গুগলের ডেটা সেন্টার: ওয়াইওমিংয়ে ১৭ বিলিয়ন ডলার, চলবে ফুয়েল সেলে
ওয়াইওমিংয়ে প্রথম ডেটা সেন্টার গড়তে ১৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে গুগল। ৭০২ মেগাওয়াট ফুয়েল সেল, কার্বন ক্যাপচার, কর্মসংস্থান ও বিতর্ক জানুন।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াইওমিং অঙ্গরাজ্যে প্রথমবারের মতো ডেটা সেন্টার গড়তে ১৭ বিলিয়ন (১ হাজার ৭০০ কোটি) মার্কিন ডলারের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে গুগল। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর ২০২৬) প্রতিষ্ঠানটির অফিশিয়াল ব্লগে এ ঘোষণা আসে। লারামি কাউন্টিতে, রাজ্যের রাজধানী শাইয়েন এলাকায় হবে এই স্থাপনা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কাজের জন্য বিপুল বিদ্যুৎ লাগবে বলে এর বড় অংশ আসবে প্রাকৃতিক গ্যাসচালিত ৭০২ মেগাওয়াটের একটি ফুয়েল সেল প্রকল্প থেকে, যাতে কার্বন ধরে মাটির নিচে সংরক্ষণের (কার্বন ক্যাপচার অ্যান্ড স্টোরেজ বা সিসিএস) ব্যবস্থা থাকবে। গুগলের দাবি, এ ধরনের প্রকল্পের মধ্যে এটিই এখন পর্যন্ত পরিকল্পিত সবচেয়ে বড়।
ঘোষণায় কী আছে
গুগলের বৈশ্বিক অবকাঠামো ও জ্বালানি বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট স্টিভ ওয়াল্টারের নামে প্রকাশিত ব্লগে জানানো হয়, প্রকল্পে অংশীদার হিসেবে থাকছে টলগ্রাস এনার্জি, ব্ল্যাক হিলস এনার্জি, আমেরিকান ইলেকট্রিক পাওয়ার (এইপি), রিলেটেড ডিজিটাল এবং ব্লুম এনার্জি। ফুয়েল সেলগুলো যুক্তরাষ্ট্রেই তৈরি করবে ব্লুম এনার্জি। এর বাইরে টলগ্রাস ও ব্ল্যাক হিলসের পরিচালিত গ্যাস জেনারেটর থেকেও বিদ্যুৎ নেওয়া হবে। টলগ্রাসের কম্বাইন্ড সাইকেল টারবাইনে সিসিএস যোগ করা যায় কি না, তা যাচাইয়ে একটি প্রাথমিক প্রকৌশল সমীক্ষাও চলবে।
গুগল বলছে, স্থাপনাটি যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে তার পুরো খরচ প্রতিষ্ঠানটি নিজেই বহন করবে। অর্থাৎ স্থানীয় গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিলে এর চাপ না পড়ার কথা বলা হয়েছে। পানি সংকটের আশঙ্কা কমাতে ডেটা সেন্টারটি বাতাসে ঠান্ডা (এয়ার-কুলড) রাখা হবে।
পটভূমি: অক্টোবরেই এসেছিল ফুয়েল সেল চুক্তি
গুগলের এই ঘোষণার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল কয়েক সপ্তাহ আগে। গত ১৫ অক্টোবর ওহাইওভিত্তিক বিদ্যুৎ কোম্পানি এইপি শাইয়েনের কাছে ৭০২ মেগাওয়াটের ফুয়েল সেল কেন্দ্র নির্মাণে ৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা জানায়। সেই কেন্দ্র থেকে ২০ বছর মেয়াদে বিদ্যুৎ কিনবে গুগল। ইএসজি টুডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্মাণকাজ চলতি বছরেই শুরুর পরিকল্পনা, আর পূর্ণমাত্রায় চালু হওয়ার লক্ষ্য ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ। তখনও অবশ্য ডেটা সেন্টারে গুগলের মোট বিনিয়োগের অঙ্ক প্রকাশ করা হয়নি; ৫ নভেম্বর সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হলো।
এক নজরে প্রকল্পের মূল তথ্য
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| মোট বিনিয়োগ | ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (দীর্ঘমেয়াদি) |
| অবস্থান | লারামি কাউন্টি, শাইয়েন, ওয়াইওমিং (রাজ্যে গুগলের প্রথম ডেটা সেন্টার) |
| প্রধান বিদ্যুৎ উৎস | ৭০২ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক ফুয়েল সেল (এইপি), সঙ্গে কার্বন ক্যাপচার |
| ফুয়েল সেল কেন্দ্রের ব্যয় | প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার (এইপির ঘোষণা) |
| বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি | ২০ বছর মেয়াদি |
| নির্মাণকালে কর্মসংস্থান | রাজ্যজুড়ে ৮,৮০০-এর বেশি; সর্বোচ্চ পর্যায়ে সাইটে প্রায় ২,৫০০ দক্ষ শ্রমিক |
| চালুর পর কর্মসংস্থান | বছরে ৩,৭০০-এর বেশি; এর মধ্যে ২৫০টি সরাসরি পদ |
| শীতলীকরণ | এয়ার-কুলড, পানির ব্যবহার কমাতে |
| কার্বন সংরক্ষণ | টলগ্রাসের ইস্টার্ন ওয়াইওমিং সিকোয়েস্ট্রেশন হাব |
সূত্র: গুগলের অফিশিয়াল ব্লগ, এইপির ঘোষণা (ইএসজি টুডে)
বিশ্লেষণ: এআই-এর বিদ্যুৎ ক্ষুধা আর রাজনৈতিক চাপ
এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও চালাতে যে বিপুল কম্পিউটিং শক্তি দরকার, তার জোগান দিতে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ডেটা সেন্টারের সঙ্গে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎসও নিশ্চিত করছে। গ্রিডের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি ফুয়েল সেল বা গ্যাস জেনারেটর থেকে বিদ্যুৎ নেওয়ার এই কৌশল দ্রুত সম্প্রসারণের পথ খুলে দেয়। গুগল জানিয়েছে, এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের চুক্তিবদ্ধ সিসিএস সক্ষমতা প্রায় ১ গিগাওয়াটে পৌঁছাল।
তবে সমালোচনাও আছে। ফুয়েল সেলগুলো শেষ পর্যন্ত প্রাকৃতিক গ্যাসেই চলবে, তাই কার্বন ক্যাপচার কতটা কার্যকর হবে তা বাস্তবায়নের পরই বোঝা যাবে। ঘোষণাটি এমন সময়ে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর বিভিন্ন জায়গায় ডেটা সেন্টারবিরোধী মনোভাব জোরালো হয়েছে; বিদ্যুৎ বিল, পানি ও জমির ব্যবহার নিয়ে স্থানীয়দের আপত্তি বাড়ছে। এআই অবকাঠামোয় খরচের গতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সংশয়ে সাম্প্রতিক দিনে প্রযুক্তি শেয়ারেও দরপতন দেখা গেছে। এই প্রেক্ষাপটে গুগল স্থানীয় সম্পত্তি কর, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুবিধার কথা সামনে এনেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, লারামি কাউন্টি ও স্কুল ডিস্ট্রিক্ট ১ কয়েক শ মিলিয়ন ডলার সম্পত্তি কর পাবে এবং ২০০-এর বেশি স্থানীয় বাসিন্দার মতামত নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের পাঠকের জন্য প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন: ফুয়েল সেল কীভাবে বিদ্যুৎ তৈরি করে?
উত্তর: ফুয়েল সেল জ্বালানি পোড়ায় না; রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এইপির দাবি, এ কারণে প্রচলিত গ্যাস কেন্দ্রের তুলনায় নির্গমন কম হয়।
প্রশ্ন: সাধারণ ব্যবহারকারীর কাছে এর গুরুত্ব কী?
উত্তর: জিমেইল, ইউটিউব, গুগল সার্চ বা জেমিনির মতো সেবা চলে এসব ডেটা সেন্টারে। সক্ষমতা বাড়লে এআই সেবার গতি ও পরিধি বাড়ে, যার সুবিধা বাংলাদেশসহ বিশ্বের ব্যবহারকারীরাও পান।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের জন্য কোনো শিক্ষা আছে কি?
উত্তর: দেশে ডেটা সেন্টার ও ক্লাউড সেবার চাহিদা বাড়ছে। গুগলের প্রকল্প দেখায়, বড় ডেটা সেন্টারের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, পানি সাশ্রয়ী শীতলীকরণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন সমান গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন: ডেটা সেন্টার কবে চালু হবে?
উত্তর: গুগল নির্দিষ্ট তারিখ জানায়নি। তবে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী ফুয়েল সেল কেন্দ্রটি ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ পূর্ণমাত্রায় চালুর লক্ষ্য রয়েছে।
তথ্যসূত্র: গুগল ব্লগ, এ নিউজ, ইএসজি টুডে, দ্য নিউরন



মন্তব্য (০)