এইমাত্র পাওয়া

মেট্রোরেলে ভিড়ের রহস্য : কেন সিঁড়ির পাশের বগিতেই জমে মানুষের ঢল?

প্রতিদিন লাখো যাত্রী রাজধানীর মেট্রোরেলে যাতায়াত করছেন। তবে অনেক যাত্রীরই একটি সাধারণ অভিজ্ঞতা রয়েছে—দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও ভিড়ের কারণে ট্রেনে উঠতে না পারা। অথচ ট্রেনটি একটু এগিয়ে গেলে দেখা যায়, পেছনের বা সামনের কয়েকটি বগি তুলনামূলকভাবে অনেকটাই ফাঁকা। প্রশ্ন হলো, কেন নির্দিষ্ট কিছু বগিতে এত বেশি ভিড় জমে, আর অন্য বগিগুলো অপেক্ষাকৃত ফাঁকা থাকে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে শুধু মানুষের অভ্যাস নয়, বরং মনোবিজ্ঞান, পরিসংখ্যান, আচরণগত বিজ্ঞান এবং নগর পরিকল্পনার একাধিক তত্ত্ব একযোগে কাজ করে।

সিঁড়ির পাশেই কেন বেশি ভিড়?

মেট্রোরেল স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ যাত্রী সিঁড়ি বা এসকেলেটরের ঠিক সামনের অংশে জড়ো হন। সিঁড়ি থেকে যত দূরে যাওয়া যায়, ভিড়ের ঘনত্ব তত কমে আসে। ফলে সিঁড়ির সংলগ্ন বগিগুলোতে যাত্রীদের চাপ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই আচরণের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে।

মানুষের মনের অদৃশ্য প্রভাব

প্রথমত, রয়েছে ‘কগনিটিভ লেজিনেস’ বা মানসিক অলসতা। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার পর অধিকাংশ মানুষ অতিরিক্ত হাঁটতে আগ্রহী হন না। ফলে সামনে যে সারি দেখতে পান, সেখানেই দাঁড়িয়ে যান।

দ্বিতীয়ত, ‘সোশ্যাল হার্ডিং’ বা দলগত অনুসরণ প্রবণতা। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই অন্যদের আচরণকে নিরাপদ সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরে নেয়। তাই কয়েকজনকে কোনো স্থানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে আরও অনেকে সেখানে গিয়ে ভিড় করেন।

তৃতীয়ত, ‘ফার্স্ট মুভার অ্যানজাইটি’ বা দ্রুত ওঠার তাড়না। অনেক যাত্রী মনে করেন, সামনে দ্রুত জায়গা না নিলে ট্রেনে ওঠা কঠিন হবে। ফলে তারা সিঁড়ির কাছেই অবস্থান নেন।

পরিসংখ্যানও বলছে একই কথা

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভিড়ের ধরণ পরিসংখ্যানের ‘সেন্ট্রাল টেনডেন্সি’ বা কেন্দ্রীয় প্রবণতার একটি বাস্তব উদাহরণ। যেকোনো গোষ্ঠী বা ব্যবস্থায় মানুষ বা উপাদান সাধারণত একটি কেন্দ্রবিন্দুর আশপাশে বেশি ঘনীভূত হয়।

মেট্রোরেল প্ল্যাটফর্মে সিঁড়িই সেই কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে। ফলে যাত্রীদের ঘনত্ব সিঁড়ির আশপাশে বেশি এবং দূরে কম দেখা যায়।

বেল কার্ভের বাস্তব রূপ

পরিসংখ্যানের বহুল পরিচিত ‘নরমাল ডিস্ট্রিবিউশন’ বা বেল কার্ভের সঙ্গেও এই পরিস্থিতির মিল পাওয়া যায়। একটি প্ল্যাটফর্মে যদি দুটি সিঁড়ি থাকে, তাহলে দুটি আলাদা ভিড়ের কেন্দ্র তৈরি হয়। প্রতিটি কেন্দ্রের আশপাশে সর্বোচ্চ যাত্রী জমায়েত হয় এবং দুই পাশে ধীরে ধীরে কমে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্ল্যাটফর্মে মানুষের অবস্থান বণ্টন করলে সেটি অনেক ক্ষেত্রে ঘণ্টার আকৃতির বেল কার্ভের মতোই দেখা যেতে পারে।

