মোবাইল ব্যাংকিং

ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলতে গিয়ে কর্মকর্তা ‘ইন্টারভিউ’ নিলেন গ্রাহক, হাসির রোল কাউন্টারে!

সকাল ১০টা ১২ মিনিট। ব্যাংকের চেনা ব্যস্ততা। কেউ টোকেন হাতে বিরস মুখে সিরিয়ালের অপেক্ষা করছেন, কেউবা নিজের শূন্য ব্যালেন্সের সাথে মনের ব্যালেন্স মেলাতে ব্যস্ত। ঠিক তখনই ব্যাংকের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন এক ভদ্রলোক। হাঁটার রাজকীয় ভঙ্গি দেখে মনে হতে পারে তিনি হিসাব খুলতে নন, বরং আস্ত ব্যাংকটাই অধিগ্রহণ করতে এসেছেন।

সোজা কাউন্টারের সামনে গিয়ে তার প্রথম সংলাপ— “ভাই, একটা হিসাব খুলবো।”

‘বাস্তববাদী’ গ্রাহকের এন্ট্রি

কর্মকর্তা তার চেনা অফিশিয়াল হাসির (যার ২০% সৌজন্য, ৩০% বাধ্যবাধকতা আর ৫০% অজানা আশঙ্কা) মাধ্যমে জানতে চাইলেন এনআইডি, ছবি আর নমিনির কাগজপত্র সব ঠিক আছে কি না। গ্রাহকের গর্বভরে দেওয়া উত্তর, “সব আছে… শুধু টাকা ছাড়া!” কর্মকর্তা মনে মনে সান্ত্বনা নিলেন— শুরুতেই অন্তত একজন বাস্তববাদী মানুষের মুখোমুখি হওয়া গেছে।

নাম ও সিগনেচারের ‘জাতিসংঘ চুক্তি’

ফরম পূরণের শুরুতেই বাঁধে বিপত্তি। নাম লেখার জায়গায় এসে গ্রাহকের প্রশ্ন— বাংলায় লিখবেন, ইংরেজিতে নাকি ডাকনাম দিলেও চলবে? কর্মকর্তা অফিশিয়াল নামের কথা বলতেই গ্রাহক বেশ রহস্যময় টোনে জানতে চান, “তাহলে বউ যেই নামে ডাকে… ‘শুনছো’… ওইটা না?”

এখানেই শেষ নয়, সিগনেচার বা স্বাক্ষর পর্বে গিয়ে তিনি গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে যান। হিরোদের মতো স্টাইলিশ সাইন দেওয়ার পরামর্শ চাইলে কর্মকর্তা মনে করিয়ে দেন, এটা সিনেমার পোস্টার নয়, কাল যেন নিজের সাইন নিজেই চিনতে পারেন। এরপর তিন নম্বর চেষ্টার পর একটি স্বাক্ষর চূড়ান্ত করে গ্রাহক বলেন, “এইটা ঠিক আছে। আমি না চিনলেও ব্যাংক চিনবে।” ততক্ষণে পাশের চেয়ারে বসা অন্য গ্রাহকদের কাশি দিয়ে হাসি ঠেকানোর কসরত শুরু হয়ে গেছে।

সম্পর্কের ‘কোয়ালিটি’ ও নমিনি বিতর্ক

পুরো ঘটনার মূল আকর্ষণ বা ‘মেইন ইভেন্ট’ ছিল নমিনির ঘর পূরণ। নমিনির সাথে সম্পর্ক জানতে চাওয়া হলে গ্রাহক বুক ফুলিয়ে উত্তর দেন, “অনেক ভালো!”

মুহূর্তের জন্য থমকে যায় কর্মকর্তার কীবোর্ডের আঙুল। সম্পর্কের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে গ্রাহক জানান, “ভালো সম্পর্ক ভাই! ঝগড়া কম হয়। রাগ করলেও আবার কথা বলে।” পরে কর্মকর্তা যখন স্পষ্ট করেন যে সম্পর্ক বলতে মা, বাবা নাকি স্ত্রী তা জানতে চাওয়া হয়েছে, তখন গ্রাহক কপালে চাপড় দিয়ে বলেন— “ওহহ! আমি ভাবলাম সম্পর্কের কোয়ালিটি জানতে চাইছেন! তাহলে লিখেন—স্ত্রী। তবে পরিস্থিতি বুঝে কখনো কখনো বিরোধী দল!” এই মন্তব্যে ব্যাংকের ভেতরে হাসির রোল পড়ে যায়।

মোবাইল নম্বর ও ভাগ্যের হিসাব

মোবাইল নম্বর দেওয়ার পর যখন জিজ্ঞেস করা হলো এই নম্বর সবসময় থাকবে কি না, গ্রাহকের দার্শনিক জবাব— “মানুষ বদলায়, বাজার বদলায়, সরকার বদলায়… সিম বদলাবে না? অফার ভালো পাইলে সিম বদলাইতে পারি।”

একেবারে শেষ পর্বে প্রথম জমার (Initial Deposit) কথা জানতে চাওয়া হলে তিনি গোপন মিটিংয়ের সুরে বলেন, আগে অ্যাকাউন্ট খুলুক, তারপর যেন দোয়া করা হয় টাকা আসার জন্য। কর্মকর্তা তখন বিনয়ের সাথে জানান, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলে, ভাগ্য খোলার সার্ভিস এখনো তাদের চালু হয়নি।

চূড়ান্ত বিজয়

সব বাধা পেরিয়ে অবশেষে যখন অ্যাকাউন্ট খোলার কাজ সম্পন্ন হলো, গ্রাহকের চেহারায় তখন বিসিএস ভাইভা পাস করার মতো বিজয়ের হাসি। ব্যাংক থেকে বের হওয়ার আগে তিনি তার চূড়ান্ত মন্তব্য ছুঁড়ে দেন:

“আজ বুঝলাম, ব্যাংকে হিসাব খোলা মানে টাকা জমা না… আগে ধৈর্য, স্মৃতিশক্তি, পারিবারিক ইতিহাস, সম্পর্কের স্ট্যাটাস আর আত্মবিশ্বাস জমা দিতে হয়!”

গ্রাহক চলে যাওয়ার পর ক্লান্ত ব্যাংক কর্মকর্তা মনিটরের দিকে তাকিয়ে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলেন— “স্যার এসেছিলেন অ্যাকাউন্ট খুলতে, কিন্তু ইন্টারভিউটা দিয়ে গেলাম আমি নিজেই!”

ব্যাংকপাড়ার এই ব্যতিক্রমী ও রসাত্মক ঘটনাটি উপস্থিত সবার মনেই বেশ খোরাক জুগিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *