মোবাইল ব্যাংকিং

মূলধন সংকটে নড়বড়ে দেশের ২০ ব্যাংক : ঘাটতি পৌনে ৩ লাখ কোটি টাকা, ঝুঁকিতে পুরো আর্থিক খাত

দেশের ব্যাংকিং খাতে মূলধন সংকট দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের অন্তত ২০টি ব্যাংক বর্তমানে বিশাল অঙ্কের মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিক (অক্টোবর-ডিসেম্বর) শেষে এই ব্যাংকগুলোর মোট মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকায়। সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের চেয়ে এই ঘাটতি সামান্য কমলেও ব্যাংক খাতের সামগ্রিক ঝুঁকি এখনো অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি একটি বিশেষ প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চেয়ে বহু নিচে বাংলাদেশ

ব্যাংকিং খাতের আন্তর্জাতিক ব্যাসেল-৩ (Basel III) মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতিটি ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়, যাকে বলা হয় ক্যাপিটাল টু রিস্ক-ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও (CRAR)।

  • আন্তর্জাতিক মানদণ্ড: নিয়ম অনুযায়ী একটি ব্যাংকের CRAR থাকা উচিত ন্যূনতম ১২.৫%

  • বর্তমান বাস্তবতা: বাংলাদেশের সামগ্রিক ব্যাংক খাতে এই অনুপাত আশঙ্কাজনকভাবে ধসে নেমে এসেছে ঋণাত্মক (-) ২.৬৪%-এ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, গত সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে মূলধন ঘাটতি ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা। ডিসেম্বর প্রান্তিকে তা সামান্য কমে ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকায় নেমেছে। তবে এই হ্রাস কোনো প্রকৃত আর্থিক উন্নতির কারণে ঘটেনি; বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শিথিল ‘ঋণ পুনঃতফসিল নীতি’র কারণে খেলাপি ঋণ কাগজে-কলমে কিছুটা কম দেখানোর ফলে সাময়িকভাবে এই ঘাটতি কমেছে।

খেলাপি ঋণের পাহাড় ও সংকটের মূল কারণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ব্যাংকগুলোর মূলধন ক্ষয়ের প্রধান কারণ হলো লাগামহীন খেলাপি ঋণ। বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের প্রায় ৩০.৬০%। অর্থাৎ, ব্যাংকের দেওয়া প্রতি ১০০ টাকা ঋণের মধ্যে প্রায় ৩১ টাকাই এখন খেলাপি বা আদায় অযোগ্য।

অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা এই সংকটের পেছনে তিনটি মূল কারণকে দায়ী করেছেন: ১. রাজনৈতিক প্রভাব: বিগত বছরগুলোতে রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ অনুমোদন এবং প্রভাবশালী মহলের চাপ। ২. দুর্বল তদারকি: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে যথাযথ ও কঠোর নজরদারির অভাব। ৩. আগ্রাসী ঋণ বিতরণ: ব্যাংকের নিজস্ব সক্ষমতা এবং গ্রাহকের যোগ্যতা বিবেচনা না করেই নিয়মবহির্ভূতভাবে বড় বড় ঋণ দেওয়া।

সংকটে থাকা শীর্ষ ব্যাংকগুলোর তালিকা

মূলধন ঘাটতির এই তালিকায় রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি এবং শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী—সব ধরনের ব্যাংকের নামই রয়েছে। সবচেয়ে বেশি আর্থিক ঝুঁকিতে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

  • জনতা ব্যাংক

  • ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক

  • সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক

  • ইউনিয়ন ব্যাংক

  • এক্সিম ব্যাংক

এছাড়া বিশেষায়িত খাতের বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকরাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকও (রাকাব) দীর্ঘ দিন ধরে বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি ও তীব্র আর্থিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা ও সমাধানের পথ

অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক খাত বিশ্লেষকদের মতে, বারবার ঋণ পুনঃতফসিল বা কাগজের কলমে খেলাপি ঋণ লুকিয়ে রাখার এই সংস্কৃতি সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংক খাতকে আরও বেশি খোঁড়া করে তুলছে। এটি আসল রোগ নিরাময় না করে শুধু লক্ষণ চেপে রাখার মতো।

“কার্যকর প্রশাসনিক সংস্কার, ঋণ বিতরণে শতভাগ স্বচ্ছতা, খেলাপি ঋণ আদায়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা না গেলে এই গভীর সংকট থেকে দেশের ব্যাংক খাতকে টেনে তোলা অসম্ভব হয়ে পড়বে।”

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, দ্রুত বড় ধরনের সংস্কার না হলে এই মূলধন ঘাটতি সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যেও এক ধরনের আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে, যা পুরো অর্থনীতির জন্যই বড় বিপদের কারণ হবে।

সোর্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *