এইমাত্র পাওয়া

সরকারি প্রশাসনে শৃঙ্খলা ও গতি ফেরাতে ২৩ দফা নির্দেশনা, কঠোর নজরদারিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা

সরকারি প্রশাসনে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কাজের গতি বাড়াতে নতুন করে একাধিক নির্দেশনা জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ১৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সচিব সভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সম্প্রতি সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে এসব নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনে নির্দেশনার সংখ্যা ২৩টি বলা হয়েছে। ছবিতে প্রচারিত সংক্ষিপ্তসারে ২০ দফা হিসেবে উল্লেখ থাকলেও হালনাগাদ সংবাদ প্রতিবেদনে ২৩ দফা নির্দেশনার কথা জানানো হয়েছে।

নির্দেশনাগুলোর মূল লক্ষ্য হচ্ছে সরকারি দপ্তরে দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করা, জনসেবা সহজ করা, অপ্রয়োজনীয় পদ ও কাঠামো পুনর্বিন্যাস, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ে আরও শৃঙ্খলা আনা।

দুর্নীতির অভিযোগে অভ্যন্তরীণ কমিটি

নির্দেশনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—একাধিক কর্মস্থলে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে এমন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিহ্নিত করতে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোতে অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠনের উদ্যোগ।

অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিষয়ে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে কোনো কর্মকর্তা একাধিক কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের সময় অনিয়মের অভিযোগে জড়িত ছিলেন কি না, সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসবে।

চাকরির বিষয়ে তদবির করলে বিভাগীয় ব্যবস্থা

সরকারি কর্মচারীদের চাকরি-সংক্রান্ত বিষয়ে অন্য ব্যক্তি বা প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে তদবির করার বিষয়েও কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পৃথক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো কর্মচারী নিজের চাকরি-সংক্রান্ত বিষয়ে অন্য কাউকে দিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত তদবির করালে তা অসদাচরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এমনকি বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর ডোসিয়ারেও সংরক্ষণের নির্দেশনা রয়েছে।

তবে এর অর্থ সরকারি কর্মচারীরা চাকরি-সংক্রান্ত বিষয়ে আবেদন করতে পারবেন না—এমন নয়। যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।

সব সরকারি অফিসে ডিজিটাল হাজিরার ওপর জোর

সরকারি কর্মচারীদের সময়মতো অফিসে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থা চালুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের উপস্থিতির তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগকে কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডে এসব তথ্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

এর ফলে শুধু হাজিরা দেওয়া হয়েছে কি না, তা নয়—সরকারি অফিসে কর্মঘণ্টা যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণের আওতায় আসতে পারে।

এর আগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে উপস্থিত থাকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে নির্দেশনা দিয়েছিল। সেখানে সকাল ৯টা থেকে ৯টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত নিজ নিজ কর্মস্থলে উপস্থিত থাকার কথা বলা হয়েছিল।

অপ্রয়োজনীয় পদ বাতিল, শূন্যপদ পূরণের উদ্যোগ

প্রশাসনিক কাঠামোকে কার্যকর করার অংশ হিসেবে অপ্রয়োজনীয় পদ বাতিল এবং প্রয়োজনীয় শূন্যপদ দ্রুত পূরণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাংগঠনিক কাঠামো প্রয়োজন অনুযায়ী আধুনিকায়নের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে—যেখানে জনবল প্রয়োজন সেখানে শূন্যপদ পূরণ করা এবং যেখানে পদ বা কাঠামো কার্যত অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে, সেগুলো পুনর্বিবেচনা করা।

জনসেবা দিতে হবে হয়রানি ছাড়া

নির্দেশনায় সাধারণ মানুষকে সরকারি সেবা দেওয়ার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেবাগ্রহীতারা যাতে কোনো ধরনের অযথা হয়রানি ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সেবা পান, তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে দপ্তরের কাজ দ্রুত নিষ্পত্তি, নথি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহি বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

ডি-নথিতে দ্রুত কাজ নিষ্পত্তির নির্দেশ

সরকারি দাপ্তরিক কার্যক্রমে ডি-নথি ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গোপনীয়তা বজায় রেখে দ্রুত নথি নিষ্পত্তির মাধ্যমে প্রশাসনিক কাজে দীর্ঘসূত্রতা কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, কোনো ফাইল অপ্রয়োজনীয়ভাবে এক দপ্তর বা কর্মকর্তার কাছে দীর্ঘদিন আটকে না থাকে—এমন একটি দ্রুততর প্রশাসনিক সংস্কৃতির দিকে যাওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।

সরকারি অফিসে সৌরবিদ্যুৎ ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়

সরকারি দপ্তরগুলোতে বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর জন্য সৌর প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে।

সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের অগ্রগতি সম্পর্কে নির্দিষ্ট সময় পরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রতিবেদন দিতে হবে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার বন্ধ এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

এটি শুধু ব্যয় কমানোর বিষয় নয়; সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জ্বালানি ব্যবস্থাপনাকে আরও টেকসই করার একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

সরকারি অফিসের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে নজরদারি

অফিস প্রাঙ্গণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়েও নির্দিষ্ট নজরদারি ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

