এলপিজির দাম নভেম্বর ২০২৬: ১২ কেজি ২,০৬০ টাকা, বাজারে কেন আরও বেশি
নভেম্বরে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি দাম ২,০৬০ টাকা, দেশে এযাবৎ সর্বোচ্চ। বাজারে কেন বেশি দাম, কোন সিলিন্ডার কত, অভিযোগ কোথায় করবেন—জানুন।

ঢাকা, ৭ নভেম্বর ২০২৬: নভেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের সরকারি দাম এখন ২ হাজার ৬০ টাকা, যা দেশে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গত ২ নভেম্বর সন্ধ্যায় অক্টোবরের ১ হাজার ৮৩৭ টাকা থেকে ২২৩ টাকা বাড়িয়ে নতুন এই দর ঘোষণা করে, যা সেদিন রাত ৮টা থেকে কার্যকর হয়েছে। যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও লিটারপ্রতি ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা থেকে বেড়ে ৯১ টাকা ৯৫ পয়সা হয়েছে। ঘোষণার পাঁচ দিন পরও অনেক এলাকায় ক্রেতারা অভিযোগ করছেন, নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার মিলছে না; বাজারে গুনতে হচ্ছে আরও কয়েক শ টাকা বেশি।
টানা দুই মাসে বাড়ল ৪৭৫ টাকা
বিইআরসি প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারদর, ডলারের বিনিময় হার এবং জাহাজভাড়া ও আমদানি খরচ হিসাব করে এলপিজির দাম সমন্বয় করে। সেপ্টেম্বরে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অক্টোবরে এক দফায় ২৫২ টাকা এবং নভেম্বরে আরও ২২৩ টাকা বাড়ায় দুই মাসে মোট বেড়েছে ৪৭৫ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৩০ শতাংশ। বছরের শুরুর সঙ্গে তুলনা করলে চিত্রটা আরও স্পষ্ট হয়।
| সময় | ১২ কেজি সিলিন্ডারের সরকারি দাম |
|---|---|
| জানুয়ারি ২০২৬ | ১,৩০৬ টাকা |
| মার্চ ২০২৬ | ১,৩৪১ টাকা |
| সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১,৫৮৫ টাকা |
| অক্টোবর ২০২৬ | ১,৮৩৭ টাকা |
| নভেম্বর ২০২৬ | ২,০৬০ টাকা |
হিসাব বলছে, জানুয়ারির তুলনায় একই সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে ৭৫৪ টাকা, যা প্রায় ৫৮ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত এলপি গ্যাস পিএলসির সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দামও অক্টোবরের ৭৭৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৬০ টাকা করা হয়েছে। তবে বাজারে সরকারি এই সিলিন্ডারের অংশ ১ শতাংশেরও কম, তাই বেশির ভাগ পরিবারকে বেসরকারি কোম্পানির সিলিন্ডারই কিনতে হয়।
কোন সিলিন্ডারের দাম কত হতে পারে
বিইআরসির ঘোষণায় বেসরকারি এলপিজির খুচরা মূল্য প্রতি কেজি ১৭১ টাকা ৬৮ পয়সা ধরা হয়েছে। কমিশন সাধারণত সব আকারের সিলিন্ডারের দাম এই কেজিপ্রতি দরের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করে। সেই হিসাবে বিভিন্ন আকারের সিলিন্ডারের আনুমানিক দাম দাঁড়ায়:
| সিলিন্ডারের আকার | আনুমানিক সরকারি দাম |
|---|---|
| ৫.৫ কেজি | প্রায় ৯৪৪ টাকা |
| ১২ কেজি | ২,০৬০ টাকা (ঘোষিত) |
| ১২.৫ কেজি | প্রায় ২,১৪৬ টাকা |
| ১৫ কেজি | প্রায় ২,৫৭৫ টাকা |
| ২৫ কেজি | প্রায় ৪,২৯২ টাকা |
| ৩৫ কেজি | প্রায় ৬,০০৯ টাকা |
| ৪৫ কেজি | প্রায় ৭,৭২৬ টাকা |
এই টেবিল কেজিপ্রতি দর থেকে ক্লেইম বিডির নিজস্ব হিসাব; চূড়ান্ত দামের জন্য বিইআরসির প্রজ্ঞাপন দেখে নেওয়ার পরামর্শ রইল।
দাম বাড়ল কেন
বিইআরসির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দেশের এলপিজির প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। তাই সৌদি আরামকোর ঘোষিত প্রোপেন ও বিউটেনের মাসিক দাম, ডলারের বিনিময় হার, জাহাজভাড়া ও আমদানিকারকের প্রিমিয়াম মিলিয়েই দেশের দাম ঠিক হয়। শীত মৌসুমে বিশ্বজুড়ে এলপিজির চাহিদা বাড়ে, ফলে সাধারণত এ সময়ে দামও ঊর্ধ্বমুখী থাকে।
তবে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারই দায়ী নয়। প্রথম আলোর এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বাড়তি ৪৭৫ টাকার মধ্যে বিশ্ববাজারের প্রভাব প্রায় ১৭৭ টাকা, আর বিইআরসির নিজস্ব সিদ্ধান্তের কারণে বেড়েছে প্রায় ২৮৪ টাকা। অক্টোবরে জাহাজভাড়া ও প্রিমিয়ামের হিসাব বাড়ানো হয়, আর নভেম্বরে কোম্পানি, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার কমিশন বাড়ানো হয়েছে। এর অর্থ, বিশ্ববাজারে দাম কমলেও সিলিন্ডারের দাম আগের অবস্থায় ফিরতে নাও পারে।
বিশ্লেষণ: সরকারি দাম আর বাজারের দামে ফারাক
এলপিজির বাজারের প্রায় ৯৯ শতাংশ বেসরকারি খাতের হাতে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন দাম কার্যকরের পরও অনেক এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, কোথাও কোথাও বাড়তি দামেও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। অক্টোবরেও ঢাকায় সরকারি দামের চেয়ে কয়েক শ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে বলে প্রতিবেদন এসেছে।
এর প্রভাব পড়ছে সরাসরি সংসারের খরচে। যে পরিবার মাসে একটি ১২ কেজির সিলিন্ডার ব্যবহার করে, বছরের শুরুর তুলনায় এখন তাদের মাসে অন্তত ৭৫০ টাকা বেশি লাগছে; বাজারদরে কিনলে বাড়তি খরচ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। হোটেল-রেস্তোরাঁ ও ছোট খাবারের দোকানের খরচ বাড়ায় তৈরি খাবারের দামেও চাপ আসতে পারে। অটোগ্যাসের দাম বাড়ায় এলপিজিচালিত যানবাহনের ভাড়া নিয়েও যাত্রীদের সঙ্গে বিরোধ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পাঠকের প্রশ্নোত্তর
নতুন দাম কত দিন বহাল থাকবে?
বিইআরসি প্রতি মাসে দাম সমন্বয় করে। তাই ২ হাজার ৬০ টাকা দর নভেম্বরজুড়ে প্রযোজ্য; ডিসেম্বরের দাম মাসের শুরুতে আবার ঘোষণা করা হবে।
দোকানদার বেশি দাম চাইলে কী করবেন?
কেনার আগে সিলিন্ডারের ওজন ও কোম্পানির সিল যাচাই করুন, বিক্রেতার কাছে রসিদ চান। নির্ধারিত দামের বেশি নিলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের হটলাইন ১৬১২১-এ অভিযোগ করা যায়। রসিদ বা ছবি থাকলে অভিযোগ প্রমাণ সহজ হয়।
খরচ কমাতে কী করা যায়?
রান্নার সময় পাত্র ঢেকে রাখা, প্রেশার কুকার ব্যবহার, চুলার বার্নার পরিষ্কার রাখা এবং পাইপ-রেগুলেটরে লিক আছে কি না নিয়মিত দেখলে গ্যাসের অপচয় অনেকটা কমে। লিকের সন্দেহ হলে সঙ্গে সঙ্গে রেগুলেটর বন্ধ করে জানালা খুলে দিন।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি); দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা, দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, আজকের বাংলাদেশ, দৈনিক সংগ্রাম।

মন্তব্য (০)