রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলারের নিচে: আকুর ১৬৪ কোটি ডলার শোধের পর কী দাঁড়াল
আকুর সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের ১৬৪ কোটি ডলারের আমদানি বিল শোধের পর বিপিএম৬ হিসাবে রিজার্ভ নেমেছে প্রায় ২৯.৯৯ বিলিয়ন ডলারে। কারণ, প্রভাব ও সামনে কী—জানুন।

ঢাকা, ৭ নভেম্বর ২০২৬: এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) দুই মাসের আমদানি বিল পরিশোধের পর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবার ৩০ বিলিয়ন ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমার নিচে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মেয়াদের প্রায় ১৬৪ কোটি ডলার (১.৬৪ বিলিয়ন) পরিশোধ করা হয়। এরপর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৯ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের দিন ছিল ৩১ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার। মোট বা গ্রস রিজার্ভ নেমেছে প্রায় ৩৪ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারে।
রিজার্ভ কত কমল: আগে ও পরের হিসাব
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, আকুর দায় মেটানোর আগে বুধবার দিনশেষে বিপিএম৬ রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৫১ বিলিয়ন এবং গ্রস রিজার্ভ ৩৬ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার। পরিশোধের পর দুই হিসাবেই কমেছে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার। নিচের টেবিলে চলতি অর্থবছরে রিজার্ভের গতিপথ তুলে ধরা হলো।
| তারিখ | বিপিএম৬ রিজার্ভ | গ্রস রিজার্ভ |
|---|---|---|
| ৩০ জুন ২০২৬ | ৩২.৯৩ বিলিয়ন ডলার | ৩৭.৫৮ বিলিয়ন ডলার |
| ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৩১.২০ বিলিয়ন ডলার | ৩৬.০১ বিলিয়ন ডলার |
| ৪ নভেম্বর ২০২৬ (আকু পরিশোধের আগে) | ৩১.৫১ বিলিয়ন ডলার | ৩৬.৩৮ বিলিয়ন ডলার |
| ৫ নভেম্বর ২০২৬ (আকু পরিশোধের পর) | প্রায় ২৯.৯৯ বিলিয়ন ডলার | প্রায় ৩৪.৮৫ বিলিয়ন ডলার |
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে পরিশোধ-পরবর্তী বিপিএম৬ রিজার্ভ ২৯ দশমিক ৯৮ থেকে ২৯ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন এবং গ্রস রিজার্ভ ৩৪ দশমিক ৮৫ থেকে ৩৪ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার উল্লেখ করা হয়েছে; পার্থক্যটি সামান্য।
আকু কী, কেন প্রতি দুই মাসে রিজার্ভ কমে
আকু হলো ১৯৭৪ সালে গঠিত এশিয়ার কয়েকটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে লেনদেন নিষ্পত্তির একটি ব্যবস্থা। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার, মালদ্বীপ ও ইরানের মতো দেশ থেকে বাংলাদেশ যে পণ্য আমদানি করে, তার দাম প্রতিদিন আলাদা করে না মিটিয়ে দুই মাস পরপর একসঙ্গে পরিশোধ করা হয়। ফলে প্রতি বিজোড় মাসের শুরুতে রিজার্ভে একটি বড় ধাক্কা আসে, যা পুরোপুরি প্রত্যাশিত।
চলতি অর্থবছরেই এমন ধাক্কা আগেও দেখা গেছে। জুলাইয়ের শুরুতে মে-জুন মেয়াদের প্রায় ১৪৮ কোটি ডলার এবং সেপ্টেম্বরের শুরুতে জুলাই-আগস্টের প্রায় ১৩৯ কোটি ডলার আকুকে পরিশোধ করা হয়েছিল। এবারের বিলের অঙ্ক আগের দুইবারের চেয়ে বেশি, যা আমদানি ব্যয় বাড়ার ইঙ্গিত দেয়।
ডলার বিক্রি ও আমদানির চাপ
রিজার্ভ কমার পেছনে শুধু আকু নয়, ডলারের বাজারের চাপও আছে। বাজার স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক বুধবার (৪ নভেম্বর) নিলামের মাধ্যমে কয়েকটি ব্যাংকের কাছে আরও ১০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে, প্রতি ডলারের দর ছিল ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ১২৪ টাকা ৩৫ পয়সা। এর আগের সপ্তাহে দীর্ঘ বিরতির পর প্রথমবার নিলামে প্রায় ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার বিক্রি করা হয়। অথচ গত অর্থবছরে (২০২৫-২৬) কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে প্রায় ৬৪২ কোটি ডলার কিনেছিল।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জ্বালানি তেল ও এলপিজির আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়া এবং রমজান সামনে রেখে নিত্যপণ্যের ঋণপত্র (এলসি) খোলার চাপ বাড়ায় ডলারের চাহিদা বেড়েছে। আন্তব্যাংক বাজারে ডলারের দর ১২৪ টাকা ছাড়িয়েছে, খোলাবাজারে তা আরও বেশি।
বিশ্লেষণ: উদ্বেগের কারণ আছে কি
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, আকুর বিল পরিশোধ নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ এবং রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় ইতিবাচক ধারায় থাকায় উদ্বেগের কিছু নেই। কয়েক দিনের মধ্যেই রিজার্ভ আবার বাড়বে বলে তাঁর আশা।
এই আশার পেছনে যুক্তিও আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন প্রায় ২৮৭ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের চেয়ে ১২ শতাংশের বেশি। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ১ হাজার ১৪৬ কোটি ডলার, প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৩ শতাংশ।
তবে বাস্তবতা হলো, অর্থবছরের শুরুতে বিপিএম৬ রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি থাকলেও চার মাসে তা প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার কমেছে। রেমিট্যান্স বাড়ার পরও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ডলার বিক্রি করতে হচ্ছে—এটি বোঝায় আমদানি ব্যয় আয়ের চেয়ে দ্রুত বাড়ছে। প্রচলিত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান রিজার্ভ থাকা নিরাপদ ধরা হয়; সেই মানদণ্ড ধরে রাখতে জ্বালানির দাম ও রমজানের আমদানি চাপ সামলাতে নীতিনির্ধারকদের সতর্ক থাকতে হবে।
পাঠকের প্রশ্নোত্তর
গ্রস ও বিপিএম৬ রিজার্ভের পার্থক্য কী?
গ্রস রিজার্ভে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সব বৈদেশিক সম্পদ ধরা হয়, যার মধ্যে বিভিন্ন তহবিলে দেওয়া অর্থও থাকে। বিপিএম৬ হলো আইএমএফের নির্ধারিত পদ্ধতি, যেখানে সহজে ব্যবহারযোগ্য নয় এমন অংশ বাদ দেওয়া হয়। আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির শর্ত অনুযায়ী ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক এই হিসাব প্রকাশ করছে।
রিজার্ভ কমলে সাধারণ মানুষের ওপর কী প্রভাব পড়ে?
রিজার্ভ দীর্ঘ সময় চাপে থাকলে ডলারের দাম বাড়ে, ফলে আমদানি করা পণ্য, জ্বালানি ও কাঁচামালের দামও বাড়তে পারে। তবে আকুর পরিশোধজনিত পতন সাময়িক; রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ে তা সাধারণত পূরণ হয়ে যায়।
প্রবাসীরা কী করতে পারেন?
বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল বা অনুমোদিত মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে টাকা পাঠালে রেমিট্যান্স সরাসরি রিজার্ভে যোগ হয় এবং সরকারি প্রণোদনাও পাওয়া যায়। হুন্ডিতে পাঠানো অর্থ রিজার্ভে কোনো ভূমিকা রাখে না।
পরবর্তী আকু পরিশোধ হবে জানুয়ারির শুরুতে, নভেম্বর-ডিসেম্বর মেয়াদের বিলের জন্য। তার আগে রমজানের আমদানি ও রেমিট্যান্সের গতি ঠিক করবে রিজার্ভ আবার ৩০ বিলিয়নের ওপরে কত দ্রুত ফেরে।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক; বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, আজকের পত্রিকা, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা, বাংলাদেশ প্রতিদিন।


মন্তব্য (০)