বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সুখবর: তৈরি হচ্ছে সমন্বিত ‘সার্ভিস রুলস’
দেশের বেসরকারি খাতের কোটি চাকরিজীবীর জন্য বড় ধরনের সুখবর আসছে। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা প্রদান এবং উন্নত কর্মপরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি যুগোপযোগী ও সমন্বিত ‘বেসরকারি সার্ভিস রুলস’ তৈরির মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে এই নতুন বিধিমালা প্রণয়নের আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু করেছে।
এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বেসরকারি খাতের কর্মসংস্থানে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে এবং লাখ লাখ কর্মজীবী মানুষ আইনি সুরক্ষার আওতায় আসবেন।
নতুন বিধিমালায় যা থাকছে
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানাচ্ছে, নতুন এই সমন্বিত সার্ভিস রুলস বা বিধিমালার মূল লক্ষ্য হচ্ছে বেসরকারি খাতের বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতা দূর করা। এর অধীনে মূলত যে বিষয়গুলো আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা হতে পারে:
ন্যূনতম বেতন ও কর্মঘণ্টা: সব খাতের জন্য যৌক্তিক ন্যূনতম বেতন নির্ধারণ এবং সুনির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বজায় রাখা।
আইনি সুরক্ষা: বাধ্যতামূলক নিয়োগপত্র প্রদান এবং হুটহাট বা অন্যায্য ছাঁটাই বন্ধ করে চাকরির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা।
ছুটি ও অন্যান্য সুবিধা: সরকারি খাতের মতো সুনির্দিষ্ট ছুটি, যথাযথ সার্ভিস বেনিফিট এবং বাধ্যতামূলক মাতৃত্বকালীন সুবিধা নিশ্চিত করা।
সুরক্ষিত কর্মপরিবেশ: কর্মক্ষেত্রে সব ধরনের বৈষম্য, হয়রানি এবং নির্যাতন প্রতিরোধে কঠোর আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা করা।
নীতি নির্ধারণে তৎপর সরকার
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ মে সচিবালয়ে এই বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের ও গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময়সভা অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠন এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে মতামত নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আগামী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে তাদের লিখিত মতামত ও সুপারিশ পাঠানোর জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। সবার মতামত ও বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬’ এবং ‘বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা-২০১৫’-এ প্রয়োজনীয় সংশোধন বা নতুন ধারা সংযোজন করা হতে পারে।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকি ও সমন্বয় করার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিধি অনুবিভাগ) মোস্তফা জামানের নেতৃত্বে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করা হয়েছে।
গিগ ইকোনমি বা অ্যাপভিত্তিক কর্মীরাও পাচ্ছেন গুরুত্ব
ঐতিহাসিক এই উদ্যোগে প্রথাগত চাকরিজীবীদের পাশাপাশি আধুনিক ‘গিগ ইকোনমি’ বা প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কর্মীরাও বড় ধরনের সুবিধা পেতে যাচ্ছেন। বর্তমানে উবার, পাঠাও কিংবা ফুডপান্ডার মতো অ্যাপভিত্তিক সেবায় নিয়োজিত চালক ও ডেলিভারি ম্যানদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো সার্ভিস রুলস নেই।
কমিটির আলোচনা সূত্রে জানা গেছে, নতুন এই নীতিমালায় অ্যাপভিত্তিক খাতের কর্মীদের কর্মঘণ্টা, পারিশ্রমিক এবং সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে, যা তাদের দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা দূর করবে।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও প্রত্যাশা
কমিটির প্রধান এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোস্তফা জামান এই উদ্যোগের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন:
“সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং বেসরকারি চাকরিজীবীদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমাদের দেশের অনেক বেসরকারি কর্মী এখনো চাকরির নিরাপত্তাহীনতা, আকস্মিক ছাঁটাই, মাতৃত্বকালীন ছুটি না পাওয়া কিংবা ন্যায্য সার্ভিস বেনিফিট থেকে বঞ্চিত হওয়ার মতো সংকটে পড়েন। এসব সংকট স্থায়ীভাবে সমাধান করতেই এই সমন্বিত বিধিমালা তৈরি করা হচ্ছে।”
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট কর্মক্ষম ও কর্মজীবী মানুষের সিংহভাগই নিয়োজিত আছেন বেসরকারি খাতে। অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই বিধিমালা চূড়ান্ত ও বাস্তবায়িত হলে দেশের শ্রমবাজারে কেবল শৃঙ্খলা ও স্থায়িত্বই আসবে না, বরং সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতিতে এর একটি বিশাল ইতিবাচক ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে।


