বেসরকারি ব্যাংকে একই কাজ, বেতন-পদমর্যাদায় বিস্তর ফারাক: অভিন্ন নীতিমালার দাবি
দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ব্যাংকিং খাত। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লেনদেন পরিচালনা, আমানত সংগ্রহ, ঋণ বিতরণ ও আদায়, বৈদেশিক বাণিজ্য, রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনা, গ্রাহকসেবা এবং আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন ব্যাংকাররা। কিন্তু একই ধরনের দায়িত্ব পালন করেও শুধু কর্মরত ব্যাংক ভিন্ন হওয়ার কারণে বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের পদবিন্যাস, মূল বেতন, পদোন্নতি এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধায় বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ অবস্থায় দেশের সব বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পদবিন্যাস বা ‘ডেজিগনেশন স্ট্রাকচার’ এবং মৌলিক বেতন কাঠামো একটি অভিন্ন নীতিমালার আওতায় আনার দাবি জোরালো হচ্ছে। ব্যাংকারদের একাংশের মতে, কেন্দ্রীয়ভাবে একটি ন্যূনতম মানদণ্ড নির্ধারণ করা হলে ব্যাংকভেদে অযৌক্তিক বৈষম্য কমবে এবং যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও দায়িত্বের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত হবে।
একই দায়িত্ব, কিন্তু পদবিতে ভিন্নতা
বর্তমানে দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর জনবল কাঠামো ও পদবিন্যাসে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। কোনো ব্যাংকে একজন কর্মকর্তা যে দায়িত্ব পালন করে ‘অফিসার’, ‘সিনিয়র অফিসার’ বা ‘প্রিন্সিপাল অফিসার’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, অন্য একটি ব্যাংকে প্রায় একই ধরনের দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা ভিন্ন পদবি ও ভিন্ন বেতন কাঠামোর আওতায় রয়েছেন।
এমনকি শিক্ষাগত যোগ্যতা, চাকরির অভিজ্ঞতা এবং দায়িত্বের ধরন কাছাকাছি হওয়ার পরও ব্যাংক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অনেক কর্মকর্তাকে পদমর্যাদা ও বেতন নির্ধারণে জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়।
ব্যাংকারদের অভিযোগ, অভিন্ন পদবিন্যাস না থাকায় একটি ব্যাংকের কর্মকর্তার পদমর্যাদা অন্য ব্যাংকের সমপর্যায়ের কর্মকর্তার সঙ্গে তুলনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে চাকরি পরিবর্তন, পদোন্নতি এবং অভিজ্ঞতার মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে।
বেতন কাঠামোয় বড় পার্থক্য
বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বেতন নির্ধারণে ব্যাংকভেদে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। একই ধরনের দায়িত্ব পালন করেও কোনো ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা তুলনামূলক বেশি মূল বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন, আবার অন্য ব্যাংকের কর্মকর্তা কম বেতনে একই ধরনের দায়িত্ব পালন করছেন।
বিশেষ করে এন্ট্রি লেভেল থেকে মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে বেতন বৈষম্য বেশি দৃশ্যমান বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।
ব্যাংকারদের মতে, ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, মুনাফা, ব্যবসার পরিধি এবং কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে প্রফিট শেয়ারিং, ইনসেন্টিভ, পারফরম্যান্স বোনাস এবং অন্যান্য অতিরিক্ত সুবিধায় পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। তবে একই ধরনের পদ, দায়িত্ব, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে মৌলিক বেতন ও পদমর্যাদায় অত্যধিক বৈষম্য থাকা উচিত নয়।
বাড়ছে কাজের চাপ ও দায়িত্ব
বর্তমান ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কর্মকর্তাদের দায়িত্ব আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। আমানত সংগ্রহ এবং ঋণ বিতরণের পাশাপাশি ঋণ আদায়, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ, গ্রাহকের তথ্য যাচাই, ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা, সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলা এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা বাস্তবায়নের দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে ব্যাংকারদের।
অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত অফিস সময়ের বাইরেও কাজ করতে হচ্ছে কর্মকর্তাদের। বিশেষ করে মাস ও বছর শেষে হিসাব চূড়ান্ত করা, ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ঋণ আদায়ের চাপ সামলাতে দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে থাকতে হয়।
এত দায়িত্ব ও কাজের চাপ থাকার পরও ব্যাংকভেদে বেতন ও পদমর্যাদার বড় পার্থক্য ব্যাংকারদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিন্ন নীতিমালায় কী থাকতে পারে
ব্যাংকারদের প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশের সব বেসরকারি ব্যাংকের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে একটি অভিন্ন পদবিন্যাস কাঠামো নির্ধারণ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিটি পদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, দায়িত্বের পরিধি এবং ন্যূনতম মৌলিক বেতন নির্ধারণ করা যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা ও ব্যবসায়িক অবস্থান বিবেচনায় রেখে নির্ধারিত ন্যূনতম বেতনের চেয়ে বেশি বেতন দেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। তবে কোনো ব্যাংক যেন নির্ধারিত মানদণ্ডের নিচে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ করতে না পারে, সে বিষয়ে নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলার দাবি রয়েছে।
একই সঙ্গে ব্যাংক পরিবর্তনের সময় একজন কর্মকর্তার চাকরির অভিজ্ঞতা, পদমর্যাদা এবং পেশাগত দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়নের জন্য একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছেন ব্যাংকাররা।
পারফরম্যান্স বোনাসে থাকতে পারে ভিন্নতা
অভিন্ন বেতন কাঠামোর দাবির অর্থ সব ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মোট আয় সমান করা নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একটি ব্যাংকের মুনাফা, আর্থিক সক্ষমতা, খেলাপি ঋণের হার, ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে প্রফিট শেয়ারিং, ইনসেন্টিভ, উৎসব বোনাসের অতিরিক্ত সুবিধা কিংবা পারফরম্যান্স বোনাসে পার্থক্য থাকতে পারে।
তবে ব্যাংকারদের দাবি, মৌলিক বেতন, পদবিন্যাস এবং পদোন্নতির ন্যূনতম মানদণ্ডে যেন বড় ধরনের বৈষম্য না থাকে।
কর্মীদের ধরে রাখতেও প্রয়োজন সংস্কার
ব্যাংকিং খাতে দক্ষ জনবল ধরে রাখা বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বেতন বৈষম্য, অতিরিক্ত কাজের চাপ, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং পদোন্নতির সুযোগ সীমিত হওয়ার কারণে অনেক কর্মকর্তা চাকরি পরিবর্তনের চেষ্টা করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকারদের জন্য একটি যৌক্তিক ও প্রতিযোগিতামূলক বেতন কাঠামো তৈরি করা গেলে দক্ষ জনবল ধরে রাখা সহজ হবে। একই সঙ্গে কর্মীদের পেশাগত সন্তুষ্টি বাড়বে এবং ব্যাংকিং খাতের সেবার মান উন্নত হতে পারে।
অভিন্ন পদবিন্যাস থাকলে ব্যাংকিং খাতের জনবল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং কর্মকর্তাদের ক্যারিয়ার পরিকল্পনাও সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্যোগ চান ব্যাংকাররা
ব্যাংকারদের একাংশ মনে করেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদবিন্যাস ও বেতন কাঠামোর বৈষম্য কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং ব্যাংকারদের প্রতিনিধিদের নিয়ে আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন।
আলোচনার মাধ্যমে প্রতিটি পদের দায়িত্ব, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও ন্যূনতম বেতন নির্ধারণ করে একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি করা সম্ভব।
তবে ব্যাংকের আকার, ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও আর্থিক অবস্থার পার্থক্যের কারণে সব প্রতিষ্ঠানে সম্পূর্ণ অভিন্ন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। এ কারণে অভিন্ন বেতনের পরিবর্তে ‘ন্যূনতম মানসম্মত বেতন কাঠামো’ এবং ‘সমন্বিত পদবিন্যাস নীতিমালা’ প্রণয়ন অধিক বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ন্যায্য মূল্যায়ন ও পেশাগত মর্যাদার দাবি
ব্যাংকাররা দেশের অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ সচল রাখা, শিল্প ও ব্যবসায় অর্থায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনা এবং সরকারের বিভিন্ন আর্থিক কার্যক্রম বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
এ কারণে ব্যাংকিং খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন, যৌক্তিক পদমর্যাদা, স্বচ্ছ পদোন্নতি ব্যবস্থা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যাংকারদের ভাষ্য, একজন কর্মকর্তা কোন ব্যাংকে কর্মরত—শুধু সেই পরিচয়ের ভিত্তিতে তাঁর যোগ্যতা ও শ্রমের মূল্যায়নে বড় ধরনের পার্থক্য থাকা উচিত নয়। দায়িত্ব, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে ন্যায্য মূল্যায়ন নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত একটি আধুনিক ও টেকসই ব্যাংকিং ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি।
তাদের দাবি, দেশের সব বেসরকারি ব্যাংকের জন্য অভিন্ন পদবিন্যাস, প্রতিটি পদের বিপরীতে ন্যূনতম বেতন নির্ধারণ এবং চাকরির অভিজ্ঞতা মূল্যায়নে সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হোক।
কারণ ব্যাংকাররা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী নন; দেশের আর্থিক ব্যবস্থা সচল রাখা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এগিয়ে নেওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাদের শ্রম, দক্ষতা ও দায়িত্বের ন্যায্য মূল্যায়ন নিশ্চিত হলে উপকৃত হবে পুরো ব্যাংকিং খাত এবং দেশের অর্থনীতি।


