তৃতীয় ভাষা শিক্ষা: ৫০ বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্র, চীনা-জাপানিসহ ৮ ভাষা
৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা, জাপানি, কোরীয়, আরবিসহ ৮ বিদেশি ভাষা শেখার কেন্দ্র হবে, জানাল ইউজিসি। সময়সীমা, পটভূমি ও শিক্ষার্থীদের করণীয় জানুন।
দেশের ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র চালু করা হবে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। শুক্রবার (৬ নভেম্বর ২০২৬) রাজধানীর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় মিলনায়তনে এক আন্তর্জাতিক ভাষা সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ তথ্য দেন। তাঁর ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ-দক্ষতা বাড়ানো এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রসারিত করাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। চীনা, জাপানি, কোরীয়, আরবি, জার্মান, ফরাসি, ইতালীয় ও স্প্যানিশ ভাষা শেখার সুযোগ বাড়ানোর কথা বলেছেন তিনি।
কোথায়, কী বললেন ইউজিসি চেয়ারম্যান
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব ল্যাঙ্গুয়েজেস (বিআইএল) আয়োজিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘এপিস্টেমিক রিকনফিগারেশনস ইন ল্যাঙ্গুয়েজ স্টাডিজ (ইআরএলএস) ২০২৬’-এর উদ্বোধনী পর্বে বক্তব্য দেন ইউজিসি চেয়ারম্যান। বিদেশি ভাষার দক্ষতাকে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেন, জাতীয় পরিচয় ও সংস্কৃতির ভিত্তি হিসেবে বাংলাই থাকবে কেন্দ্রে, ইংরেজি হবে বৈশ্বিক জ্ঞানের মাধ্যম; আর বিদেশি ভাষা শেখার জন্য মাতৃভাষার সঙ্গে কোনো প্রতিযোগিতার প্রয়োজন নেই।
তিনি আরও জানান, বিদেশে কাজের চাহিদা বিবেচনায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জাপানি, কোরীয়, চীনা, ইংরেজি ও আরবি ভাষার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রস্তাবিত কেন্দ্রগুলোকে কার্যকর পাঠদান মডেল তৈরি, দক্ষ ভাষা-শিক্ষক গড়ে তোলা এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ার ওপর জোর দিতে বলেন তিনি। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত কসোভোর রাষ্ট্রদূত লুলজিম প্লানা। সভাপতিত্ব করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-উপাচার্য অধ্যাপক আরশাদ মাহমুদ চৌধুরী।
পটভূমি: সেপ্টেম্বরেই এসেছিল ডিসেম্বরের লক্ষ্য
উদ্যোগটি নতুন নয়। গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বসুন্ধরার ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটিতে (আইসিসিবি) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চীনের ইউনান মিনজু বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের উন্মোচন অনুষ্ঠানে ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ-আল-মামুন জানিয়েছিলেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা শুরুর লক্ষ্য রয়েছে। সে সময় তিনি বলেছিলেন, বাণিজ্য, অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিবেচনায় ম্যান্ডারিন বা চীনা ভাষা অগ্রাধিকার পাবে এবং সব বিভাগীয় অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা কেন্দ্র গড়া হবে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারেও তৃতীয় ভাষা শিক্ষার কথা ছিল।
এর আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ৩০টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা কেন্দ্র চালুর প্রাথমিক পরিকল্পনার খবর এসেছিল। পরে পরিধি বাড়িয়ে লক্ষ্য দাঁড়ায় ৫০টিতে।
