এইমাত্র পাওয়া

২৪ ঘণ্টার দায়িত্ব, অনিশ্চিত বিশ্রাম—বাহিনী সদস্যদের ত্যাগের মূল্যায়ন নিয়ে নতুন করে আলোচনা

দেশের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও সীমান্ত সুরক্ষায় নিয়োজিত সদস্যদের কর্মজীবন সাধারণ চাকরির মতো নয়। দায়িত্বের প্রয়োজনে নির্ধারিত কর্মঘণ্টার বাইরে কাজ করতে হয়, অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক আদেশে কর্মস্থলে উপস্থিত হতে হয় এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সময়ও দায়িত্বের প্রয়োজনে ত্যাগ করতে হয়। এ বাস্তবতা সামনে এনে বাহিনী সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা ও ঝুঁকির বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক মতামতে একজন বাহিনী সদস্য দাবি করেছেন, বাহিনীর সদস্যরা কার্যত ২৪ ঘণ্টার প্রস্তুতিমূলক অবস্থায় থাকেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কয়েক ঘণ্টা বিশ্রামের সুযোগ মিললেও সেটি অনেক সময় নিশ্চিত নয়; যেকোনো মুহূর্তে আদেশ এলে দায়িত্বে যেতে হয়।

তবে ‘প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৬/৮ ঘণ্টা বিশ্রাম’ বা ‘৭০ হাজার বিজিবি সদস্য ২০ কোটি মানুষকে নিরাপদে রাখেন’—এ ধরনের নির্দিষ্ট পরিসংখ্যানকে স্বাধীন সরকারি উৎস দিয়ে যাচাই করা যায়নি। তাই এগুলোকে সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে নয়, সংশ্লিষ্ট সদস্যের বক্তব্য হিসেবে দেখা উচিত।

সেনাবাহিনী ও পুলিশের ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, বাহিনীটি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে কাউন্টার-ইনসার্জেন্সি কার্যক্রম, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে। সেনাবাহিনী আরও জানিয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ সংঘাতের সময় বহু কর্মকর্তা ও সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।

ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বের বাস্তব উদাহরণও সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলনের সময় দুর্ঘটনায় সেনাবাহিনীর দুই সদস্য নিহত এবং একজন কর্মকর্তা গুরুতর আহত হন বলে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ পুলিশের সরকারি ওয়েবসাইটে পুলিশকে ‘round the clock service’ প্রদানকারী বাহিনী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ মোকাবিলা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা টহল, ভিআইপি নিরাপত্তা ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে দায়িত্ব পালন—এসবই পুলিশের নিয়মিত দায়িত্বের অংশ।

পুলিশের নিজস্ব প্রকাশিত ‘Sacrifice in Action’ তালিকাতেও দায়িত্ব পালনকালে সড়ক দুর্ঘটনা, হামলা এবং অন্যান্য কারণে সদস্যদের মৃত্যুর উদাহরণ রয়েছে।

সীমান্তে বিজিবির দায়িত্বও ভিন্ন মাত্রার

সীমান্ত নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও দায়িত্বের ধরন আলাদা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি প্রকাশনায় সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিজিবিকে সীমান্ত নিরাপত্তা প্রয়োগের কেন্দ্রীয় দায়িত্ব পালনকারী সংস্থা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই ব্যবস্থায় পুলিশ, কাস্টমস, পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশনসহ বিভিন্ন সংস্থারও নিজ নিজ ভূমিকা রয়েছে।

ফলে একজন সীমান্তরক্ষী সদস্যের দায়িত্ব শুধু নির্দিষ্ট একটি অফিস সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ—এভাবে পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করা কঠিন। সীমান্তের ভৌগোলিক অবস্থান, অপারেশনাল পরিস্থিতি, টহল, চেকপোস্ট, বিশেষ অভিযান এবং জরুরি পরিস্থিতির ওপর দায়িত্বের সময় ও ধরন পরিবর্তিত হতে পারে।

‘সবচেয়ে বেশি ত্যাগ’—এ দাবির ক্ষেত্রে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় সেনাবাহিনী ও পুলিশকে সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকারকারী বাহিনী হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, সব বাহিনীর সদস্যদের মৃত্যু, আহত হওয়া, কর্মঘণ্টা, ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব এবং পারিবারিক ক্ষতির তুলনামূলক জাতীয় পরিসংখ্যান ছাড়া কোন বাহিনী ‘সবচেয়ে বেশি’ ত্যাগ করেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।

কারণ সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস, আনসারসহ বিভিন্ন বাহিনীর দায়িত্বের প্রকৃতি আলাদা। কারও দায়িত্ব সীমান্তে, কারও জননিরাপত্তায়, কারও অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারকাজে, আবার কারও দায়িত্ব দুর্যোগ বা বিশেষ নিরাপত্তা কার্যক্রমে।

