এইমাত্র পাওয়া

সমাজসেবা অধিদপ্তরের ১,৪৮৫ পদে ২১ লাখ ২৩ হাজার আবেদন, প্রতি পদের বিপরীতে লড়াই প্রায় ১,৪৩০ জনের

বাংলাদেশে সরকারি চাকরির জন্য চাকরিপ্রার্থীদের প্রতিযোগিতা যে কতটা তীব্র হয়ে উঠেছে, তার একটি বড় উদাহরণ তৈরি হয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক নিয়োগে। মাত্র ১ হাজার ৪৮৫টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন করেছেন ২১ লাখ ২৩ হাজার প্রার্থী। অর্থাৎ গড়ে প্রতি একটি পদের বিপরীতে প্রায় ১ হাজার ৪৩০ জন চাকরিপ্রার্থী প্রতিযোগিতা করছেন।

এই বিপুল আবেদন শুধু চাকরিপ্রার্থীদের প্রতিযোগিতার চিত্রই তুলে ধরছে না, বরং সরকারি চাকরির প্রতি মানুষের আগ্রহ এবং দেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

৫২ ক্যাটাগরিতে ১,৪৮৫ পদ

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সমাজসেবা অধিদপ্তর ২০২৬ সালের ২৪ মে ১৩তম থেকে ২০তম গ্রেডের বিভিন্ন পদে নিয়োগের জন্য সংশোধিত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। মোট ৫২টি ক্যাটাগরিতে ১ হাজার ৪৮৫ জন নিয়োগ দেওয়ার কথা রয়েছে। এসব পদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা পদভেদে এসএসসি থেকে স্নাতক বা সমমান পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছিল।

অনলাইনে আবেদন গ্রহণ শুরু হয় ২ জুন ২০২৬ সকাল ১০টায় এবং শেষ হয় ২৩ জুন বিকেল ৫টায়। পদভেদে আবেদন ফি ছিল ৫০ থেকে ১০০ টাকা এবং টেলিটকের মাধ্যমে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।

আবেদন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর দেখা যায়, মোট আবেদন জমা পড়েছে ২১ লাখ ২৩ হাজার।

এক নজরে হিসাব

  • মোট পদ: ১,৪৮৫টি
  • মোট আবেদন: ২১ লাখ ২৩ হাজার
  • প্রতি পদের বিপরীতে আবেদন: প্রায় ১,৪৩০ জন
  • নিয়োগের ক্যাটাগরি: ৫২টি
  • গ্রেড: ১৩তম–২০তম
  • আবেদনকাল: ২–২৩ জুন ২০২৬
  • আবেদন ফি: পদভেদে ৫০–১০০ টাকা

অর্থাৎ, গড়ে ১,৪৩০ জন প্রার্থী একটি পদের জন্য পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছেন। শেষ পর্যন্ত নিয়োগ পাবেন মাত্র ১,৪৮৫ জন।

বিসিএসের তুলনায়ও আবেদনকারীর সংখ্যা বেশি

সমাজসেবা অধিদপ্তরের এই নিয়োগে মোট আবেদনকারীর সংখ্যা সাম্প্রতিক কয়েকটি সাধারণ বিসিএস পরীক্ষায় জমা পড়া আবেদনের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সর্বশেষ ৫০তম বিসিএসে ২ হাজার ১৫০টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার প্রার্থী। ৪৯তম বিসিএসে আবেদন ছিল প্রায় ৩ লাখ ১২ হাজার; ৪৭তম, ৪৬তম ও ৪৫তম বিসিএসে আবেদন ছিল যথাক্রমে প্রায় ৩ লাখ ৭৪ হাজার, ৩ লাখ ৩৭ হাজার ও ৩ লাখ ৪৬ হাজার।

এখানে অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়োগে একাধিক গ্রেড ও ৫২টি ক্যাটাগরির পদ রয়েছে। তাই বিসিএসের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতামূলক কাঠামোর তুলনা করা যায় না। তবে আবেদনের মোট সংখ্যার দিক থেকে পার্থক্যটি অত্যন্ত বড়।

৪৭৮টি পদই অফিস সহকারী

এই নিয়োগে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পদ রয়েছে অফিস সহকারী পদে। মোট ৪৭৮টি পদে নিয়োগ দেওয়া হবে। এসব পদের জন্য এসএসসি পর্যায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া ৩১২টি ইউনিয়ন সমাজকর্মী পদও রয়েছে।

ফলে এসএসসি, উচ্চমাধ্যমিক কিংবা স্নাতক—বিভিন্ন শিক্ষাগত যোগ্যতার চাকরিপ্রার্থীদের জন্য এই নিয়োগে আবেদন করার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। আর যোগ্যতার পরিসর তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত হওয়ায় আবেদনকারীর সংখ্যাও ব্যাপক হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলোতে উঠে এসেছে।

