বিডিএস জরিপে জমি হারাতে পারেন খাজনা ও দলিলহীন মালিকেরা: ভূমি মন্ত্রণালয়ের সতর্কতা
সারাদেশে জমিজমার হিসাব-নিকাশ ও মালিকানা পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে সরকারের বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভে (বিডিএস)। তবে এই আধুনিক ডিজিটাল জরিপের সুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি অসচেতনতার কারণে বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারেন ভূমির মালিকেরা। ভূমি মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যেসব এলাকায় বর্তমানে বিডিএস কার্যক্রম চলমান রয়েছে কিংবা ভবিষ্যতে শুরু হবে, সেসব এলাকার ভূমি মালিকদের নিজেদের স্বত্ব রক্ষায় এখনই কিছু জরুরি প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও হালনাগাদ তথ্য না থাকলে সাধের জমি সরকারি খাস জমিতে পরিণত হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক নির্দেশনার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ডিজিটাল জরিপ চলাকালীন নিজের ভূমির বৈধতা প্রমাণে মূলত ৯টি বিষয়ে জোর দিতে হবে।
ভূমির মালিকানা রক্ষায় করণীয়: ৯ দফা নির্দেশনা
দলিল ও খতিয়ান সংগ্রহ: জমির মূল মালিকানা দাবি করার প্রধান হাতিয়ার হলো এর বৈধ দলিল এবং রেকর্ডীয় খতিয়ান। এগুলো এখনই নিজের সংগ্রহে নিশ্চিত করতে হবে।
অনতিবিলম্বে নামজারি (মিউটেশন): জমি কেনা বা উত্তরাধিকার সূত্রে পেলেও যদি নামজারি করা না থাকে, তবে অতি দ্রুত নামজারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
হালনাগাদ খাজনা (ভূমি উন্নয়ন কর): জমির খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন কর নিয়মিত পরিশোধ থাকা বাধ্যতামূলক। কর বকেয়া থাকলে তা দ্রুত পরিশোধ করে দাখিলা বা রসিদ সংগ্রহে রাখতে হবে।
পরিমাপ ও নকশা পরীক্ষা: সরকারের পর্চা ও নকশা (ম্যাপ) অনুযায়ী নিজের জমিটি সঠিকভাবে মেপে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
সীমানা বা আইল নির্ধারণ: জমির চারপাশের সীমানা বা আইল সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে রাখতে হবে, যেন জরিপের সময় কোনো ধরনের সীমানা বিরোধ তৈরি না হয়।
জমির দখল নিশ্চিতকরণ: কাগজে-কলমে মালিকানার পাশাপাশি ভূমিতে নিজের বাস্তব দখল বা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
উত্তরাধিকার ও যৌথ সম্পত্তির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নথি: সম্পত্তি যদি যৌথ (ইজমালি) কিংবা পৈত্রিক হয়, তবে স্থানীয় সরকারের দেওয়া ‘ওয়ারিশ সনদ’ বা উত্তরাধিকার সনদ সংগ্রহে রাখতে হবে। প্রয়োজনে অংশীদারদের মধ্যে আপস-বণ্টননামা দলিল সম্পন্ন করে রাখতে হবে। এছাড়া ক্ষেত্রবিশেষে এওয়াজ বদল (ভূমি বিনিময়) করা প্রয়োজন হলে তা সম্পন্ন করে নামজারি করে নিতে হবে।
অবহেলায় জমি হতে পারে ‘খাস’
ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সবচেয়ে বড় যে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে তা হলো বকেয়া খাজনা ও কাগজপত্রের ঘাটতি নিয়ে। মন্ত্রণালয় সাফ জানিয়ে দিয়েছে:
“আসন্ন জরিপে উক্ত জমির খাজনা দেওয়া না থাকলে জমি খাস হয়ে যাবে।”
অর্থাৎ, কোনো ভূমি মালিক যদি নিয়মিত খাজনা পরিশোধ না করেন, তবে ডিজিটাল সার্ভের সময় সরকারের স্বত্ব হিসেবে সেটি খাস খতিয়ানে চলে যেতে পারে।
আরও কঠোর বার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, যাদের জমির কোনো বৈধ দলিল, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কিংবা খাজনা পরিশোধের দাখিলা নেই, তারা যেন জমি ছেড়ে দেওয়ার জন্য মন-মানসিকতা প্রস্তুত রাখেন। মূলত অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ এবং প্রকৃত মালিকানা নিশ্চিত করতেই ডিজিটাল সার্ভেতে এই কঠোর অবস্থান নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্নেষকদের অভিমত
ভূমি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিডিএস বা বাংলাদেশ डिजिटल সার্ভে সম্পন্ন হলে ভূমির খতিয়ান ও ম্যাপ নিখুঁত হবে এবং জালিয়াতি অনেকাংশে কমে আসবে। তবে মাঠপর্যায়ে জরিপ দল আসার আগেই সাধারণ মানুষকে তাদের জমির ফাইল গোছাতে হবে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে অনেকেরই খাজনা বহু বছর ধরে বকেয়া থাকে কিংবা বণ্টননামা দলিল থাকে না। ঝামেলার সম্মুখীন হওয়ার আগেই দ্রুত স্থানীয় ভূমি অফিসে যোগাযোগ করে খাজনা হালনাগাদ এবং নামজারি সম্পন্ন করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।



