গ্রাম পুলিশের বেতন বাড়ল: সদস্য সাড়ে ১০ হাজার, প্রধান ১১ হাজার টাকা
গ্রাম পুলিশের বেতন বাড়ল ৪০ শতাংশ: সদস্য পাবেন ১০,৫০০ টাকা, প্রধান ১১ হাজার। মোবাইল বিল, অবসর ভাতা ও নারী সদস্যদের ছুটিতে কী বদল—জানুন এক নজরে।

ঢাকা, ৭ নভেম্বর ২০২৬: গ্রাম পুলিশ সদস্যদের মাসিক বেতন সাড়ে ৭ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার ৫০০ টাকা করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাহিনীর প্রধানের (আগের দফাদার) বেতন ৮ হাজার থেকে বেড়ে হচ্ছে ১১ হাজার টাকা। পাশাপাশি অবসরকালীন এককালীন ভাতা বাড়ানো, প্রত্যেক সদস্যের মোবাইল বিল বাবদ মাসে ১৫০ টাকা দেওয়া এবং থানায় হাজিরার সাপ্তাহিক ভাতা বাড়ানোর কথাও জানিয়েছেন তিনি। শনিবার জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে গ্রাম পুলিশের মহাসমাবেশে এসব ঘোষণা আসে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নতুন সিদ্ধান্ত আজ থেকেই কার্যকর।
এক নজরে নতুন বেতন-ভাতা
একাধিক সংবাদমাধ্যম ও রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসের প্রতিবেদন মিলিয়ে ঘোষিত বেতন-ভাতার চিত্র নিচে দেওয়া হলো।
| খাত | পদ | আগে | এখন |
|---|---|---|---|
| মাসিক বেতন | গ্রাম পুলিশ সদস্য | ৭,৫০০ টাকা | ১০,৫০০ টাকা |
| মাসিক বেতন | গ্রাম পুলিশ প্রধান | ৮,০০০ টাকা | ১১,০০০ টাকা |
| অবসরকালীন ভাতা | গ্রাম পুলিশ সদস্য | ৭০,০০০ টাকা | ৮০,০০০ টাকা |
| অবসরকালীন ভাতা | গ্রাম পুলিশ প্রধান | ৮০,০০০ টাকা | ১,০০,০০০ টাকা |
| থানায় হাজিরার সাপ্তাহিক ভাতা | গ্রাম পুলিশ সদস্য | ৩০০ টাকা | ৫০০ টাকা |
| থানায় হাজিরার সাপ্তাহিক ভাতা | গ্রাম পুলিশ প্রধান | ৩০০ টাকা | ৬০০ টাকা |
| মোবাইল বিল | প্রত্যেক সদস্য | — | মাসে ১৫০ টাকা |
হিসাব বলছে, একজন সদস্যের মাসিক বেতন বাড়ছে ৩ হাজার টাকা, অর্থাৎ ৪০ শতাংশ। প্রধানের বেতন বাড়ছে প্রায় সাড়ে ৩৭ শতাংশ। সদস্যদের সাপ্তাহিক থানা-হাজিরা ভাতা মাসে চার সপ্তাহ ধরলে বাড়তি আসবে আরও প্রায় ৮০০ টাকা।
উল্লেখ্য, সদস্যদের আগের বেতন ও অবসর ভাতার অঙ্ক নিয়ে কয়েকটি প্রতিবেদনে সামান্য ভিন্নতা আছে; টেবিলে বেশির ভাগ সূত্রে মিলে যাওয়া অঙ্কই রাখা হয়েছে। নতুন অঙ্কগুলো সব সূত্রেই এক।
বেতনের বাইরে আর কী ঘোষণা
- পদবি বদল: ‘মহল্লাদার’ পদবি বদলে হচ্ছে ‘গ্রাম পুলিশ সদস্য’, আর ‘দফাদার’ হচ্ছেন ‘গ্রাম পুলিশ প্রধান’।
- নারী সদস্যদের মাতৃত্বকালীন ছুটি: নারী গ্রাম পুলিশ সদস্যরা ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি পাবেন।
- নারী নিয়োগ: বাসসের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিটি ইউনিয়নে আরও দুজন নারী গ্রাম পুলিশ নিয়োগ দেওয়া হবে।
- সড়কের নামকরণ: একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিটি ইউনিয়নের একটি দীর্ঘ সড়কের নাম গ্রাম পুলিশের নামে রাখা হবে, দুই পাশে গাছ লাগানো হবে এবং ভবিষ্যতে সেই গাছ বিক্রির অর্থ পাবেন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ সদস্যরা।
- বাইসাইকেল: ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাঁচ বছরের বদলে তিন থেকে সাড়ে তিন বছর পরপর নতুন সাইকেল দিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে বলবেন বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