উপজেলা পর্যায়ের সরকারি দপ্তরগুলোকে অফিস প্রাঙ্গণের পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এসব প্রতিবেদন উপজেলা থেকে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় হয়ে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

ফলে অফিসের পরিচ্ছন্নতা আর শুধু সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকবে না; এটি নিয়মিত প্রশাসনিক তদারকির অংশ হয়ে উঠবে।

কর্মকর্তাদের ঘন ঘন বিদেশ সফরেও নজর

সরকারি কর্মকর্তাদের বারবার বিদেশ সফরের বিষয়েও নজরদারি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে একই কর্মকর্তা বা কর্মচারীর ঘন ঘন বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা নির্দেশনায় উঠে এসেছে।

সরকারি ক্রয়ে নতুন শৃঙ্খলা

সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়াতেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অর্থের সংস্থান না থাকলে কোনো কেনাকাটার প্রস্তাব ক্রয়-সংক্রান্ত কমিটিতে না পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া নতুন সরকারি ক্রয় বিধিমালায় নির্ধারিত ছক অনুসরণ করে ক্রয়ের সারসংক্ষেপ প্রস্তুত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে অর্থের সংস্থান, প্রয়োজনীয়তা ও ক্রয় প্রক্রিয়ার মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে।

আন্তঃদপ্তর বিরোধ সমাধানে সমন্বয়

সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে জমি বা আইনি বিরোধ দেখা দিলে সরাসরি এক দপ্তর অন্য দপ্তরের বিরুদ্ধে মামলা করার পরিবর্তে আগে নিজেদের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এর ফলে প্রশাসনের ভেতরে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ ও মামলা কমিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বাস্তবায়নে নজরদারি

নির্দেশনায় ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড-সংক্রান্ত সরকারি নীতিমালা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে ডিজিটাল ডেটাবেজ, এনআইডি, জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন তথ্যব্যবস্থার সমন্বয়ের কথা রয়েছে। সরকারি নির্দেশনায় এ ধরনের ডেটা সমন্বয় ও সুবিধাভোগী যাচাইয়ের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডেটাবেজের আওতায় আনার পরিকল্পনার কথাও সরকারি তথ্যেই উল্লেখ রয়েছে।

উন্নয়ন প্রকল্পে তদারকি বাড়বে

মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর অধীনে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন তদারকি জোরদারের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে খাল খননসহ বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচির বাস্তবায়ন যথাযথভাবে হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও নজর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই নির্দেশনা?

নতুন নির্দেশনাগুলোকে শুধু কর্মকর্তাদের জন্য প্রশাসনিক আদেশ হিসেবে দেখলে এর ব্যাপ্তি পুরোপুরি বোঝা যাবে না। এগুলোর একটি বড় অংশ সরাসরি সরকারি সেবা গ্রহণকারী সাধারণ নাগরিকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত।

ডিজিটাল হাজিরা কার্যকর হলে কর্মস্থলে উপস্থিতির জবাবদিহি বাড়তে পারে। অপ্রয়োজনীয় পদ পুনর্বিন্যাস ও শূন্যপদ পূরণ হলে জনবল ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। ডি-নথিতে দ্রুত ফাইল নিষ্পত্তি হলে দাপ্তরিক দীর্ঘসূত্রতা কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। আর দুর্নীতির অভিযোগে অভ্যন্তরীণ নজরদারি বাড়লে অভিযোগগুলো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যাচাই করার কাঠামো শক্তিশালী হতে পারে।

তবে এসব ফলাফল বাস্তবে কতটা অর্জিত হবে, তা মূলত নির্দেশনার বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জবাবদিহির ওপর নির্ভর করবে—এমনটাই প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য হিসেবে উঠে এসেছে।

নির্দেশনার সারকথা

  • সরকারি অফিসে শৃঙ্খলা ও সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করা
  • ডিজিটাল হাজিরা ও কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার
  • দুর্নীতির অভিযোগে অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠন
  • চাকরি-সংক্রান্ত অনাকাঙ্ক্ষিত তদবির বন্ধ করা
  • অপ্রয়োজনীয় পদ বিলুপ্ত ও শূন্যপদ পূরণ
  • ডি-নথিতে দ্রুত দাপ্তরিক কাজ নিষ্পত্তি
  • সরকারি অফিসে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা
  • সৌরবিদ্যুৎ ও বিদ্যুৎ সাশ্রয় বাড়ানো
  • সরকারি ক্রয়ে অর্থসংস্থান ও বিধিমালা অনুসরণ
  • আন্তঃদপ্তর বিরোধ সমন্বয়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি
  • ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বাস্তবায়ন তদারকি
  • উন্নয়ন প্রকল্পের নজরদারি বাড়ানো
  • সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি ছাড়া দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা

নোট: আপনার দেওয়া ছবিতে “২০ দফা” লেখা থাকলেও ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর হালনাগাদ সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনাকে ২৩ দফা বলা হয়েছে। তাই প্রকাশের ক্ষেত্রে “২৩ দফা নির্দেশনা” ব্যবহার করাই বর্তমান সংবাদসূত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিজ্ঞপ্তি ও প্রজ্ঞাপন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *