মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুমোদন করল তুরস্কের সংসদ, পক্ষে ২৭৯ ভোট
সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে ত্রিদেশীয় মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি ২৭৯-১১৯ ভোটে অনুমোদন করল তুরস্কের সংসদ। চুক্তিতে কী আছে, পটভূমি ও প্রভাব জানুন।

ঢাকা, ৬ নভেম্বর ২০২৬: সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে করা ত্রিদেশীয় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি—যা ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে পরিচিত—আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেছে তুরস্কের জাতীয় সংসদ (গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি)। বৃহস্পতিবার রাতে হওয়া ভোটে চুক্তির পক্ষে পড়েছে ২৭৯ ভোট, বিপক্ষে ১১৯। ৫৯২ আসনের সংসদে ভোটে অংশ নেন ৩৯৮ জন সদস্য। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর বরাতে খবরটি শুক্রবার প্রকাশ করেছে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। এই অনুমোদনের ফলে ন্যাটোর সদস্য একটি দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এমন এক সামরিক জোটে যুক্ত হলো, যেখানে একটি দেশের ওপর হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে কী আছে
চুক্তির মূল ধারা হলো সম্মিলিত প্রতিরোধ। এতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা তিন দেশের বিরুদ্ধেই হামলা বলে বিবেচিত হবে। এর পাশাপাশি প্রতিরক্ষা খাতের সব ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানো, যৌথ সামরিক কার্যক্রম সমন্বয় এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে অংশীদারত্বের কথাও রয়েছে।
পাকিস্তানের এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সৌদি রাজধানী রিয়াদে একটি সাধারণ সচিবালয় থাকবে। গঠনকালীন প্রথম তিন বছর এই সচিবালয়ের নেতৃত্ব দেবে পাকিস্তান। তবে তুরস্কের সংবিধান অনুযায়ী, কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি থাকলেও দেশের বাইরে সেনা পাঠাতে সংসদের আলাদা অনুমোদন লাগবে—অর্থাৎ চুক্তি কার্যকর হলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে তুর্কি সেনা মোতায়েন হবে না।
পটভূমি: রিয়াদ থেকে মক্কা
এই জোটের ভিত্তি তৈরি হয় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে, যখন রিয়াদে পাকিস্তান ও সৌদি আরব একটি ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সই করে। সেখানেও বলা হয়েছিল, এক দেশের ওপর আগ্রাসন দুই দেশের ওপর আগ্রাসন হিসেবে দেখা হবে। প্রায় এক বছরের আলোচনার পর তুরস্ক তাতে যুক্ত হয়।
পাকিস্তানের ডন পত্রিকার খবর অনুযায়ী, চলতি বছরের ৭ আগস্ট মক্কার আল-সাফা প্রাসাদে আয়োজিত শীর্ষ সম্মেলনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ত্রিদেশীয় চুক্তিতে সই করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তখন চুক্তিটিকে স্বাগত জানান।
সময়রেখা: এক নজরে মক্কা চুক্তি
| তারিখ | ঘটনা |
|---|---|
| সেপ্টেম্বর ২০২৫ | রিয়াদে পাকিস্তান-সৌদি কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই |
| ৭ আগস্ট ২০২৬ | মক্কায় তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের ত্রিদেশীয় চুক্তি সই |
| ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ইস্তাম্বুলে কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির প্রথম বৈঠক |
| ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | জোটের প্রথম মহাসচিব হিসেবে পাকিস্তানের একজন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়োগ |
| ২০ অক্টোবর ২০২৬ | অনুমোদনের জন্য চুক্তিটি তুরস্কের সংসদে উত্থাপন |
| ৫ নভেম্বর ২০২৬ (রাত) | তুর্কি সংসদে ২৭৯-১১৯ ভোটে অনুমোদন |
সংসদে কে কী বললেন
সংসদীয় বিতর্কে ক্ষমতাসীন একে পার্টির সংসদ সদস্য জিয়া আলতুনিয়ালদিজ বলেন, চুক্তিটি তৃতীয় কোনো দেশকে লক্ষ্য করে নয়; এর উদ্দেশ্য সংঘাত বাড়ানো নয়, বরং ঠেকানো। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল সিএইচপির সংসদ সদস্য মেহমেত গুজেলমানসুর সতর্ক করেন, তুরস্কের অন্যান্য আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে যেন সংঘাত না হয়, সে জন্য স্পষ্ট নিয়মকানুন দরকার। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এর আগে জানিয়েছিলেন, শান্তির অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রাখে এমন আঞ্চলিক দেশগুলোও ভবিষ্যতে এই জোটে যোগ দিতে পারে।
ভোটের দিনই সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স আবদুলআজিজ বিন সৌদ বিন নায়েফ আঙ্কারায় তুর্কি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। সৌদি সংবাদমাধ্যম আশারক আল-আওসাতের খবরে বলা হয়, তিনি চুক্তিটিকে রিয়াদ-আঙ্কারার দৃঢ় সম্পর্ক ও অভিন্ন কৌশলগত স্বার্থের প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
বিশ্লেষণ: কেন এই জোট গুরুত্বপূর্ণ
তিন দেশের সামরিক সক্ষমতা একসঙ্গে দেখলে জোটটির ওজন স্পষ্ট হয়। তুরস্কের রয়েছে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী ও দ্রুত বেড়ে ওঠা ড্রোন শিল্প; পাকিস্তান মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ; আর সৌদি আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি। কয়েক দশক ধরেই পাকিস্তান সৌদি সেনাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে, আর ২০২৩ সালে সৌদি আরব তুরস্ক থেকে ড্রোন কেনার চুক্তি করে, যাকে আঙ্কারা তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা রপ্তানি হিসেবে বর্ণনা করেছিল।
চুক্তিটি এমন সময়ে কার্যকরের পথে গেল, যখন মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা তীব্র। জুলাই থেকে ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরবের শহর, তেল স্থাপনা ও নৌপথ লক্ষ্য করে বারবার হামলা চালাচ্ছে। হরমুজ প্রণালিতেও উত্তেজনা চলছে। তবে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা নীতির সঙ্গে তুরস্কের এই নতুন অঙ্গীকার কীভাবে খাপ খাবে—বিরোধী দলের উদ্বেগও মূলত সেখানেই।
প্রশ্নোত্তর: পাঠকের যা জানা দরকার
চুক্তি কি এখনই কার্যকর?
তুরস্কের সংসদের অনুমোদনের মাধ্যমে চুক্তি কার্যকর হওয়ার পথ খুলেছে। আনুষ্ঠানিক কার্যকরের তারিখ তিন দেশ এখনো ঘোষণা করেনি।
হামলা হলেই কি তুর্কি সেনা যাবে?
না। তুরস্কের সংবিধান অনুযায়ী বিদেশে সেনা পাঠাতে প্রতিবার সংসদের আলাদা অনুমোদন লাগবে।
অন্য দেশ কি যোগ দিতে পারবে?
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী সে সুযোগ খোলা রাখা হয়েছে, তবে নতুন কোনো দেশ যোগ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি। বাংলাদেশ এই চুক্তির অংশ নয়।
তথ্যসূত্র: আনাদোলু এজেন্সি, এক্সপ্রেস ট্রিবিউন, ডন, আশারক আল-আওসাত, দ্য নিউ আরব।


মন্তব্য (০)