পটভূমি: গ্রামের নিরাপত্তার প্রথম সারির বাহিনী
গ্রাম পুলিশ ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে কাজ করে। সাধারণত প্রতিটি ইউনিয়নে একজন দফাদার এবং প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন করে মহল্লাদার থাকেন। রাত-পাহারা, জন্ম-মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ, গ্রামের অপরাধ ও অস্বাভাবিক ঘটনার খবর থানায় পৌঁছে দেওয়া, ইউনিয়ন পরিষদের নোটিশ জারি, নির্বাচন ও দুর্যোগের সময় স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তা—এসব দায়িত্ব তাঁদের। প্রতি সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে থানায় হাজির হয়ে এলাকার পরিস্থিতি জানাতে হয়, যার জন্যই সাপ্তাহিক যাতায়াত ভাতা দেওয়া হয়।
দীর্ঘদিন ধরেই গ্রাম পুলিশ সদস্যরা বেতন বাড়ানো, চাকরি জাতীয়করণ ও পূর্ণাঙ্গ সরকারি কর্মচারীর মর্যাদার দাবি জানিয়ে আসছেন। নিত্যপণ্যের দাম যে হারে বেড়েছে, তাতে সাড়ে ৭ হাজার টাকায় সংসার চালানো কঠিন—এমন অভিযোগ বিভিন্ন সময় তাঁদের সংগঠনগুলো তুলে ধরেছে। শনিবারের মহাসমাবেশে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে গ্রাম পুলিশ সদস্যরা অংশ নেন।
বিশ্লেষণ: কতটা স্বস্তি, কোথায় প্রশ্ন
৪০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি নিম্ন আয়ের এই বাহিনীর জন্য বড় স্বস্তি। মোবাইল বিল দেওয়ার সিদ্ধান্তও বাস্তবসম্মত, কারণ মাঠপর্যায়ের তথ্য থানা ও ইউনিয়ন পরিষদে পৌঁছাতে ফোনই এখন প্রধান মাধ্যম। নারী সদস্য বাড়ানো ও মাতৃত্বকালীন ছুটির সিদ্ধান্ত বাহিনীতে নারীর অংশগ্রহণ উৎসাহিত করতে পারে, বিশেষ করে নারী ও শিশুসংক্রান্ত ঘটনায় গ্রামে নারী সদস্যের প্রয়োজন বেশি।
তবে কয়েকটি প্রশ্ন এখনো খোলা। বাড়তি ব্যয়ের পুরোটা সরকার বহন করবে, নাকি ইউনিয়ন পরিষদকেও এর অংশ দিতে হবে—তা আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট হবে। আর্থিকভাবে দুর্বল অনেক ইউনিয়ন পরিষদের জন্য বাড়তি দায় চাপ তৈরি করতে পারে। এ ছাড়া জাতীয়করণের মূল দাবির বিষয়ে ঘোষণায় কিছু বলা হয়নি।
প্রশ্নোত্তর: গ্রাম পুলিশ সদস্যদের যা জানা দরকার
নতুন বেতন কবে থেকে পাওয়া যাবে?
প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, সিদ্ধান্ত ৭ নভেম্বর থেকেই কার্যকর। তবে বাস্তবে বেতন ছাড়ের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগের আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন বা পরিপত্র প্রয়োজন হবে। সেটি জারি হলে কোন মাস থেকে, বকেয়াসহ কীভাবে পরিশোধ হবে, তা জানা যাবে।
মোবাইল বিল কীভাবে দেওয়া হবে?
ঘোষণায় প্রত্যেক সদস্যের জন্য মাসে ১৫০ টাকার কথা বলা হয়েছে। এটি বেতনের সঙ্গে নাকি আলাদাভাবে দেওয়া হবে, তা প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত হবে।
সদস্যদের এখন কী করা উচিত?
ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসনের কাছ থেকে প্রজ্ঞাপনের অনুলিপি সংগ্রহ করুন, নিজের সার্ভিস রেকর্ড ও ব্যাংক হিসাবের তথ্য হালনাগাদ রাখুন এবং গুজবে কান না দিয়ে সরকারি নির্দেশনার অপেক্ষা করুন।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), প্রথম আলো, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা, দৈনিক আমার দেশ, চ্যানেল আই অনলাইন।
মন্তব্য (০)