কম কষ্টের পথই মানুষের পছন্দ

আচরণগত বিজ্ঞানের ‘প্রিন্সিপল অব লিস্ট এফোর্ট’ অনুযায়ী, মানুষ সবসময় কম পরিশ্রমের পথ বেছে নিতে চায়।

মেট্রোরেল স্টেশনের ক্ষেত্রে সিঁড়ি থেকে আরও ৫০-৬০ মিটার হেঁটে অপেক্ষাকৃত ফাঁকা বগির সামনে যাওয়া অধিকাংশ যাত্রীর কাছে অতিরিক্ত পরিশ্রম বলে মনে হয়। ফলে তারা কাছাকাছি অবস্থানেই অপেক্ষা করেন।

এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ‘ডিস্ট্যান্স ডিকে ইফেক্ট’। অর্থাৎ কোনো স্থানের দূরত্ব যত বাড়ে, সেটি ব্যবহারের প্রবণতা তত কমে যায়।

পরিচিত জায়গার প্রতি মানুষের আকর্ষণ

‘স্ট্যাটাস কো বায়াস’ নামের একটি আচরণগত তত্ত্ব বলছে, মানুষ পরিচিত পরিস্থিতিকেই নিরাপদ মনে করে। ফলে প্রতিদিন একই স্টেশন ব্যবহারকারীরা প্রায়ই একই জায়গায় দাঁড়াতে বা একই বগিতে উঠতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন।

ফলে নতুন কোনো বিকল্প সুবিধাজনক হলেও অনেকেই সেটি ব্যবহার করতে আগ্রহী হন না।

কেন ভিড়ের ধরণ বদলায় না?

বিশ্লেষকদের মতে, ‘রিগ্রেশন টু দ্য মিন’ নীতির কারণেও দীর্ঘমেয়াদে ভিড়ের প্যাটার্ন প্রায় একই থাকে। কোনো একদিন যাত্রীরা অপেক্ষাকৃত ফাঁকা বগিতে বেশি ছড়িয়ে পড়লেও কয়েকদিনের মধ্যে আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসেন।

অর্থাৎ সাময়িক পরিবর্তন হলেও দীর্ঘমেয়াদে মানুষ তাদের গড় আচরণের কাছাকাছি অবস্থানে ফিরে আসে।

হাজারো সিদ্ধান্তে তৈরি হয় বড় প্যাটার্ন

পদার্থবিজ্ঞান ও কমপ্লেক্সিটি সায়েন্সের ‘ইমার্জেন্স’ ধারণা অনুযায়ী, হাজারো ব্যক্তি নিজেদের সুবিধামতো ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নিলেও সম্মিলিতভাবে একটি বড় এবং পূর্বানুমানযোগ্য প্যাটার্ন তৈরি হয়।

মেট্রোরেলের ভিড়ও তেমনই একটি উদাহরণ। কোনো যাত্রী সচেতনভাবে ভিড়ের বণ্টন তৈরি করেন না, কিন্তু সবার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত মিলেই একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক কাঠামো তৈরি হয়।

সচেতনতা বাড়লে কমতে পারে ভিড়ের চাপ

বিশেষজ্ঞদের মতে, যাত্রীরা যদি সিঁড়ির কাছাকাছি অংশে না দাঁড়িয়ে প্ল্যাটফর্মের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়েন, তাহলে ভিড়ের চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব। এতে ট্রেনে ওঠানামাও সহজ হবে এবং যাত্রীসেবার মান বাড়বে।

তবে দীর্ঘদিনের অভ্যাস ও মানব আচরণের স্বাভাবিক প্রবণতার কারণে এই পরিবর্তন বাস্তবায়ন সহজ হবে না বলেও মনে করছেন তারা।

মেট্রোরেলের প্রতিদিনের এই ভিড় তাই শুধু একটি পরিবহন সমস্যা নয়; বরং মানুষের মনস্তত্ত্ব, পরিসংখ্যান এবং সামাজিক আচরণের একটি জীবন্ত উদাহরণ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *