সেনাপ্রধানের দাড়ি রাখা নিয়ে আলোচনায় নতুন মাত্রা: ধর্মীয় পরিচয় ও সামরিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখছেন অনেক কর্মকর্তা
বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীতে ধর্মীয় পরিচয়, বিশেষ করে দাড়ি রাখা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক মানসিকতার পরিবর্তনের প্রশ্নটি আবারও আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের প্রকাশ্য দাড়ি রাখা এবং বাহিনীর পরিবারকেন্দ্রিক ইসলামিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে অনেক বর্তমান ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন।
নৌবাহিনীর কর্মকর্তা লেফট্যানেন্ট কাজী ইনতিসার ইনজিমাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে দাবি করেছেন, কয়েক বছর আগেও সশস্ত্র বাহিনীতে দাড়ি রাখা নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন, সমালোচনা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যাখ্যার মুখোমুখি হতে হতো কর্মকর্তাদের।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে প্রথমবার দাড়ি রাখার অনুমতি চাইলেও তা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। অবশেষে ২০২৩ সালের শেষ দিকে পূর্ণ অনুমতি পাওয়ার পর ২০২৪ সালের রমজান থেকে তিনি নিয়মিতভাবে দাড়ি রাখা শুরু করেন। তবে এরপর তাকে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য ও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, একসময় ধর্মীয় অনুশীলনের প্রতি বাড়তি আগ্রহ বা নিয়মিত মসজিদে যাতায়াতকেও সন্দেহের চোখে দেখা হতো। ধর্মীয়ভাবে সচেতন ব্যক্তিদের অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করে দেখার প্রবণতা ছিল বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
লেফট্যানেন্ট ইনতিসারের মতে, এমন একটি পরিবেশে দেশের সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে সেনাপ্রধানের প্রকাশ্যে দাড়ি রাখা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি বাহিনীর অভ্যন্তরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। তিনি বলেন, বছরের পর বছর যারা নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে অপ্রয়োজনীয় সংশয় ও সন্দেহের মধ্যে ছিলেন, তাদের কাছে এই পদক্ষেপ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
স্ট্যাটাসে তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সেনাপ্রধানের বিভিন্ন নীতি ও সিদ্ধান্তের সঙ্গে তার ব্যক্তিগতভাবে দ্বিমত থাকতে পারে। তবে ধর্মীয় পরিচয় ও ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি ইতিবাচক অবস্থান গ্রহণের ক্ষেত্রে সেনাপ্রধানের ভূমিকা প্রশংসার দাবিদার বলে তিনি মনে করেন।
তার দাবি, অতীতে সামরিক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত পরিবেশে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা নিরুৎসাহিত করার প্রবণতা ছিল। অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় অভিব্যক্তিকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে বাহিনীর ভেতরে এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশে অনেকে স্বস্তিবোধ করতেন না।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক বাহিনীর মতো শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে প্রতীকী পরিবর্তনের গুরুত্ব অনেক। কোনো নীতিগত পরিবর্তনের আগে পরিবেশ ও মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন হয়, আর সেই পরিবর্তনের সূচনা অনেক সময় নেতৃত্বের আচরণ ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই ঘটে।
লেফট্যানেন্ট ইনতিসার তার লেখায় উল্লেখ করেন, অতীতে নৌবাহিনীর একজন প্রধানের দাড়ি রাখাও বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে এ বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছিল। একইভাবে বর্তমান সেনাপ্রধানের দাড়ি রাখাকে তিনি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের একটি প্রতীক হিসেবে দেখছেন।
তিনি বলেন, একজন ব্যক্তি বা একজন জেনারেলের দাড়ি রাখা মাত্রই কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তিত হয়ে যাবে না কিংবা সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না। তবে প্রতীকী পদক্ষেপ সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি গঠনে ভূমিকা রাখে। আর সেই সংস্কৃতিই ভবিষ্যতের প্রতিষ্ঠানকে প্রভাবিত করে।
তার মতে, দেশের সর্বোচ্চ ইউনিফর্মধারী কর্মকর্তা যদি দাড়ি রেখে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অনেক তরুণ কর্মকর্তা ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশের ক্ষেত্রে কম সংকোচ বোধ করবেন। একই সঙ্গে ধর্মীয় মূল্যবোধ অনুসরণ করলেও একজন কর্মকর্তা পেশাগতভাবে কম দক্ষ বলে বিবেচিত হওয়ার আশঙ্কাও কমবে।
লেখার শেষাংশে তিনি সেনাপ্রধানকে উদ্দেশ করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বলেন, “যেখানে কৃতিত্ব প্রাপ্য, সেখানে কৃতিত্ব দেওয়া উচিত। ইউনিফর্ম ও ইসলাম পরস্পরবিরোধী নয়—এই বার্তা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।”
সামরিক বাহিনীতে ধর্মীয় অনুশীলন ও পেশাগত দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের প্রেক্ষাপটে এই বক্তব্য নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি শুধু দাড়ি রাখার প্রশ্ন নয়; বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মীয় পরিচয়, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং পেশাগত সংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে বৃহত্তর আলোচনারও অংশ।