এক নজরে তৃতীয় ভাষা উদ্যোগ
| বিষয় | এখন পর্যন্ত জানা তথ্য |
|---|---|
| বাস্তবায়নকারী | বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) |
| বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা | ৫০টি (প্রাথমিক পরিকল্পনায় ছিল ৩০টি) |
| যেসব ভাষার কথা বলা হয়েছে | চীনা, জাপানি, কোরীয়, আরবি, জার্মান, ফরাসি, ইতালীয়, স্প্যানিশ |
| অগ্রাধিকারের ভাষা | চীনা (ম্যান্ডারিন), সেপ্টেম্বরে ইউজিসি সদস্যের বক্তব্য অনুযায়ী |
| সময়সীমা | ডিসেম্বর ২০২৬ (সেপ্টেম্বরের ঘোষণা অনুযায়ী) |
| সম্ভাব্য অংশীদার | বিদেশি দূতাবাস, কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান |
| যা এখনো জানানো হয়নি | বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা, বাজেট, কোর্স ফি, ক্রেডিট কাঠামো |
বিশ্লেষণ: চাকরির বাজারে কতটা কাজে আসবে
বাংলাদেশের অভিবাসী কর্মীদের বড় অংশ যায় মধ্যপ্রাচ্যে, আর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় দক্ষ কর্মী পাঠানোর সুযোগ বাড়ছে। এসব বাজারে ভাষা-দক্ষতা প্রায়ই নিয়োগের পূর্বশর্ত। দেশে চীনা বিনিয়োগ ও প্রকল্প বাড়ায় চীনা ভাষা জানা স্নাতকদের চাহিদাও তৈরি হয়েছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কাঠামোবদ্ধ ভাষা শিক্ষা চালু হলে স্নাতকেরা বাড়তি দক্ষতা নিয়ে চাকরির বাজারে ঢুকতে পারবেন বলে মনে করেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে মানসম্মত পাঠদানের জন্য যথেষ্ট প্রশিক্ষিত শিক্ষক, পাঠ্যউপকরণ ও স্থায়ী অর্থায়ন দরকার। সেপ্টেম্বরেই ইউজিসি সদস্য বিদেশি ও দেশি ভাষা বিশেষজ্ঞের প্রয়োজনের কথা স্বীকার করেছিলেন। ডিসেম্বরের সময়সীমা ঘনিয়ে এলেও কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম ধাপে থাকছে, শিক্ষার্থীদের খরচ কত হবে বা কোর্সটি ঐচ্ছিক না বাধ্যতামূলক—এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা এখনো প্রকাশ হয়নি।
শিক্ষার্থীদের জন্য প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন: তৃতীয় ভাষা বলতে কী বোঝানো হচ্ছে?
উত্তর: বাংলা ও ইংরেজির বাইরে অতিরিক্ত একটি বিদেশি ভাষা, যেমন চীনা, জাপানি, কোরীয় বা আরবি।
প্রশ্ন: কবে থেকে ক্লাস শুরু হবে?
উত্তর: সেপ্টেম্বরে ইউজিসি ডিসেম্বর ২০২৬-এর লক্ষ্যের কথা বলেছিল। চূড়ান্ত তারিখ ও তালিকা ইউজিসি বা সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণা থেকে জানা যাবে।
প্রশ্ন: এখন শিক্ষার্থীরা কী করতে পারেন?
উত্তর: নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট বা ভাষা কেন্দ্রের নোটিশ বোর্ড ও ওয়েবসাইটে নজর রাখুন। ক্যারিয়ার লক্ষ্য অনুযায়ী ভাষা বেছে নিন; যেমন জাপান বা কোরিয়ায় কাজ বা উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা থাকলে সংশ্লিষ্ট ভাষার আন্তর্জাতিক দক্ষতা পরীক্ষার প্রস্তুতি আগেভাগে শুরু করা যায়।
প্রশ্ন: এতে কি বাংলা বা ইংরেজির গুরুত্ব কমবে?
উত্তর: ইউজিসি চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী না; বাংলা জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি এবং ইংরেজি বৈশ্বিক জ্ঞানের মাধ্যম হিসেবেই থাকবে।
তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা, আমার দেশ, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা, দেশেবিদেশে, বার্তা২৪

মন্তব্য (০)