ভূমি অফিসের বারান্দা থেকে রাষ্ট্রের বন্দোবস্ত: কেন নাগরিক সেবা বারবার ব্যর্থ হয়
ভূমি অফিসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন আবুল হোসেন। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। বাবার রেখে যাওয়া সাড়ে সাত শতাংশ জমির নামজারি করাতে কয়েকদিন ধরে অফিসে আসছেন তিনি। প্রথম দিন বলা হলো, কাগজপত্র ঠিক নেই। দ্বিতীয় দিন জানানো হলো, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নেই। তৃতীয় দিন কাগজও ঠিক, কর্মকর্তাও আছেন—কিন্তু এবার সার্ভার কাজ করছে না।
‘সার্ভার’ কী, আবুল হোসেন তা জানেন না। তিনি শুধু জানেন, আবারও তার কাজ হলো না।
সকাল ৯টা থেকে দাঁড়িয়ে আছেন। বসার জায়গা নেই। বয়সের কারণে দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে থাকাও কষ্টকর। তবু অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কারণ একটি সরকারি সেবার জন্য তাকে নিজের ছোট দোকান বন্ধ করে আসতে হয়েছে। প্রতিটি ব্যর্থ দিন মানে শুধু সময়ের অপচয় নয়—হারানো আয়, যাতায়াতের খরচ এবং মানসিক চাপও।
এই গল্পটি কোনো একক মানুষের গল্প নয়। বাংলাদেশের সরকারি সেবা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের একটি পরিচিত অভিজ্ঞতার প্রতীক হিসেবে এটিকে দেখা যায়।
প্রশ্নটা সার্ভার ডাউন নয়, প্রশ্নটা ব্যবস্থার
একটি সরকারি অফিসে সার্ভার সাময়িকভাবে অচল হতেই পারে। কর্মকর্তা অনুপস্থিত থাকতে পারেন। নাগরিকের কাগজপত্রেও ভুল থাকতে পারে। এগুলো প্রশাসনিক বাস্তবতার অংশ।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন একই ধরনের বাধা বছরের পর বছর নাগরিকের অভিজ্ঞতার স্থায়ী অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
ডিজিটাল সেবা চালু হয়েছে, ই-নামজারি এসেছে, অনলাইন আবেদন হয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু প্রযুক্তি যদি নাগরিকের অফিসে যাওয়ার সংখ্যা কমাতে না পারে, অপেক্ষার সময় কমাতে না পারে এবং সিদ্ধান্ত পাওয়ার নিশ্চয়তা না দেয়, তাহলে ডিজিটাইজেশন কেবল পুরোনো ব্যবস্থার ওপর নতুন একটি স্তর তৈরি করে।
অর্থাৎ, কাগজের ফাইলের জায়গায় ডিজিটাল ফাইল এলেই প্রশাসনিক সংস্কার সম্পূর্ণ হয় না। আসল পরিবর্তন তখনই হয়, যখন নাগরিকের ভোগান্তি কমে।
‘হয়রানি’ কি শুধু অদক্ষতার ফল?
সরকারি সেবা নিয়ে সাধারণ মানুষের একটি বহুল প্রচলিত ধারণা হলো—কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজ করেন না, অফিসে লোকবল কম, বাজেট কম, প্রযুক্তি দুর্বল। এসব কারণ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু আরও গভীর একটি প্রশ্ন আছে—একটি অদক্ষ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন টিকে থাকে কীভাবে?
যদি কোনো কাজ স্বচ্ছ নিয়মে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এবং মানুষের সরাসরি যোগাযোগ ছাড়াই সম্পন্ন করা যায়, তাহলে মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ কমে যায়। বিপরীতে, প্রক্রিয়া যত জটিল, অনিশ্চিত এবং ব্যক্তিনির্ভর হয়, তত বেশি তৈরি হয় ‘সহায়তা’র নামে অনানুষ্ঠানিক মধ্যস্থতার জায়গা।
এখানেই নাগরিক হয়রানি শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা থাকে না; এটি ক্ষমতা, তথ্য এবং প্রবেশাধিকারের অসম সম্পর্কের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
তবে এ থেকে সরাসরি বলা ঠিক হবে না যে প্রতিটি কর্মকর্তা, কর্মচারী বা দালাল ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবস্থা অকার্যকর রাখেন। বাস্তবতা আরও জটিল। অনেক ক্ষেত্রে নিয়মের জটিলতা, সিদ্ধান্তের কেন্দ্রীকরণ, পুরোনো প্রশাসনিক সংস্কৃতি, জবাবদিহির দুর্বলতা এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা একসঙ্গে সমস্যাকে স্থায়ী করে।
আবুল হোসেন কেন বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু ভূমি অফিসের দিকে তাকালে হবে না।
একজন নাগরিককে কেন একই কাজের জন্য বারবার অফিসে যেতে হয়?
কেন আবেদন গ্রহণের পর তাকে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয় না?
কেন আবেদন কোন পর্যায়ে আছে, সেটি সহজে জানা যায় না?
কেন একটি সেবার জন্য নাগরিককে একাধিক টেবিল, কর্মকর্তা কিংবা অনানুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভর করতে হয়?
এসব প্রশ্নের উত্তরেই প্রশাসনিক সংস্কারের প্রকৃত জায়গা।
একটি কার্যকর রাষ্ট্রে নাগরিককে ‘কার সঙ্গে দেখা করতে হবে’—এই তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয় না। সেখানে প্রক্রিয়াই নাগরিককে পথ দেখায়।
১৭৯৩-এর বন্দোবস্ত থেকে আজকের প্রশাসন—একটি দীর্ঘ ছায়া
বাংলার প্রশাসনিক ইতিহাসে ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। ব্রিটিশ শাসনামলে জমির রাজস্ব আদায়ের কাঠামোয় জমিদার শ্রেণিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেওয়া হয়েছিল। এর মাধ্যমে ভূমি, রাজস্ব ও ক্ষমতার সম্পর্ক একটি নির্দিষ্ট কাঠামো পেয়েছিল।
তবে আজকের বাংলাদেশের সরকারি অফিসকে সরাসরি সেই ব্যবস্থার সঙ্গে এক করে দেখা ইতিহাসের দিক থেকে অতিসরলীকরণ হবে।
কিন্তু একটি ধারণাগত মিল নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়—ক্ষমতা ও সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ যখন উৎপাদনের চেয়ে বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে প্রবেশাধিকার নিজেই একটি সম্পদে পরিণত হতে পারে কি না।
আজ জমিদার নেই। কিন্তু লাইসেন্স, অনুমোদন, সরকারি সম্পদের ইজারা, প্রকল্প, ঠিকাদারি, নিয়োগ, বদলি বা বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত ক্ষমতা এখনো অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্য তৈরি করতে পারে।
এখানেই ‘বন্দোবস্ত’ শব্দটি একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক রূপক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
কাগজের ক্ষমতা
একটি জমির মালিকানা কাগজে প্রতিষ্ঠিত হয়। একটি ব্যবসা পরিচালনার জন্য অনুমতি লাগে। কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হতে পারে। সরকারি সম্পদ ব্যবহারের জন্য ইজারা লাগে।
অর্থাৎ রাষ্ট্রের হাতে এমন বহু দরজা রয়েছে, যেগুলোর চাবি নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের প্রয়োজন।
এই দরজাগুলো যদি স্বচ্ছ, পূর্বনির্ধারিত এবং সমান নিয়মে খোলে, তাহলে রাষ্ট্র নাগরিকের জন্য সেবা প্রদান করে।
কিন্তু দরজা যদি ব্যক্তিনির্ভর হয়, তাহলে ক্ষমতার সঙ্গে জন্ম নেয় মধ্যস্বত্বভোগী।
এখানেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক দিক তৈরি হয়—অনুমতির মূল্য।
সরকারি চাকরির প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণের পেছনেও কি একই বাস্তবতা?
বাংলাদেশে সরকারি চাকরির প্রতি মানুষের প্রবল আকর্ষণকে শুধু ‘চাকরির নিরাপত্তা’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
বেতন, পেনশন, সামাজিক মর্যাদা, চাকরির স্থায়িত্ব—এসব অবশ্যই কারণ। কিন্তু সরকারি পদ যে প্রশাসনিক ক্ষমতা, সামাজিক প্রভাব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাছাকাছি থাকার সুযোগ তৈরি করে, সেটিও অনেকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে বিসিএস বা অন্যান্য সরকারি নিয়োগ পরীক্ষা কেবল একটি চাকরি পাওয়ার প্রতিযোগিতা নয়; অনেক পরিবারের কাছে এটি সামাজিক নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার পথ।
তবে এখানেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সরকারি চাকরিতে থাকা মানেই কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করেন—এমন ধারণা যেমন ভুল, তেমনি সরকারি পদকে কেবল একটি সাধারণ চাকরি হিসেবে দেখাও বাস্তবতার পূর্ণ চিত্র নয়।
সমস্যাটি ব্যক্তির চরিত্রে যতটা, তার চেয়ে বেশি প্রতিষ্ঠানের নকশায়।
থানার ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন
ভূমির মালিকানা কাগজে থাকলেও বাস্তবে দখল রক্ষা করতে হয়। সেখানে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো বিরোধে পুলিশ কীভাবে реаг করবে, মামলা কীভাবে এগোবে, তদন্ত কত দ্রুত হবে—এসবের ওপর মানুষের বাস্তব জীবনের নিরাপত্তা ও সম্পদের মূল্য নির্ভর করতে পারে।
তাই আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি দুর্বল হলে নাগরিকের আইনি অধিকারও দুর্বল হয়ে পড়ে।
একই যুক্তি স্থানীয় বাজার, বাসস্ট্যান্ড, ঘাট, বালুমহাল, জলমহাল কিংবা সরকারি জমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যেখানে সরকারি সম্পদ বা অনুমতির ওপর নিয়ন্ত্রণ আছে, সেখানে স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকলে অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতার নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে।
আসল সমস্যা ‘লোভী মানুষ’ নয়, প্রণোদনার কাঠামো
রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকে শুধু মানুষের নৈতিক দুর্বলতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা সহজ। কিন্তু তাতে সমস্যার মূল জায়গাটি আড়ালে থেকে যায়।
একজন সৎ কর্মকর্তা কেন সবসময় একটি অকার্যকর ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে পারেন না?
কারণ ব্যক্তি বদলালেও প্রতিষ্ঠান একই থাকতে পারে।
একজন নতুন কর্মকর্তা এলেন, কিন্তু তার হাতে একই জটিল নিয়ম। একই অনুমোদন কাঠামো। একই কাগজপত্র। একই জবাবদিহির সীমাবদ্ধতা। একই তথ্যের অসমতা।
তখন ভালো মানুষও অনেক সময় খারাপ ব্যবস্থার অংশ হয়ে যান।
এ কারণে প্রশাসনিক সংস্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—সৎ মানুষ বসানো নয়; এমন ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে অসৎ হওয়ার সুযোগ কম থাকে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে কার্যকর রাষ্ট্র—দূরত্বটা এখানেই
ডিজিটাল সেবা রাষ্ট্রের জন্য বিশাল সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু ডিজিটাল ব্যবস্থা তখনই সফল, যখন প্রযুক্তি ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ কমায়।
নাগরিক যদি অনলাইনে আবেদন করতে পারেন, কিন্তু পরে পাঁচবার অফিসে যেতে হয়—তাহলে ডিজিটাল সেবা অসম্পূর্ণ।
নাগরিক যদি আবেদন করতে পারেন, কিন্তু আবেদন কোথায় আটকে আছে জানতে না পারেন—তাহলে স্বচ্ছতা তৈরি হয়নি।
নাগরিক যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত না পান, কিন্তু বিলম্বের জন্য কোনো জবাবদিহি না থাকে—তাহলে প্রযুক্তি কেবল একটি নতুন ইন্টারফেস।
প্রকৃত ডিজিটাল সংস্কারের অর্থ হওয়া উচিত—
কম অফিসে যাওয়া, কম মানুষের সঙ্গে দেখা করা, কম কাগজ দেওয়া, কম অপেক্ষা করা এবং নির্দিষ্ট সময়ে ফল পাওয়া।
তাহলে সমাধান কোথায়?
সমাধান শুধু নতুন প্রকল্প নয়। বরং প্রতিটি সরকারি সেবাকে নাগরিকের দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন করে নকশা করা।
প্রথমত, প্রতিটি সেবার জন্য বাধ্যতামূলক সময়সীমা থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আবেদন কোন পর্যায়ে আছে—নাগরিককে তা অনলাইনে জানতে দিতে হবে।
তৃতীয়ত, কোনো কর্মকর্তা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ না করলে তার কারণ রেকর্ড হতে হবে।
চতুর্থত, একই তথ্য বারবার জমা দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
পঞ্চমত, দালালনির্ভরতা কমাতে সরকারি ফি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, সময়সীমা ও সিদ্ধান্তের মানদণ্ড প্রকাশ্য করতে হবে।
ষষ্ঠত, অভিযোগের স্বাধীন ও কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—একটি সরকারি সেবার সফলতার মাপকাঠি হবে অফিস কতটি কম্পিউটার কিনেছে তা নয়; নাগরিক কত কমবার অফিসে গেছে।
রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সংস্কার হতে পারে ‘বারান্দা’ দূর করা
আবুল হোসেনের গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ সার্ভার ডাউন নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো—তিনি জানেন না তার কাজ কবে হবে।
এই অনিশ্চয়তাই নাগরিককে দুর্বল করে।
যে নাগরিক জানেন, তার আবেদন ৭ কর্মদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তি হবে এবং না হলে কোথায় অভিযোগ করতে হবে—তিনি রাষ্ট্রের কাছে ভিক্ষুক নন। তিনি একজন অধিকারসম্পন্ন নাগরিক।
অন্যদিকে যে নাগরিককে প্রতিদিন অফিসে গিয়ে জানতে হয়, ‘স্যার আছেন?’ ‘কাগজ ঠিক আছে?’ ‘ফাইল কোথায়?’—তিনি ধীরে ধীরে নিজের অধিকারকে অনুগ্রহ হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
রাষ্ট্রের সবচেয়ে গভীর ব্যর্থতা এখানেই।
সরকার বদলায়, কিন্তু বারান্দা কেন থাকে?
সরকার পরিবর্তন হয়। কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়। মন্ত্রী পরিবর্তন হয়। প্রকল্প আসে। নতুন সফটওয়্যার আসে। নতুন কমিটি গঠিত হয়।
কিন্তু নাগরিকের অভিজ্ঞতা যদি একই থাকে, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যাটি ব্যক্তি পরিবর্তনের চেয়ে গভীরে।
রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে একজন ব্যক্তি চলে গেলে সেবাটি থেমে না যায়।
একজন কর্মকর্তা না থাকলে বিকল্প কর্মকর্তা থাকতে হবে।
সার্ভার বন্ধ থাকলে বিকল্প ব্যবস্থা থাকতে হবে।
কাগজে ভুল থাকলে একবারেই তা জানাতে হবে।
আবেদন জমা হলে তার ট্র্যাকিং নম্বর থাকতে হবে।
আর নাগরিককে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না—কারণ রাষ্ট্র জানবে তার কাজটি কোথায় এবং কেন আটকে আছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা আবুল হোসেনের নয়
আবুল হোসেন কাল আবার ভূমি অফিসে যাবেন কি না, সেটাই মূল প্রশ্ন নয়।
মূল প্রশ্ন হলো—একটি রাষ্ট্র তার নাগরিককে কতটা সময় অপেক্ষা করাবে?
একটি জমির নামজারির জন্য একজন মানুষকে কতবার অফিসে যেতে হবে?
একটি সরকারি সেবা পেতে তাকে কতজনের সঙ্গে কথা বলতে হবে?
এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—রাষ্ট্রের যে সেবা নাগরিকের অধিকার, সেটি কেন নাগরিকের জন্য অনুগ্রহের মতো অনুভূত হবে?
যে ব্যবস্থায় নাগরিকের কাজ নির্ধারিত নিয়মে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এগোয়, সেখানে দালালের প্রয়োজন কমে। যে ব্যবস্থায় তথ্য প্রকাশ্য, সেখানে তথ্যের দখলদারির মূল্য কমে। যে ব্যবস্থায় সময়সীমা বাধ্যতামূলক, সেখানে বিলম্বের ক্ষমতা কমে। আর যে ব্যবস্থায় সিদ্ধান্তের জন্য ব্যক্তির ওপর নির্ভরতা কম, সেখানে ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগও কমে।
সুতরাং বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কারের মূল লড়াই শুধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে নয়।
এটি অস্বচ্ছতা, অনিশ্চয়তা, ব্যক্তিনির্ভরতা এবং জবাবদিহিহীনতার বিরুদ্ধে লড়াই।
আবুল হোসেনকে বারান্দা থেকে সরিয়ে আনতে হলে শুধু ভূমি অফিসের দরজা খুললেই হবে না; রাষ্ট্রের কাজ করার পদ্ধতিটাই বদলাতে হবে।
কারণ একজন আবুল হোসেন বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকলে সেটি হয়তো একটি ব্যক্তিগত দুর্ভোগ।
কিন্তু লক্ষ মানুষ একই বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকলে সেটি আর ব্যক্তিগত সমস্যা নয়—সেটি রাষ্ট্রের নকশার সমস্যা।
আর সেই নকশা বদলানোই হবে প্রকৃত প্রশাসনিক সংস্কারের শুরু।


