জাতীয় পরিচয়পত্র

এনআইডি সংশোধনের নামে প্রতারণার ফাঁদ, দালাল এড়িয়ে সরকারি প্রক্রিয়ায় আবেদন করার আহ্বান

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধন করে দেওয়ার কথা বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিভিন্ন প্রতারক ও দালালচক্র। দ্রুত সংশোধন, নিশ্চিত অনুমোদন কিংবা নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ ছাড়াই এনআইডির তথ্য পরিবর্তন করে দেওয়ার মতো নানা প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ নাগরিকদের ইনবক্সে যোগাযোগের আহ্বান জানাচ্ছে তারা। এসব ব্যক্তি বা চক্রের ফাঁদে পড়ে অর্থ ও ব্যক্তিগত তথ্য হারানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ, এনআইডি সংশোধনের প্রয়োজন হলে কোনো দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর শরণাপন্ন না হয়ে নির্ধারিত সরকারি পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত। অনলাইনে আবেদন করার সুযোগ থাকলে নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র সেবা পোর্টালে নিজস্ব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে। সংশোধনের পক্ষে প্রয়োজনীয় ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণপত্র জমা দিয়ে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাই নিরাপদ পদ্ধতি।

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র সেবা পোর্টালে নাগরিকদের জন্য অ্যাকাউন্ট নিবন্ধন ও এনআইডিসংক্রান্ত সেবা গ্রহণের ব্যবস্থা রয়েছে। সরকারি পোর্টালে এনআইডি হেল্পলাইন নম্বর ১০৫ এবং +৮৮ ০১৭০৮-৫০১২৬১ উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে কোনো বিষয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপরিচিত ব্যক্তির ওপর নির্ভর না করে সরকারি সেবা কেন্দ্র, সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিস বা নির্ধারিত হেল্পলাইনে যোগাযোগ করা যেতে পারে।

২০২৫ সালের শেষ দিকে ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করার কাজের কারণে নাম, পিতা-মাতার নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা ও ছবিসহ কয়েকটি বিষয়ে এনআইডি সংশোধনের আবেদন বিবেচনা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছিল। তবে ২০২৬ সালের ২৫ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন সংশোধন কার্যক্রম পুনরায় চালু করে। জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এ এস এম হুমায়ুন কবীর সে সময় জানিয়েছিলেন, সংশোধন কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশনা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং সব ক্যাটাগরির এনআইডি সংশোধনের আবেদন করা যাবে।

এনআইডির তথ্য সংশোধনের জন্য আবেদন করলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত হয় না। আবেদনকারীকে সংশোধনের দাবির পক্ষে প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র জমা দিতে হয়। সংশোধনের ধরন অনুযায়ী জন্মনিবন্ধন সনদ, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, পাসপোর্ট, বিবাহ বা তালাকসংক্রান্ত দলিল এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র প্রয়োজন হতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আবেদন ও দাখিল করা নথিপত্র যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

অনলাইনে কোনো নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণ সম্ভব না হলে অথবা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরাসরি আবেদন করার প্রয়োজন হলে নির্ধারিত ফরম পূরণ করে সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিস, জেলা নির্বাচন অফিস কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা যেতে পারে। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে জাতীয় পরিচয়পত্র ও তথ্য-উপাত্ত সংশোধনসহ বিভিন্ন সেবার নির্ধারিত আবেদন ফরম ডাউনলোডের ব্যবস্থা রয়েছে।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এনআইডি সংশোধনকেন্দ্রিক বিভিন্ন পোস্টে প্রতারকেরা দ্রুত কাজ করে দেওয়ার দাবি করে নাগরিকদের ইনবক্স, হোয়াটসঅ্যাপ বা ব্যক্তিগত যোগাযোগমাধ্যমে ডেকে নিতে পারে। এরপর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অগ্রিম টাকা দাবি, এনআইডির ছবি, জন্মনিবন্ধন সনদ, পাসপোর্ট, মোবাইল নম্বর কিংবা অ্যাকাউন্টের গোপন তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হতে পারে।

এ ধরনের প্রলোভনে সাড়া দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এনআইডি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত পরিচয়পত্র। এর কপি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগত তথ্য অপরিচিত ব্যক্তির হাতে গেলে পরিচয় জালিয়াতিসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতারণায় অপব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, নিজের এনআইডি সেবা অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড, ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) বা যাচাইকরণ কোড কোনো অবস্থাতেই অন্য ব্যক্তিকে দেওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে এনআইডি সংশোধনের নামে কাউকে ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরে টাকা পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট সেবাটি সরকারি কি না তা যাচাই করা জরুরি।

কোনো আবেদন দীর্ঘদিন অপেক্ষমাণ থাকলে কিংবা সংশোধন প্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা দিলে দালালের কাছে যাওয়ার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করে আবেদনের অবস্থা ও করণীয় সম্পর্কে তথ্য নেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে ঘাটতি থাকলে কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী সঠিক নথি জমা দেওয়াই সমস্যার বৈধ সমাধান।

সাধারণ নাগরিকদের প্রতি আহ্বান—“টাকা দিলেই এনআইডি সংশোধন”, “শতভাগ কাজের নিশ্চয়তা”, “অফিসে যোগাযোগ আছে” কিংবা “কয়েক দিনের মধ্যে সংশোধন করে দেওয়া হবে”—এ ধরনের দাবিতে বিশ্বাস করবেন না। সরকারি নিয়মে আবেদন করুন, সঠিক ও সত্য তথ্যের পক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিন এবং আবেদন প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সময় অপেক্ষা করুন।

মনে রাখতে হবে, জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের বৈধ পথ হলো নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা। অনলাইনে সম্ভব হলে সরকারি পোর্টালে আবেদন করুন। অনলাইনে সম্ভব না হলে নির্ধারিত ফরমে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসে আবেদন করুন। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই এনআইডি সংশোধনের নামে সক্রিয় দালাল ও প্রতারকচক্রের কাছে ব্যক্তিগত তথ্য, অর্থ কিংবা অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেবেন না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *