রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে উত্তাল ইরান: ১৬ দিনে নিহত ৬৪৮, ১০০ ঘণ্টা ধরে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন
টানা ১৬ দিন ধরে জ্বলছে ইরান। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ এখন এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’ (IHR) জানিয়েছে, সরকারি বাহিনীর কঠোর দমনে গত দুই সপ্তাহে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৬৪৮ জনে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিক্ষোভের সূত্রপাত ও বর্তমান পরিস্থিতি গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট থেকে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের নজিরবিহীন দরপতন এবং নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দামের প্রতিবাদে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। কিন্তু দ্রুতই এই বিক্ষোভ রাজনৈতিক গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং পুরো ইরানের ৩১টি প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে বিক্ষোভকারীরা বর্তমান শাসনের অবসান চেয়ে রাজপথে অনড় অবস্থান নিয়েছেন।
তথ্য গোপন করতে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট বিক্ষোভ দমনে ইরান সরকার ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু করেছে। নেটব্লকসের তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে টানা ১০০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, নিরাপত্তা বাহিনীর নৃশংসতা ও গণ-গ্রেপ্তারের তথ্য যাতে বিশ্ববাসীর কাছে না পৌঁছায়, সেজন্যই এই ‘ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট’ কার্যকর করা হয়েছে।
মানবাধিকার পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে:
নিহতদের মধ্যে অন্তত ৯ জন শিশু ও কিশোর রয়েছে।
গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১০ হাজারেরও বেশি বিক্ষোভকারীকে।
তেহরান ও সিরাজের হাসপাতালগুলো আহতদের ভিড়ে উপচে পড়ছে; মর্গে জায়গা না থাকায় অনেক মরদেহ ফেরত দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
আন্তর্জাতিক মহলে এই দমন-পীড়নের তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভেত্তে কুপার এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বিক্ষোভকারীদের মৌলিক অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
সরকারের অনড় অবস্থান এত প্রাণহানি সত্ত্বেও ইরান সরকার পিছু হটতে নারাজ। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এই বিক্ষোভকে ‘বিদেশি চক্রান্ত’ বলে অভিহিত করেছেন। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, পরিস্থিতি বর্তমানে সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং কোনো বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ সহ্য করা হবে না।
বর্তমানে পুরো ইরান এক থমথমে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর টহলের কারণে সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে।



