তিন মাসে রাজস্ব ঘাটতি ৪১,৮৭৯ কোটি টাকা, বড় ধস ভ্যাটে
চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে লক্ষ্যের চেয়ে ৪১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় করেছে এনবিআর। ঘাটতির প্রায় অর্ধেকই ভ্যাট খাতে, যেখানে আদায় আগের বছরের চেয়ে প্রায় ১৬ শতাংশ কমেছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তিন মাসে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকার লক্ষ্যের বিপরীতে আদায় হয়েছে ৯২ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা, অর্থাৎ লক্ষ্যের প্রায় ৩১ শতাংশ অপূর্ণ থেকে গেছে। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) এনবিআরের হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে দেশের একাধিক সংবাদমাধ্যম এ চিত্র তুলে ধরেছে।
আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় মোট আদায় সামান্য বেড়েছে, তবে প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশেরও নিচে। অথচ সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১২ শতাংশ।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা ভ্যাটে
রাজস্বের তিন প্রধান খাত—মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), আয়কর ও আমদানি-রপ্তানি শুল্ক—কোনোটিতেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। তবে ঘাটতির প্রায় অর্ধেকই এসেছে ভ্যাট খাত থেকে। প্রথম আলোর তথ্য অনুযায়ী, তিন মাসে ভ্যাটে লক্ষ্য ছিল ৪৯ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে ২৯ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা। এ খাতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৫৭ কোটি টাকা।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন বলছে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ভ্যাট আদায় প্রায় ১৬ শতাংশ কমেছে, যেখানে গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এ খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ২১ শতাংশ।
অন্য দুই খাতের মধ্যে আয়কর ও ভ্রমণ কর মিলিয়ে ৪২ হাজার ৭২৬ কোটি টাকার লক্ষ্যের বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩৩ হাজার ৪০ কোটি টাকা। আর আমদানি-রপ্তানি শুল্কে ৪২ হাজার ২৬৫ কোটি টাকার লক্ষ্যের বিপরীতে এসেছে ৩০ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। লক্ষ্য পূরণ না হলেও আগের বছরের তুলনায় এই দুই খাতে আদায় বেড়েছে।
ঘাটতির কারণ নিয়ে ভিন্নমত
এনবিআর-সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের নিয়ম পরিবর্তনকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন। মাসিকের বদলে তিন মাস পরপর রিটার্ন দাখিলের সুযোগ দেওয়ায় জুলাই-আগস্টে অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত ভ্যাট জমা দেয়নি বলে তাঁদের ধারণা। চলতি অক্টোবরে সরকার আবার মাসিক রিটার্ন পদ্ধতিতে ফিরে গেছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের অনেকে মূল সমস্যা দেখছেন অর্থনীতির শ্লথগতিতে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেছেন, দুর্বল অর্থনীতিই কম আদায়ের মূল কারণ। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ প্রথম আলোকে তিনটি কারণের কথা বলেছেন—অর্থনীতির ধীরগতি, অতিরিক্ত বড় লক্ষ্যমাত্রা এবং প্রশাসনিক স্থবিরতা।
সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছেন, ত্রৈমাসিক ভ্যাট দাখিলের পূর্ণ প্রভাব এখনই মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়; অক্টোবরের তথ্য পেলে প্রবণতা আরও স্পষ্ট হবে। তাঁর হিসাবে আদায় উল্লেখযোগ্য হারে না বাড়লে বছর শেষে ঘাটতি প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
বছরের লক্ষ্য ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি
চলতি অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের প্রকৃত আদায়ের চেয়ে প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি। প্রথম তিন মাসের ধীরগতির কারণে বাকি নয় মাসে লক্ষ্য পূরণের চাপ আরও বেড়েছে।
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিব মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে বিশেষ সভা করেছেন এবং আদায় কার্যক্রম জোরদারের তাগিদ দিয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে।
প্রেক্ষাপট
রাজস্ব আদায়ের এই চিত্র এমন এক সময়ে এল, যখন সামষ্টিক অর্থনীতি নানা চাপের মধ্যে রয়েছে। প্রথম প্রান্তিকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৩.৮৯ শতাংশ, যা প্রথম প্রান্তিকের হিসাবে সর্বনিম্ন। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) চলতি অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩.২ শতাংশে নামিয়েছে। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, রাজস্ব আদায় কম হলে সরকারের উন্নয়ন ও অন্যান্য ব্যয়ের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে, ফলে ঋণনির্ভরতা বাড়ার ঝুঁকি থাকে।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা




মন্তব্য (০)