থ ছাড়—এগুলোকে একই ঘটনা হিসেবে দেখা উচিত নয়।

অনলাইন বিবরণী অনুমোদিত হওয়ার পর নির্ধারিত বেতনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে হবে। কোনো তথ্য ভুল থাকলে সংশোধন বা সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে। তাই শুধু আবেদন জমা দেওয়া কিংবা ডিডিওর ফরওয়ার্ড নিশ্চিত হওয়াকে চূড়ান্ত বেতন নির্ধারণের প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

সরকারি কর্মচারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

পে-ফিকেশন দ্রুত সম্পন্ন করতে চাকরির পূর্ববর্তী ইতিহাস, মূল বেতন, পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড এবং সার্ভিস বহির তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা জরুরি। ডিডিওর মাধ্যমে বিবরণী ফরওয়ার্ড হওয়ার পর অযথা নতুন করে আবেদন জমা না দিয়ে প্রথমে বিদ্যমান বিবরণীর অবস্থা যাচাই করা ভালো।

একই সঙ্গে কোনো অফিস অতিরিক্ত স্বাক্ষর বা নথি চাইলে সেটি কোন নথির জন্য চাওয়া হচ্ছে এবং কোন বিধান বা নির্দেশনার ভিত্তিতে চাওয়া হচ্ছে, তা পরিষ্কার করে নেওয়া উচিত।

শেষ কথা

জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর অনুচ্ছেদ ৩২ অনুযায়ী পে-ফিকেশনের ক্ষেত্রে ডিডিওর ফরওয়ার্ড, হিসাবরক্ষণ অফিসের অনলাইন যাচাই ও অনুমোদন এবং ভেরিফিকেশন নম্বর তৈরির প্রক্রিয়া নির্ধারিত রয়েছে। অনলাইন বিবরণীতে ম্যানুয়াল স্বাক্ষরের প্রয়োজন নেই—এ বিধানের পাশাপাশি সার্ভিস বহি ও অডিট রেজিস্টারে তথ্য লিপিবদ্ধ করে স্বাক্ষরের বিধানও রয়েছে।

তাই মূল প্রশ্ন শুধু হিসাবরক্ষণ অফিসে অনুমোদন শুরু হয়েছে কি না, তা নয়; বরং নির্দিষ্ট বিবরণীটি কোন পর্যায়ে রয়েছে এবং কোনো আপত্তি থাকলে তার কারণ কী, সেটিও জানা জরুরি। সংশ্লিষ্ট অফিসের নিশ্চিত তথ্য ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট কর্মচারীর পে-ফিকেশন অনুমোদিত হয়েছে বা সব অফিসে একইভাবে অনুমোদন চলছে—এমন দাবি করা উচিত নয়।

সারকথা: ডিডিওর ফরওয়ার্ডের পর হিসাবরক্ষণ অফিসের যাচাই ও অনুমোদনই পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। অনলাইন বিবরণী এবং সার্ভিস বহি বা অডিট রেজিস্টারের স্বাক্ষর-সংক্রান্ত বিধান আলাদা করে বুঝলেই পে-ফিকেশন নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি দূর হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *