এইমাত্র পাওয়া

২১ আগস্ট বঙ্গভবনে নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ঐতিহাসিক অনুষ্ঠান

বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জাতীয় সংসদে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৩৪৯ ভোটের মধ্যে ৩৪৩টি ভোট পড়েছে। এর মধ্যে মির্জা ফখরুল পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। ভোট গণনা শেষে প্রধান নির্বাচনী কর্তা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন মির্জা ফখরুলকে বিজয়ী ঘোষণা করেন।

নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর এখন দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অঙ্গনের নজর শুক্রবারের শপথ অনুষ্ঠানের দিকে। পূর্বঘোষিত সূচি অনুযায়ী, আগামীকাল শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি এ সময়সূচি নিশ্চিত করেছেন।

শপথ পড়াবেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল

এবারের শপথ অনুষ্ঠানটি বিশেষ সাংবিধানিক প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নতুন রাষ্ট্রপতিকে শপথ পাঠ করাবেন জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত অনুযায়ী, বর্তমান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করায় তাঁর অনুপস্থিতিতে স্পিকারের দায়িত্ব পালনকারী ডেপুটি স্পিকারই নতুন রাষ্ট্রপতিকে শপথ পাঠ করানোর সাংবিধানিকভাবে যথাযথ কর্তৃপক্ষ।

বিষয়টি সংবিধানের সংশ্লিষ্ট বিধানের আলোকে নির্ধারণ করা হয়েছে। সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে তৃতীয় তফসিলে উল্লিখিত পদে নির্বাচিত বা নিযুক্ত ব্যক্তির শপথের বিধান রয়েছে।

কীভাবে এলো নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পরিস্থিতি

রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয় সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর। তাঁর পদত্যাগের পর সংবিধানের বিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই সময়ে জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের দায়িত্ব পালন করছেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

এরপর নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলে ভোট। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর জাতীয় সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়ায় এবারের নির্বাচনকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

৩৪৯ ভোটারের মধ্যে পড়েছে ৩৪৩ ভোট

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার ছিলেন জাতীয় সংসদের ৩৪৯ জন সদস্য। নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ভোট শেষে মির্জা ফখরুল ২৫৫ ভোট পেয়ে জয়ী হন এবং অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট। অর্থাৎ বৈধ ভোটের ব্যবধানে মির্জা ফখরুল তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ১৬৭ ভোট বেশি পেয়েছেন।

ফলাফল ঘোষণার পর সংসদ কক্ষে নতুন রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানান সংসদ সদস্যরা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও মির্জা ফখরুলকে লাল গোলাপ দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির কুশল বিনিময়ের মধ্য দিয়ে সংসদে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক পথচলায় নতুন অধ্যায়

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। ছাত্রজীবনে বামপন্থী রাজনীতির মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক পথচলার শুরু। পরে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন এবং দীর্ঘ সময় দলটির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি ও স্থানীয় সরকারে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছেন।

রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার আগে তিনি বিএনপির মহাসচিব ও দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক দলীয় দায়িত্বের পাশাপাশি সংসদীয় আসন নিয়েও সাংবিধানিক পরিবর্তন আসবে।

রাষ্ট্রপতির কাছে প্রত্যাশা কী

নির্বাচনের আগে মির্জা ফখরুল জানিয়েছিলেন, তিনি এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চান যেখানে প্রান্তিক ও শ্রমজীবী মানুষ নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপন করতে পারবেন, তরুণদের কর্মসংস্থান হবে এবং নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। তিনি সুখী, সমৃদ্ধ ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন।

এখন শপথের পর তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় বিষয় হবে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব নিরপেক্ষতা ও মর্যাদার সঙ্গে পালন করা। রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদগুলোর একটি; ফলে দলীয় রাজনীতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে রাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক দায়িত্বে তাঁর রূপান্তরও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কেন এবারের শপথ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ

আগামীকালের শপথ শুধু একজন নতুন রাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণ নয়; এটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের মুহূর্ত। নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্ধারণ, নির্বাচন কমিশনের প্রজ্ঞাপন এবং এরপর বঙ্গভবনে আনুষ্ঠানিক শপথ—এই তিন ধাপের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া পূর্ণতা পাবে। নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।

বিশেষ করে ৩৫ বছর পর সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং তার পরদিনই শপথ—পুরো ঘটনাপ্রবাহকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়ে পরিণত করেছে।

আগামীকাল কী ঘটবে

সবকিছু নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী চললে ২১ আগস্ট শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেবেন। ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল তাঁকে শপথ পাঠ করাবেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন।

অতএব, ২০ আগস্টের নির্বাচন ছিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিন, আর ২১ আগস্টের বঙ্গভবন অনুষ্ঠান হবে সেই নির্বাচনের সাংবিধানিক দায়িত্ব গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকা মির্জা ফখরুলের জন্য এটি যেমন ব্যক্তিগত রাজনৈতিক জীবনের বড় মাইলফলক, তেমনি দেশের সাংবিধানিক ইতিহাসেও নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *