আমানতের টাকা তুলতে না পেরে হাইকোর্টে ন্যাশনাল ব্যাংকের ৪ গ্রাহক
নিজস্ব অর্থ উত্তোলনে বাধার অভিযোগ, সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে রিট
ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসিতে জমা থাকা নিজেদের বৈধ আমানতের টাকা উত্তোলন করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন চার আমানতকারী। ব্যাংক হিসাবে পর্যাপ্ত অর্থ থাকার পরও চেক জমা দিয়ে টাকা তুলতে না পারা এবং সংশ্লিষ্ট শাখায় বারবার যোগাযোগ করেও সমাধান না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন তারা। বিষয়টি নিয়ে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্ট বিভাগে রিট আবেদন করা হয়েছে।
১৭ সেপ্টেম্বর টাকা তুলতে গিয়ে বিপাকে চার গ্রাহক
রিট আবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ চার আমানতকারী নিজেদের সংশ্লিষ্ট শাখায় টাকা উত্তোলনের জন্য চেক জমা দেন। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংক শাখা কর্তৃপক্ষ চেকগুলো প্রক্রিয়াজাত বা অর্থ পরিশোধ করেনি এবং এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট কারণও জানানো হয়নি।
ভুক্তভোগীদের মধ্যে ময়মনসিংহের ভালুকা শাখার গ্রাহক মো. শামীম আহমেদ ২ লাখ ২০ হাজার টাকা উত্তোলনের জন্য ৪৮৭১৬৮৪ নম্বরের চেক জমা দেন। কিন্তু তিনি অর্থ না পেয়েই শাখা থেকে ফিরে আসেন।
একই দিনে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর এসএমই শাখার গ্রাহক নাসিমা বেগম ৩০ হাজার টাকা উত্তোলনের জন্য NSB-K ৭২৩৬৪৩২ নম্বরের চেক জমা দেন। তিনিও নিজের হিসাবে থাকা অর্থ তুলতে পারেননি বলে রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া মির্জাপুর এসএমই কৃষি শাখার লাকি আক্তার এবং মির্জাপুর শাখার মোছা. সাথী বেগম একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন বলে আবেদনে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকেও অভিযোগ, মেলেনি তাৎক্ষণিক প্রতিকার
ব্যাংক শাখা থেকে প্রত্যাশিত সমাধান না পাওয়ার পর চার আমানতকারী বাংলাদেশ ব্যাংকের Customer Interest Protection Center (CIPC) এবং Financial Integrity and Customer Services Department (FICSD)-এ ই-মেইলের মাধ্যমে লিখিত অভিযোগ করেন।
রিট আবেদনে বলা হয়েছে, অভিযোগ জানানোর পরও তারা কার্যকর বা তাৎক্ষণিক প্রতিকার পাননি। এরপর নিজেদের আমানতের অর্থ উত্তোলনের সুযোগ নিশ্চিত করতে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তারা।
হাইকোর্টে রিট, প্রশ্ন বৈধ অর্থ আটকে রাখার আইনগত ভিত্তি নিয়ে
চার গ্রাহকের পক্ষ থেকে দায়ের করা রিটটির নম্বর ১৩৬৬৮/২০২৬। এতে ব্যাংকে থাকা বৈধ আমানতের অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দিতে ব্যর্থ হওয়াকে কেন বেআইনি ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না—সে বিষয়ে রুল জারির আবেদন করা হয়েছে।
অর্থাৎ, এই মামলার মূল প্রশ্ন শুধু চারজন গ্রাহক টাকা পেয়েছেন কি না—এতেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং ব্যাংক হিসাবে অর্থ থাকার পরও একজন আমানতকারী কেন সেই অর্থ প্রয়োজনের সময় উত্তোলন করতে পারবেন না এবং এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব কী—সেটিও আইনি আলোচনায় আসতে পারে।
মামলায় ভুক্তভোগীদের পক্ষে মো. শামীম আহমেদকে আমমোক্তার বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের পক্ষে রিট আবেদন পরিচালনা করছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মারুফ উল আবেদ।
আমানতকারীদের জন্য ঘটনাটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
ব্যাংকে টাকা জমা রাখার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো প্রয়োজনের সময় সেই অর্থ নিরাপদে ব্যবহার করতে পারা। কিন্তু হিসাবের অর্থ থাকা সত্ত্বেও তা উত্তোলনে বাধা সৃষ্টি হলে গ্রাহকের দৈনন্দিন আর্থিক পরিকল্পনা, চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা কিংবা জরুরি পারিবারিক ব্যয়ের ওপর সরাসরি চাপ তৈরি হতে পারে।
এই চার গ্রাহকের মামলাটি তাই বৃহত্তর অর্থে আমানতকারীর অধিকার, ব্যাংকের গ্রাহকসেবা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থার প্রশ্ন সামনে এনেছে। তবে চারজন গ্রাহকের অভিযোগের ভিত্তিতে পুরো ব্যাংকের সব শাখা বা সব আমানতকারী একই পরিস্থিতিতে রয়েছেন—এমন সাধারণ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। প্রকাশিত প্রতিবেদনে মূলত সংশ্লিষ্ট চার আমানতকারীর অভিজ্ঞতা ও তাদের রিট আবেদনের বক্তব্যই উঠে এসেছে।
তারল্য সংকট ও অনিয়মের প্রসঙ্গ কতটা নিশ্চিত?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা বিভিন্ন আলোচনায় ব্যাংকের তারল্য সংকট এবং পরিচালনা পর্ষদের অনিয়মের বিষয়টি সামনে আসতে পারে। কিন্তু এই চার গ্রাহকের রিটের ক্ষেত্রে টাকা না দেওয়ার নির্দিষ্ট কারণ হিসেবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো প্রকাশ্য ব্যাখ্যা এই প্রতিবেদনগুলোতে পাওয়া যায়নি।
তাই চার গ্রাহকের অর্থ উত্তোলনে বাধার ঘটনাকে সরাসরি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনিয়ম বা সামগ্রিক তারল্য সংকটের ফল হিসেবে চূড়ান্তভাবে উপস্থাপন করা সতর্কতার সঙ্গে করা উচিত। রিট আবেদনে গ্রাহকেরা ব্যাংকের শাখা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অর্থ না দেওয়ার অভিযোগ করেছেন—এটি তাদের বক্তব্য; মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও নথি বিবেচিত হবে।
সামনে কী হতে পারে
এখন নজর থাকবে হাইকোর্টের পরবর্তী কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অবস্থানের দিকে। আদালতের রুলের পর সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে তাদের বক্তব্য ও আইনগত অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হতে পারে। পরবর্তী আদেশে আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলনের বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনা আসে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
চার গ্রাহকের ঘটনাটি একই সঙ্গে একটি বড় বাস্তবতাও সামনে এনেছে—ব্যাংকে টাকা জমা রাখা এবং প্রয়োজনের সময় সেই অর্থ ব্যবহার করতে পারার মধ্যে কোনো বাধা তৈরি হলে প্রতিকার পাওয়ার কার্যকর পথ কতটা দ্রুত ও কার্যকর হওয়া প্রয়োজন।
এই ঘটনায় চারজন আমানতকারী প্রথমে ব্যাংক শাখায় যোগাযোগ করেছেন, এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগে অভিযোগ করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। ফলে মামলাটি শুধু অর্থ ফেরতের আবেদন নয়; এটি গ্রাহক অধিকার ও ব্যাংকিং সেবার জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পরীক্ষাও হয়ে উঠতে পারে।
সংক্ষেপে: ন্যাশনাল ব্যাংকের চার গ্রাহক ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নিজেদের হিসাবে থাকা অর্থ তুলতে চেক জমা দিয়েও টাকা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে যোগাযোগের পরও সমাধান না হওয়ায় তারা সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্টে রিট করেছেন। রিটে তাদের বৈধ আমানত উত্তোলনে বাধার বিষয়টিকে বেআইনি ঘোষণার দাবি জানানো হয়েছে।
সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন, যুগান্তর ও দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রতিবেদন।


