চিপ শেয়ারে ধস: এক দিনে এনভিডিয়ার ৪৫০ বিলিয়ন ডলার উধাও, কারণ কী
চিপ শেয়ারে ধস: এক দিনে সেমিকন্ডাক্টর সূচক ১২% ও নাসডাক-১০০ ৬.৪% পড়েছে, এনভিডিয়া হারিয়েছে ৪৫০ বিলিয়ন ডলার। কেন এই পতন, বাংলাদেশে প্রভাব কী জানুন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ঘিরে কয়েক বছরের টানা উত্থানের পর বড় ধাক্কা খেল বিশ্বের প্রযুক্তি শেয়ারবাজার। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর ২০২৬) চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে নজিরবিহীন ধস নামে। সেমিকন্ডাক্টর খাতের প্রধান সূচক ফিলাডেলফিয়া সেমিকন্ডাক্টর ইনডেক্স (সক্স) এক দিনেই প্রায় ১২ শতাংশ পড়ে যায়, যা ২০২০ সালের মার্চে করোনা মহামারির শুরুর পর সবচেয়ে বড় পতন। এআই চিপের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার শেয়ার কমে প্রায় ৯ শতাংশ, বাজারমূল্য থেকে উধাও হয় আনুমানিক ৪৫০ বিলিয়ন (৪৫ হাজার কোটি) ডলার। পরদিন শুক্রবার বাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও এআই খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন এখন বিনিয়োগকারীদের মুখে মুখে।
কী ঘটেছিল বৃহস্পতিবার
দিনের শুরু থেকেই প্রযুক্তি শেয়ারে বিক্রির চাপ ছিল। দিন শেষে প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক-১০০ সূচক ৬ দশমিক ৪ শতাংশ কমে যায়, যা ২০২০ সালের মার্চের পর এই সূচকের সবচেয়ে খারাপ দিন। বিস্তৃত নাসডাক কম্পোজিট কমে সাড়ে ৫ শতাংশের বেশি। শুধু প্রযুক্তি নয়, পুরো বাজারেই এর প্রভাব পড়ে: ডাও জোন্স সূচক হারায় ১,৮৩৩ পয়েন্ট, আর এসঅ্যান্ডপি ৫০০ কমে ৪ শতাংশের বেশি।
এনভিডিয়ার পাশাপাশি ব্রডকম ও তাইওয়ানের চিপ নির্মাতা টিএসএমসির শেয়ারও ৯ শতাংশ বা তার বেশি কমেছে বলে মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা যায়। সব মিলিয়ে চিপ প্রতিষ্ঠানগুলো এক দিনে দেড় ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি বাজারমূল্য হারিয়েছে।
এক নজরে দরপতনের চিত্র
| সূচক / প্রতিষ্ঠান | ৫ নভেম্বরের পরিবর্তন | মন্তব্য |
|---|---|---|
| ফিলাডেলফিয়া সেমিকন্ডাক্টর ইনডেক্স (সক্স) | প্রায় −১২% | ২০২০ সালের মার্চের পর সবচেয়ে বড় পতন |
| নাসডাক-১০০ | −৬.৪% | ২০২০ সালের পর সবচেয়ে খারাপ দিন |
| নাসডাক কম্পোজিট | −৫.৫২% | বন্ধ হয় ২৪,৩১৫ পয়েন্টে |
| এসঅ্যান্ডপি ৫০০ | −৪.৩৬% | বন্ধ হয় ৭,৩৫৩.৭৩ পয়েন্টে |
| ডাও জোন্স | −৩.৪৪% (১,৮৩৩ পয়েন্ট) | বন্ধ হয় ৫১,৫২৩ পয়েন্টে |
| এনভিডিয়া | প্রায় −৯% | বাজারমূল্য কমেছে প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলার |
পতনের পেছনে কী কারণ
বিশ্লেষকেরা মূলত তিনটি কারণের কথা বলছেন। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল। মার্কিন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এ নির্বাচনে কংগ্রেসের দুই কক্ষেই ডেমোক্র্যাটরা নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে। নির্বাচনের পরদিন বুধবার বাজার চাঙা থাকলেও বৃহস্পতিবার বিনিয়োগকারীদের নজর যায় এআই অবকাঠামোর দিকে। বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সেন্টার নির্মাণ এখন রাজনৈতিক ইস্যু। কিছু ডেমোক্র্যাট রাজনীতিক নতুন ডেটা সেন্টার প্রকল্প সীমিত বা স্থগিত করার পক্ষে কথা বলেছেন। ফলে এআই অবকাঠামো নির্মাণ ধীর ও ব্যয়বহুল হতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই চিপ শেয়ার বিক্রি বাড়ে।