বিপুল আবেদন, পরীক্ষা আয়োজনেই বড় চ্যালেঞ্জ

এত বিপুলসংখ্যক আবেদন এখন নিয়োগ কর্তৃপক্ষের সামনে নতুন ধরনের প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ২১ লাখের বেশি প্রার্থীর পরীক্ষা আয়োজনের জন্য পর্যাপ্ত কেন্দ্র, প্রশ্নপত্র, পরীক্ষক ও পরিদর্শক ব্যবস্থাপনা, উত্তরপত্র মূল্যায়নসহ পুরো প্রক্রিয়াটি বড় আকারে পরিচালনা করতে হবে।

সমাজসেবা অধিদপ্তর জানিয়েছে, এত বিপুল আবেদনকারীর পরীক্ষা আয়োজনের বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। পরীক্ষা কীভাবে নেওয়া হবে এবং প্রাথমিকভাবে কতজনকে পরবর্তী ধাপের জন্য বাছাই করা হবে—এসব বিষয় নিয়েও আলোচনা চলছে।

এখনো পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা হয়নি

আবেদনের সময় শেষ হওয়ার প্রায় তিন মাস পার হলেও নিয়োগ পরীক্ষার তারিখ এখনো ঘোষণা করা হয়নি। সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর পরীক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এ কারণে ইতোমধ্যে আবেদন করা লাখ লাখ চাকরিপ্রার্থী পরীক্ষার তারিখ ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছেন। বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থীর কারণে স্বাভাবিক নিয়োগ পরীক্ষার তুলনায় এখানে প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনার পরিধিও অনেক বড়।

নিয়োগ প্রক্রিয়া হতে পারে একাধিক ধাপে

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় লিখিত পরীক্ষা, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ব্যবহারিক পরীক্ষা এবং মৌখিক পরীক্ষা থাকবে। তবে ২১ লাখের বেশি আবেদনকারীর কারণে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রার্থী বাছাইয়ের পদ্ধতি কী হবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অর্থাৎ আবেদন করলেই প্রত্যেক প্রার্থী পরবর্তী সব ধাপে যাওয়ার সুযোগ পাবেন—এমন নয়। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী পরীক্ষার মাধ্যমে ধাপে ধাপে যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করা হবে।

কেন সরকারি চাকরিতে এত আগ্রহ?

অর্থনীতিবিদ ও কর্মসংস্থান বিশ্লেষকদের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে চাকরির নিরাপত্তা, নির্ধারিত বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা এবং সামাজিক মর্যাদা চাকরিপ্রার্থীদের আকৃষ্ট করে। একই সময়ে বেসরকারি খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি নিয়ে উদ্বেগ থাকায় সরকারি চাকরির প্রতি আগ্রহ আরও দৃশ্যমান হচ্ছে।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ সীমিত থাকায় সরকারি চাকরিতে বেশি চাপ তৈরি হচ্ছে। প্রতিবেদনে বেসরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তি কমে যাওয়ার প্রবণতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

২১ লাখ আবেদন কী বার্তা দিচ্ছে?

সমাজসেবা অধিদপ্তরের এই একটি নিয়োগকে বাংলাদেশের পুরো শ্রমবাজারের পূর্ণাঙ্গ চিত্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে এটি চাকরির বাজারে সরকারি চাকরির জন্য তীব্র প্রতিযোগিতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

বিশেষ করে ১,৪৮৫টি পদের বিপরীতে ২১ লাখ ২৩ হাজার আবেদন মানে প্রায় ১ হাজার ৪৩০ জনে একজনের মতো প্রার্থী গড়ে একটি পদে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ পাবেন—যদিও বাস্তবে পদ ও যোগ্যতা অনুযায়ী প্রতিযোগিতার হার ভিন্ন হবে।

আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। আবেদনকারীদের সবাই একই শিক্ষাগত যোগ্যতার নন এবং ৫২টি ক্যাটাগরির সব পদেও সমানসংখ্যক আবেদন হয়নি। ফলে ১:১,৪৩০ অনুপাতটি একটি গড় হিসাব, কোনো নির্দিষ্ট পদের প্রকৃত প্রতিযোগিতার হার নয়।

সামনে এখন কী?

বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—২১ লাখ ২৩ হাজার আবেদনকারীর পরীক্ষা কবে এবং কীভাবে নেওয়া হবে। কর্তৃপক্ষ দ্রুততম সময়ে নিয়োগ সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে।

পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা হলে লাখ লাখ চাকরিপ্রার্থীর প্রস্তুতি আরও জোরদার হবে। এরপর লিখিত, ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ১ হাজার ৪৮৫ জন প্রার্থীই সরকারি চাকরিতে নিয়োগের জন্য নির্বাচিত হবেন।

সব মিলিয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের এই নিয়োগ বাংলাদেশের সরকারি চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতার ব্যাপ্তি কতটা বেড়েছে, তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে। ১,৪৮৫টি পদ—কিন্তু আবেদন ২১ লাখ ২৩ হাজার; প্রতি পদের জন্য গড়ে প্রায় ১,৪৩০ জনের প্রতিযোগিতা। এখন অপেক্ষা পরীক্ষার তারিখ এবং চূড়ান্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার।

তথ্যসূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, প্রথম আলো ও সাম্প্রতিক প্রকাশিত নিয়োগ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *