ডেঙ্গু পরিস্থিতি: ২৪ ঘণ্টায় ৩ মৃত্যু, ভর্তি ১৫৩৫; বছরে মৃত্যু ৪৫৫
ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৫৩৫ জন—অর্ধেকই ঢাকা বিভাগে। চলতি বছর মৃত্যু ৪৫৫, ভর্তি প্রায় দেড় লাখ। পরিসংখ্যান ও করণীয় জানুন।

নভেম্বরে পা দিয়েও ডেঙ্গুর দাপট কমার লক্ষণ নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শুক্রবারের (৬ নভেম্বর ২০২৬) বুলেটিন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৩৫ জন, যাঁদের প্রায় অর্ধেক—৭২১ জন—ঢাকা বিভাগের। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৪৫৫ জনে, আর হাসপাতালে ভর্তি রোগী ছাড়িয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার।
ডেঙ্গু পরিস্থিতির পটভূমি
সাধারণত বর্ষা মৌসুমে, অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি থাকে বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু গত কয়েক বছরের মতো এবারও সেই ধারণা ভেঙে অক্টোবর-নভেম্বরে সংক্রমণ উচ্চমাত্রায় রয়ে গেছে। জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে মৃত্যু ছিল মাত্র ৫ জনের। জুন থেকে সংখ্যা বাড়তে শুরু করে এবং সেপ্টেম্বরে এক লাফে ১৪৮ জনে পৌঁছায়।
অক্টোবর মাসে ১৭৪ জনের মৃত্যু হয়, যা চলতি বছরের সর্বোচ্চ মাসিক মৃত্যু। নভেম্বরের প্রথম ছয় দিনেই মারা গেছেন ৩৬ জন—দিনে গড়ে ছয়জন। এই ধারা চলতে থাকলে নভেম্বরও বছরের অন্যতম প্রাণঘাতী মাস হয়ে উঠতে পারে।
তথ্য-উপাত্তে এক নজরে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ বুলেটিনে গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগভিত্তিক নতুন ভর্তির চিত্র:
| বিভাগ | নতুন ভর্তি (২৪ ঘণ্টা) |
|---|---|
| ঢাকা | ৭২১ |
| চট্টগ্রাম | ২৭৫ |
| খুলনা | ১৬১ |
| বরিশাল | ১৪৩ |
| রাজশাহী | ১০৪ |
| ময়মনসিংহ | ৮৮ |
| রংপুর | ৪৩ |
| মোট | ১,৫৩৫ |
মৃত তিনজনের মধ্যে দুজন ঢাকা বিভাগের এবং একজন খুলনা বিভাগের। চলতি বছরের সামগ্রিক হিসাব:
| সূচক (১ জানুয়ারি থেকে) | সংখ্যা |
|---|---|
| হাসপাতালে মোট ভর্তি | ১,৪৫,৯০৬ |
| সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র | ১,৩৯,৬৭৮ |
| বর্তমানে চিকিৎসাধীন | ৫,৭৭৩ |
| মোট মৃত্যু | ৪৫৫ |
মাসভিত্তিক মৃত্যু: জানুয়ারি ২, ফেব্রুয়ারি ২, মার্চ ও এপ্রিল ০, মে ১, জুন ১৩, জুলাই ৩৬, আগস্ট ৪৩, সেপ্টেম্বর ১৪৮, অক্টোবর ১৭৪ এবং নভেম্বরে (৬ তারিখ পর্যন্ত) ৩৬ জন।
বিশ্লেষণ: সংখ্যা কী বলছে
ইতিবাচক দিক হলো, ভর্তি হওয়া রোগীদের প্রায় ৯৬ শতাংশ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন এবং ভর্তি রোগীর বিপরীতে মৃত্যুহার এক শতাংশের এক-তৃতীয়াংশের মতো (প্রায় ০.৩১ শতাংশ)। তবে দৈনিক দেড় হাজারের বেশি নতুন রোগী এবং পাঁচ হাজারের বেশি চিকিৎসাধীন রোগী হাসপাতালগুলোর ওপর বড় চাপ তৈরি করছে।
নতুন রোগীর ৪৭ শতাংশ ঢাকা বিভাগের হলেও চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশালেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় রোগী মিলছে—অর্থাৎ ডেঙ্গু এখন আর রাজধানীকেন্দ্রিক সমস্যা নয়। মৌসুমের শেষভাগে থেমে থেমে বৃষ্টি, নির্মাণাধীন ভবন ও জমে থাকা পানিতে এডিস মশার প্রজনন অব্যাহত থাকায় সংক্রমণ দীর্ঘায়িত হচ্ছে বলে কীটতত্ত্ববিদেরা সাধারণত মনে করেন। শীত পুরোপুরি না নামা পর্যন্ত ঝুঁকি থাকছেই।
আরেকটি উদ্বেগের জায়গা হলো, অনেক রোগী দেরিতে হাসপাতালে আসেন। জ্বর কমে যাওয়ার পরের সময়টিতেই ডেঙ্গুর জটিলতা—রক্তক্ষরণ বা শক—দেখা দিতে পারে, তাই এ সময় অবহেলা প্রাণঘাতী হতে পারে।
পাঠকের জন্য করণীয়
- জ্বর হলেই পরীক্ষা: জ্বরের প্রথম দিন থেকেই এনএস১ পরীক্ষা করালে দ্রুত ডেঙ্গু শনাক্ত করা যায়। সরকারি হাসপাতালে এই পরীক্ষা স্বল্প খরচে হয়।
- বিপদচিহ্ন চিনুন: তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক-মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা প্রস্রাব কমে যাওয়া দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে যান।
- ব্যথানাশক সাবধানে: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনজাতীয় ওষুধ খাবেন না; জ্বরে সাধারণত প্যারাসিটামলই নিরাপদ।
- পর্যাপ্ত তরল: পানি, ডাবের পানি, স্যালাইন ও তরল খাবার বেশি করে খান।
- প্রজননস্থল ধ্বংস: ফুলের টব, ফ্রিজের ট্রে, টায়ার, পরিত্যক্ত পাত্রে তিন দিনের বেশি পানি জমতে দেবেন না।
- দিনেও সুরক্ষা: এডিস মশা মূলত দিনে কামড়ায়; শিশুদের দিনের ঘুমেও মশারি ব্যবহার করুন।
প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন: শীত এলে কি ডেঙ্গু কমে যাবে?
উত্তর: তাপমাত্রা কমলে এডিস মশার বংশবৃদ্ধি ধীর হয়, তাই সাধারণত ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে সংক্রমণ কমে আসে। তবে ঘরের ভেতরে জমা পানিতে মশা টিকে থাকতে পারে, তাই সতর্কতা ছাড়ার সময় এখনো আসেনি।
প্রশ্ন: আগে একবার ডেঙ্গু হলে কি আবার হতে পারে?
উত্তর: হ্যাঁ। ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ধরন আছে। একটি ধরনে আক্রান্ত হলে সেটির বিরুদ্ধে সুরক্ষা তৈরি হয়, কিন্তু অন্য ধরনে আবার আক্রান্ত হওয়া সম্ভব এবং দ্বিতীয়বার জটিলতার ঝুঁকি বেশি থাকে।
প্রশ্ন: পরামর্শের জন্য কোথায় যোগাযোগ করব?
উত্তর: নিকটস্থ সরকারি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করুন। স্বাস্থ্য বাতায়নের ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন করেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যায়।
সব মিলিয়ে, সুস্থতার হার আশাব্যঞ্জক হলেও নভেম্বরের শুরুর মৃত্যুর হার বলছে মৌসুম শেষ হয়নি। মশার প্রজননস্থল নির্মূলে নাগরিক উদ্যোগ এবং জ্বর হলে দ্রুত পরীক্ষা—এই দুটিই এখন মৃত্যু কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
তথ্যসূত্র: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু বিষয়ক দৈনিক বুলেটিন, আজকের পত্রিকা, চ্যানেল আই অনলাইন, যুগান্তর।


মন্তব্য (০)