দ্বিতীয়ত, এআই খাতে বিপুল ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে আগে থেকেই সন্দেহ ছিল। গত ৩০ অক্টোবরও একই ধরনের উদ্বেগে প্রযুক্তি খাত থেকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি বাজারমূল্য মুছে গিয়েছিল। তৃতীয়ত, ডেটা সেন্টার বানাতে যেসব প্রতিষ্ঠান বড় অঙ্কের ঋণ নিচ্ছে, তাদের কাছে বিনিয়োগকারীরা এখন বেশি সুদ বা মুনাফা দাবি করছেন।
শুক্রবার আংশিক ঘুরে দাঁড়ানো, তবে শঙ্কা কাটেনি
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) চিপ শেয়ার কিছুটা পুনরুদ্ধার করে। দিন শেষে নাসডাক কম্পোজিট ১ দশমিক ০৯ শতাংশ এবং এসঅ্যান্ডপি ৫০০ শূন্য দশমিক ৩১ শতাংশ বাড়ে, তবে ডাও জোন্স শূন্য দশমিক ৪৬ শতাংশ কমে। একই দিনে প্রকাশিত অক্টোবরের কর্মসংস্থান প্রতিবেদনে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে নতুন চাকরি হয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার, যা অর্থনীতিবিদদের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি। বেকারত্বের হার নেমেছে ৪ দশমিক ১ শতাংশে।
তবে শক্তিশালী চাকরির তথ্য বাজারের জন্য পুরোপুরি স্বস্তির নয়। এতে ডিসেম্বরে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়াতে পারে, এমন প্রত্যাশা জোরালো হয়েছে। সুদ বাড়লে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মতো উচ্চ প্রবৃদ্ধিনির্ভর শেয়ারের ওপর চাপ সাধারণত বাড়ে।
বিশ্লেষণ: এআই বুদ্বুদ নিয়ে নতুন প্রশ্ন
গত কয়েক বছরে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় উঠে এসেছে চিপ ও এআই প্রতিষ্ঠান। চ্যাটবট থেকে স্বয়ংক্রিয় এজেন্ট পর্যন্ত নানা এআই সেবা চালাতে দরকার বিপুল কম্পিউটিং শক্তি, আর সেই চাহিদার বড় অংশ মেটায় এনভিডিয়ার মতো প্রতিষ্ঠান। বিনিয়োগকারীরা ধরে নিয়েছিলেন, ডেটা সেন্টার নির্মাণের এই জোয়ার বছরের পর বছর চলবে। বৃহস্পতিবারের ধস দেখাল, নীতি, বিদ্যুৎ ও অর্থায়নের যেকোনো অনিশ্চয়তা সেই ধারণাকে কতটা নাড়িয়ে দিতে পারে। সক্স সূচক এখন জুনের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে প্রায় ৩৮ শতাংশ নিচে।
তবে এক দিনের পতনকেই এআই যুগের সমাপ্তি ভাবা ঠিক হবে না বলে মনে করেন অনেক বাজার পর্যবেক্ষক। এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছেই; প্রশ্নটা মূলত কত দ্রুত ও কত খরচে অবকাঠামো গড়ে উঠবে, তা নিয়ে।
পাঠকের প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন: বাংলাদেশের ওপর এর প্রভাব কী?
উত্তর: বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে সরাসরি প্রভাব সীমিত, কারণ এখানে বিদেশি প্রযুক্তি শেয়ারে সাধারণ বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ কম। তবে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা ও যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বাড়লে ডলারের দাম, আমদানি ব্যয় ও বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহে পরোক্ষ চাপ তৈরি হতে পারে।
প্রশ্ন: স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের দাম কি এখনই কমবে?
উত্তর: না। শেয়ারের দাম কমা মানে পণ্যের দাম কমা নয়। চিপের সরবরাহ ও উৎপাদন খরচের ওপরই মূলত ভোক্তা পণ্যের দাম নির্ভর করে।
প্রশ্ন: বিদেশি প্ল্যাটফর্মে যারা প্রযুক্তি শেয়ারে বিনিয়োগ করেছেন, তাঁদের কী করা উচিত?
উত্তর: আতঙ্কে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত না নিয়ে নিজের ঝুঁকি নেওয়ার সামর্থ্য বিবেচনা করা এবং প্রয়োজনে লাইসেন্সপ্রাপ্ত আর্থিক পরামর্শকের সঙ্গে কথা বলা ভালো। মনে রাখা দরকার, বিদেশে বিনিয়োগে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধিনিষেধ রয়েছে।
তথ্যসূত্র: ইয়াহু ফাইন্যান্স, ফক্স বিজনেস, সিএনবিসি, স্টকটাইটান, বেনজিঙ্গা


মন্তব্য (০)