তাই আলোচনার মূল বিষয় হওয়া উচিত কে বেশি ত্যাগ করেছেন—এমন প্রতিযোগিতা নয়; বরং প্রত্যেক ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বের যথাযথ মূল্যায়ন কীভাবে করা যায়।

সদস্য নিহত হলে সবচেয়ে বড় আঘাত পড়ে পরিবারে

একজন বাহিনী সদস্য দায়িত্ব পালনকালে নিহত হলে শুধু একটি কর্মীশক্তি কমে যায় না; একটি পরিবারও তার প্রধান উপার্জনকারী, স্বামী, বাবা, সন্তান কিংবা ভাইকে হারাতে পারে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় কর্মরত সদস্যদের কল্যাণনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু বেতন নয়—জীবনঝুঁকি, দায়িত্বের সময়, আবাসন, চিকিৎসা, সন্তানদের শিক্ষা, নিহত সদস্যের পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা এবং অবসর-পরবর্তী সুবিধাকেও বিবেচনায় নেওয়ার দাবি উঠতে পারে।

বিশেষ করে যেসব দায়িত্বে সদস্যদের দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে থাকতে হয় বা জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিকভাবে মোতায়েন হতে হয়, সেখানে বিশ্রাম, ছুটি, মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও পরিবারকল্যাণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বেতন-ভাতা নিয়ে আলোচনায় ঝুঁকির বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পাবে?

নতুন বেতন কাঠামো বা সরকারি চাকরিজীবীদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে যখন আলোচনা চলছে, তখন বাহিনী সদস্যদের ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বও আলোচনায় আসছে। তবে বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোন বাহিনী কতটা সুবিধা পাবে—এটি শেষ পর্যন্ত সরকারি নীতিনির্ধারণ, দায়িত্বের প্রকৃতি, বিদ্যমান বিধি এবং আর্থিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে।

এক্ষেত্রে একটি কাঠামোবদ্ধ ঝুঁকি ও দায়িত্বভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। যেমন—

  • দায়িত্বের ঝুঁকির মাত্রা;
  • কর্মস্থলের দুর্গমতা;
  • অপারেশনাল দায়িত্বের ধরন;
  • রাত ও জরুরি দায়িত্বের পরিমাণ;
  • দায়িত্বকালীন দুর্ঘটনা ও হতাহতের তথ্য;
  • পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ছুটির সুযোগ;
  • পরিবারের ওপর দায়িত্বের প্রভাব;
  • দায়িত্ব পালনকালে মৃত্যু বা স্থায়ী অক্ষমতার ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন।

এ ধরনের সূচক থাকলে বাহিনীভেদে আবেগনির্ভর তুলনার পরিবর্তে তথ্য ও বাস্তব ঝুঁকির ভিত্তিতে নীতিনির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে।

‘দেশের জন্য জীবন দেব’—এই শপথের বাস্তব মূল্যায়ন জরুরি

বাহিনী সদস্যের চাকরির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—প্রয়োজনে নিজের জীবন ঝুঁকিতে রেখে রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করা। সেই দায়িত্বের মূল্যায়ন শুধু মাসিক বেতন দিয়ে শেষ হয় না।

একজন সদস্য যখন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারান, তখন তার পরিবার যে ক্ষতির মুখোমুখি হয়, তা কোনো আর্থিক হিসাবেই পুরোপুরি পরিমাপ করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সচল রাখতে যারা প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের কর্মপরিবেশ ও কল্যাণ নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

সুতরাং আলোচনাটি ‘কোন বাহিনী বেশি ত্যাগ করেছে’—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না রেখে, দেশের সব নিরাপত্তা ও সেবাদানকারী বাহিনীর দায়িত্ব, ঝুঁকি ও ত্যাগকে তথ্যভিত্তিকভাবে মূল্যায়নের দিকে নেওয়াই বেশি কার্যকর হতে পারে।

বাংলাদেশ পুলিশের সরকারি তথ্যও বলছে, জননিরাপত্তার দায়িত্বে পুলিশকে সার্বক্ষণিক সেবা দিতে হয় এবং প্রতিবছর দায়িত্ব পালনের সময় সদস্যদের আত্মত্যাগের ঘটনাও ঘটে।

অর্থাৎ, নিরাপদে থাকা কোটি মানুষের পেছনে যারা দিন-রাত দায়িত্ব পালন করেন, তাদের ত্যাগের আলোচনা কেবল বেতন-ভাতার প্রশ্ন নয়—এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, কর্মপরিবেশ ও পরিবারকল্যাণেরও প্রশ্ন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *