টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক বিতর্ক: আতঙ্ক নয়, বৈজ্ঞানিক যাচাই শেষে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা বিএসটিআইয়ের
দেশে প্রচলিত বিভিন্ন টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকার অভিযোগ ঘিরে জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হলেও, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) জানিয়েছে—বিষয়টি নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। অভিযোগের বৈজ্ঞানিক সত্যতা যাচাই করতে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং পরীক্ষায় অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সম্প্রতি এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত গবেষণায় দেশের কিছু টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির দাবি করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিএসটিআই এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ছাড়া কোনো ব্র্যান্ড বা পণ্যকে অনিরাপদ ঘোষণা করা সমীচীন নয়।
মাইক্রোপ্লাস্টিক কী এবং কেন আলোচনা?
বিএসটিআই জানায়, মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো ৫ মিলিমিটারের কম আকারের ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা, যা খালি চোখে সাধারণত দেখা যায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বর্তমানে মাইক্রোপ্লাস্টিকের স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। সংস্থাটির মতে, এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে এবং এখনো চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি।
আন্তর্জাতিক নীতিমালায় কী বলা হয়েছে?
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে Microbead-Free Waters Act of 2015 অনুযায়ী টুথপেস্টসহ কিছু Rinse-off Cosmetics-এ ইচ্ছাকৃতভাবে মাইক্রোবিড ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। একইভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের Regulation (EU) 2023/2055 অনুযায়ীও নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কিছু প্রসাধনী পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন মান সংস্থা যেমন ISO বা ASTM এখনো টুথপেস্টে অনিচ্ছাকৃতভাবে উপস্থিত মাইক্রোপ্লাস্টিকের জন্য নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য সীমা (Maximum Limit) বা একক পরীক্ষাপদ্ধতি নির্ধারণ করেনি বলেও জানায় বিএসটিআই।
বাংলাদেশের মানদণ্ডে কী রয়েছে?
বিএসটিআই জানায়, দেশে টুথপেস্টের জন্য BDS 1216:2012 Specification for Toothpaste মান কার্যকর রয়েছে। এই মান অনুযায়ী বাজারজাত টুথপেস্টকে রাসায়নিক, মাইক্রোবায়োলজিক্যাল এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।
এছাড়া বিএসটিআইর মান অনুযায়ী টুথপেস্টে ব্যবহারযোগ্য ১৮টি উপাদানের তালিকা রয়েছে, যেখানে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উল্লেখ নেই। পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও নিয়মিত যাচাই করা হয়।
অভিযোগের বৈজ্ঞানিক যাচাই চলছে
বিএসটিআই জানিয়েছে, কোনো পরীক্ষায় ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হওয়া মানেই সেটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। এজন্য পরীক্ষার ধরন, নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষাপদ্ধতি, কণার উৎস, পরিমাণ এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি—সবকিছু বিশদভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে গবেষণার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন, পরীক্ষাপদ্ধতি, পরীক্ষার Raw Data এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উৎপাদক ও আমদানিকারকদের কাছ থেকেও কাঁচামাল, উপাদান এবং সিনথেটিক পলিমার ব্যবহারের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
নিজস্ব উদ্যোগে নমুনা পরীক্ষা করবে বিএসটিআই
বিএসটিআই জানিয়েছে, তারা নিজস্ব উদ্যোগে বাজার ও কারখানা থেকে টুথপেস্টের নমুনা সংগ্রহ করে দেশি-বিদেশি স্বীকৃত পরীক্ষাগারে Independent Confirmation Testing পরিচালনা করবে।
পরীক্ষায় যদি প্রমাণিত হয় যে কোনো পণ্য বাংলাদেশ মানদণ্ড পূরণ করছে না অথবা অননুমোদিত উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পর্যালোচনা সভা
বিষয়টির সুষ্ঠু মূল্যায়নের জন্য বিএসটিআই ইতোমধ্যে বিশেষজ্ঞ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পরিবেশ অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, দন্ত চিকিৎসক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং ভোক্তা প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি পর্যালোচনা সভার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া গেলে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের অনিচ্ছাকৃত ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, উপাদান প্রকাশের বাধ্যবাধকতা এবং পরীক্ষাপদ্ধতি সংযোজনসহ বাংলাদেশ মান হালনাগাদের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জনসাধারণের প্রতি আহ্বান
বিএসটিআই জনসাধারণকে গুজব বা আতঙ্কে বিভ্রান্ত না হয়ে নিয়মিত মুখের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অসম্পূর্ণ তথ্যের পরিবর্তে নির্ভরযোগ্য ও বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর আস্থা রাখার অনুরোধ করেছে।
সংস্থাটি বলেছে, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, বৈজ্ঞানিক স্বচ্ছতা এবং ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় বিএসটিআই সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।


