শৈত্যপ্রবাহের পূর্বাভাস: তিন মাসে ৪-৬টি, তীব্র হতে পারে ২-৩টি
নভেম্বর-জানুয়ারিতে দেশে ৪-৬টি শৈত্যপ্রবাহের আভাস, তীব্র হতে পারে ২-৩টি। বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের শঙ্কাও আছে। জেনে নিন আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস ও করণীয়।

ঢাকা, ৬ নভেম্বর ২০২৬: চলতি নভেম্বর থেকে আগামী জানুয়ারি—এই তিন মাসে দেশে চার থেকে ছয়টি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের তিন মাসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস অনুযায়ী, এর মধ্যে দুই থেকে তিনটি শৈত্যপ্রবাহ তীব্র রূপ নিতে পারে, তখন সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে আসতে পারে ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। একই সময়ে বঙ্গোপসাগরে দুই থেকে চারটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে, যার এক থেকে দুটি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শৈত্যপ্রবাহের পূর্বাভাসে কী বলছে আবহাওয়া অধিদপ্তর
আবহাওয়া অধিদপ্তর প্রতি মাসে বিশেষজ্ঞ কমিটির বৈঠকের পর আগামী এক ও তিন মাসের সম্ভাব্য আবহাওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদি চিত্র প্রকাশ করে। এবারের পূর্বাভাসের মূল বার্তা হলো, শীত আসবে ধাপে ধাপে। নভেম্বরে দিন ও রাতের তাপমাত্রা ক্রমে কমবে, তবে মাসজুড়ে বৃষ্টি স্বাভাবিকের চেয়ে কম হতে পারে।
পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, পুরো তিন মাসে গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি থাকার সম্ভাবনা আছে। তবে এর মানে এই নয় যে শীত কম অনুভূত হবে। শেষ রাত থেকে সকাল পর্যন্ত ঘন কুয়াশা পড়লে দিনের তাপমাত্রা খুব একটা বাড়তে পারে না, ফলে দিন ও রাতের তাপমাত্রার ব্যবধান কমে যায় এবং কনকনে শীতের অনুভূতি বাড়ে। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে এমন পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে অধিদপ্তর।
এক নজরে তিন মাসের পূর্বাভাস
| বিষয় | পূর্বাভাস (নভেম্বর ২০২৬–জানুয়ারি ২০২৭) |
|---|---|
| মোট শৈত্যপ্রবাহ | ৪ থেকে ৬টি |
| তীব্র শৈত্যপ্রবাহ | ২ থেকে ৩টি, তাপমাত্রা ৪–৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস |
| গড় তাপমাত্রা | স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি |
| বৃষ্টিপাত | তিন মাসে সামগ্রিকভাবে স্বাভাবিক; নভেম্বরে স্বাভাবিকের কম |
| কুয়াশা | নদী অববাহিকা ও কিছু এলাকায় মাঝারি থেকে ঘন; অন্যত্র হালকা থেকে মাঝারি |
| বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ | ২ থেকে ৪টি, এর ১–২টি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে |
শৈত্যপ্রবাহ কখন কোন মাত্রার
আবহাওয়া অধিদপ্তর সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ভিত্তিতে শৈত্যপ্রবাহকে চার ভাগে ভাগ করে। কোনো এলাকায় তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে নামলে তাকে মৃদু, ৬ থেকে ৮ ডিগ্রিতে মাঝারি, ৪ থেকে ৬ ডিগ্রিতে তীব্র এবং ৪ ডিগ্রির নিচে নামলে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়।
সাধারণত দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল—বিশেষ করে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে—শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে। ডিসেম্বরের শেষ ভাগ থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সময়টাকেই সবচেয়ে শীতল ধরা হয়। এবারও ডিসেম্বর-জানুয়ারিতেই শীতের তীব্রতা বেশি থাকার আভাস মিলেছে।
নভেম্বরে ঘূর্ণিঝড়ের শঙ্কা কেন
শীতের আগমনী মাস হলেও নভেম্বর বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের অন্যতম মৌসুম। অক্টোবর-নভেম্বরে সাগরের পানির উষ্ণতা তুলনামূলক বেশি থাকায় লঘুচাপ ও নিম্নচাপ সৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। অতীতের অনেক বড় ঘূর্ণিঝড়ও এই সময়েই উপকূলে আঘাত হেনেছে। তাই উপকূলীয় জেলার বাসিন্দা, জেলে ও নৌযান চলাচলের সঙ্গে যুক্তদের নিয়মিত সমুদ্রবন্দরের সতর্কসংকেত অনুসরণ করা জরুরি।
প্রভাব: কৃষি, যাতায়াত ও জনস্বাস্থ্য
ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে বোরো বীজতলা ও রবিশস্যে। দীর্ঘ সময় সূর্যের আলো না পেলে বীজতলায় কোল্ড ইনজুরি দেখা দিতে পারে, আলুসহ কিছু ফসলে রোগের প্রকোপ বাড়ে। সড়ক ও নৌপথে কুয়াশায় দৃষ্টিসীমা কমে যাওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে, ফেরি ও লঞ্চ চলাচল বিঘ্নিত হয়, কখনো কখনো ফ্লাইটও দেরিতে ছাড়ে।
জনস্বাস্থ্যের দিক থেকে শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকেন। শীতে নিউমোনিয়া, সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট ও ডায়রিয়ার মতো রোগ বাড়ে। উত্তরাঞ্চলের নিম্নআয়ের পরিবার এবং খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবীদের জন্য তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বাড়তি কষ্টের কারণ হয়।
পাঠকের প্রশ্ন ও করণীয়
শৈত্যপ্রবাহ কি নভেম্বরেই শুরু হবে?
নভেম্বরে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমবে। শৈত্যপ্রবাহ মূলত ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস কতটা নির্ভরযোগ্য?
তিন মাসের পূর্বাভাস একটি সম্ভাব্য প্রবণতা দেখায়, এতে অনিশ্চয়তা থাকে। নির্দিষ্ট দিনের পরিস্থিতি জানতে আবহাওয়া অধিদপ্তরের দৈনিক ও পাঁচ দিনের পূর্বাভাস দেখা উচিত।
এখন থেকে কী প্রস্তুতি নেওয়া যায়?
- শিশু ও বয়স্কদের জন্য গরম কাপড় আগেভাগে প্রস্তুত রাখুন; শ্বাসকষ্ট বা জ্বর বাড়লে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- কুয়াশার সময় যানবাহন ধীরে চালান এবং ফগ লাইট ব্যবহার করুন; ভোরে নৌযাত্রায় বাড়তি সতর্ক থাকুন।
- কৃষকেরা বীজতলা রাতে স্বচ্ছ পলিথিনে ঢেকে রাখা ও সকালে কুয়াশার পানি ঝরিয়ে দেওয়ার মতো ব্যবস্থা নিতে পারেন; প্রয়োজনে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিন।
- উপকূলের বাসিন্দারা ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কবার্তা ও স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা নিয়মিত অনুসরণ করুন।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস; ২৪ আপডেট নিউজ, দিনাজপুর টিভি, শিক্ষাবার্তা।
মন্তব্য (০)