শপিংমল, মার্কেট ও দোকান খোলার নতুন সময়সূচি: সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা
বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে দেশের শপিংমল, মার্কেট ও সাধারণ দোকানপাট খোলা রাখার সময় আরও এক ঘণ্টা কমিয়ে দিয়েছে সরকার। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত শপিংমল, মার্কেট ও দোকান খোলা রাখা যাবে। একই সঙ্গে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে সব আলোকিত বিলবোর্ড বন্ধ করতে এবং অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের সমন্বয়-২ শাখা থেকে জারি করা নির্দেশনায় এ সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। সংস্থাটির উপসচিব মো. মামুন ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত চিঠিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনাটি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
কখন থেকে কার্যকর
সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত ১২ আগস্ট ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে। এর আগে ১১ জুন থেকে শপিংমল, মার্কেট ও দোকানপাট রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখার সুযোগ ছিল। নতুন সিদ্ধান্তে সেই সময়সীমা এক ঘণ্টা কমিয়ে রাত ৮টা করা হয়েছে।
অর্থাৎ বর্তমানে সাধারণ শপিংমল, মার্কেট ও দোকানের জন্য নির্ধারিত সময়—
- খোলার সময়: সকাল ১১টা
- বন্ধের সময়: রাত ৮টা
- মোট সময়: সর্বোচ্চ ৯ ঘণ্টা
তবে নির্দেশনার ভাষা অনুযায়ী, রাত ৮টার পর এসব প্রতিষ্ঠান খোলা রাখার সুযোগ নেই।
শুধু দোকান বন্ধ নয়, আলোকসজ্জাতেও বিধিনিষেধ
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে শুধু দোকানপাট বন্ধের সময় নির্ধারণ করেই নির্দেশনা শেষ করা হয়নি। সব ধরনের আলোকিত বিলবোর্ড সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি দোকান, মার্কেট ও অন্যান্য স্থাপনায় অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত আলোকসজ্জা বন্ধ রাখার নির্দেশ রয়েছে।
এর ফলে রাতের দিকে মার্কেট বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি বিজ্ঞাপন ও ভবনের বাহ্যিক আলোকসজ্জার বিদ্যুৎ ব্যবহারও কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও একই নিয়ম
সরকারের নির্দেশনায় দেশের বিভিন্ন স্থানে চলমান ও অনুষ্ঠিতব্য মেলা, বাণিজ্য মেলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান-এর ক্ষেত্রেও রাত ৮টার সময়সীমা প্রযোজ্য করা হয়েছে।
অর্থাৎ এসব আয়োজনও রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে এ বিষয়ে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কোন প্রতিষ্ঠানগুলো এই সময়সূচির বাইরে
তবে সাধারণ দোকানপাট ও মার্কেটের জন্য নির্ধারিত সময়সূচি সব ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য নয়। খাবারের দোকান, হাসপাতাল ও ওষুধের দোকান এই নির্দেশনার আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। ফলে এসব জরুরি সেবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ রাতের সময় সাধারণ ক্রেতাদের খাবার, চিকিৎসা ও জরুরি ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে। তাই বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সঙ্গে জনসাধারণের জরুরি সেবা অব্যাহত রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার
সরকারি নির্দেশনায় সিটি করপোরেশনের মেয়র বা প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো—বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ডিপিডিসি, ডেসকো, ওজোপাডিকো ও নেসকো—সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।
অর্থাৎ এটি শুধু একটি সাধারণ পরামর্শ নয়; নির্দেশনাটি বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ সংস্থাগুলোকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
কেন আবার সময় কমানো হলো
এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক রাখা। সন্ধ্যার পর বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক লাইট, এয়ার কন্ডিশনার, এস্কেলেটর, লিফট, সাইনবোর্ড ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চালু থাকে। ফলে সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।
শপিংমল ও মার্কেট বন্ধের সময় এক ঘণ্টা এগিয়ে আনা এবং রাতের আলোকসজ্জা সীমিত করার মাধ্যমে এই বাড়তি চাহিদা কমানোর চেষ্টা করছে সরকার।
ব্যবসায়ীদের জন্য কী অর্থ দাঁড়ায়
নতুন সময়সূচির সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়বে ব্যবসায়ীদের ওপর। বিশেষ করে যেসব দোকান ও শপিংমলে সন্ধ্যার পর ক্রেতার সংখ্যা বেশি, তাদের ব্যবসার সময় এক ঘণ্টা কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে দোকান খোলার সময় সকাল ১১টায় নির্ধারিত হওয়ায় সকালবেলার বেচাকেনার সুযোগও সীমিত থাকবে।
অন্যদিকে কর্মজীবী মানুষ সাধারণত অফিস শেষে সন্ধ্যায় কেনাকাটা করেন। তাই রাত ৮টার সময়সীমা তাদের কেনাকাটার সময়ও সংকুচিত করবে। এর ফলে ব্যবসায়ীদের বিক্রয় সময় কমে যাওয়ার পাশাপাশি ক্রেতাদেরও আগে মার্কেটে যাওয়ার প্রয়োজন হবে।
এর আগেও দোকান ও মার্কেটের সময় কমানোর সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ীদের বিক্রয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করতে দেখা গেছে। এপ্রিল ২০২৬-এ সন্ধ্যায় দোকান বন্ধের সময় কমানোর প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ীরা বিক্রি কমে যাওয়ার অভিযোগ করেছিলেন।
ক্রেতাদের জন্য নতুন বাস্তবতা
নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার পর রাত ৮টার পর সাধারণ শপিংমল, মার্কেট ও দোকানে গিয়ে কেনাকাটা করার পরিকল্পনা করা ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে অফিস শেষে কেনাকাটা করতে চাইলে সন্ধ্যা ৭টার আগেই মার্কেটে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করা বাস্তবসম্মত।
একই সঙ্গে আলোকিত বিলবোর্ড সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ হওয়ার কারণে রাতের শহরের বাণিজ্যিক এলাকায় আগের তুলনায় কম আলোকসজ্জা দেখা যেতে পারে।
সার্বিকভাবে যা জানা জরুরি
সরকারের বর্তমান নির্দেশনার সারকথা হলো—সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত শপিংমল, মার্কেট ও সাধারণ দোকান; সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে আলোকিত বিলবোর্ড বন্ধ; অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ; এবং মেলা, বাণিজ্য মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান রাত ৮টার মধ্যে শেষ করতে হবে। খাবারের দোকান, হাসপাতাল ও ওষুধের দোকান এই সময়সীমার বাইরে থাকবে।
ফলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সরকারি উদ্যোগে এখন সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো—সাধারণ বাণিজ্যিক কার্যক্রমের রাতের সময় আরও এক ঘণ্টা কমে যাওয়া। এর মাধ্যমে সরকার একদিকে সন্ধ্যা-রাতের বিদ্যুতের চাপ কমাতে চাচ্ছে, অন্যদিকে জরুরি সেবাগুলো স্বাভাবিক রাখার ভারসাম্য বজায় রাখছে।


