এইমাত্র পাওয়া

বাজেট ২০২৬-২৭: স্বস্তির খবর নিত্যপণ্যে, দাম কমছে ও বাড়ছে যেসব পণ্যের

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বিশাল বাজেট উত্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বর্তমান সরকারের চলতি মেয়াদের প্রথম এই বাজেটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে বড় ধরনের কর ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে চাল, ডাল, তেলসহ ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য, চিকিৎসা সামগ্রী এবং প্রযুক্তি পণ্যের ওপর শুল্ক ও উৎসে কর উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে ভোক্তা পর্যায়ে এসব পণ্যের দাম কমতে পারে।

তবে দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা এবং রাজস্ব বাড়াতে কিছু আমদানিকৃত বিলাসী পণ্য, তামাকজাত দ্রব্য ও নির্মাণ সামগ্রীর ওপর শুল্ক বাড়ানো হয়েছে, যার ফলে বাড়তে পারে বেশ কিছু পণ্যের দাম।

বাজেট বিশ্লেষণ করে কোন কোন পণ্যের দামে কী ধরনের প্রভাব পড়তে যাচ্ছে, তার একটি বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

যেসব পণ্যের দাম কমতে পারে

১. চাল, তেল, পেঁয়াজসহ ৬০টি নিত্যপণ্য জনজীবনে স্বস্তি ফেরাতে ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, বীজ, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি ও মাছসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় ও কৃষিপণ্যের ওপর বিদ্যমান উৎসে কর ১ থেকে ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সাথে এসব পণ্যের নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

২. শিশুখাদ্য ও মসলাজাতীয় পণ্য শিশুখাদ্য প্রস্তুতের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব এসেছে। এছাড়া সব ধরনের মসলা এবং খেজুর আমদানির ওপর থাকা ৫ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি (নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক) সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে। ফলে কমতে পারে শিশুখাদ্য ও মসলার দাম।

৩. চিকিৎসা সামগ্রী ও জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম স্বাস্থ্য খাতে একাধিক কর ছাড়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষ করে কিডনি রোগীদের জন্য ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের ফলে প্রতি ডায়ালাইসিসে খরচ প্রায় ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত কমতে পারে। এছাড়া হার্টের রিং বা স্টেন্টের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা এবং চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের দাম প্রায় ৫ হাজার টাকা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

৪. কম্পিউটার ও প্রযুক্তি পণ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিধি বাড়াতে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, প্রিন্টার ও মনিটর আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট মওকুফের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি প্রতিটি মোবাইল সিমের ওপর থাকা ৩০০ টাকা কর সম্পূর্ণ বিলুপ্ত বা প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।

৫. ইলেকট্রনিক্স ও গৃহস্থালি পণ্য ব্লেন্ডার, জুসার, মিক্সার, গ্রাইন্ডার, ইলেকট্রিক কেটলি, ইস্ত্রি (আয়রন), রাইস কুকার, মাল্টি কুকার, ওয়াটার পিউরিফায়ার ও গিজারসহ বিভিন্ন দেশীয় ইলেকট্রনিক্স পণ্যের উৎপাদন ও কাঁচামাল আমদানিতে কর রেয়াত দেওয়ায় এগুলোর দাম কমতে পারে।

৬. স্বর্ণালঙ্কার ও বিনোদন সামগ্রী স্বর্ণালঙ্কার বিক্রির ওপর বিদ্যমান ৫ শতাংশ উৎসে কর কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এছাড়া তরুণ প্রজন্মের বাদ্যযন্ত্র যেমন— গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিন এবং সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরার ওপর শুল্ক কমানোর প্রস্তাব এসেছে।

যেসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে

১. সিগারেট ও তামাকজাত পণ্য রাজস্ব বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে সিগারেটের সর্বনিম্ন খুচরা মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী নিম্ন স্তরের ১০ শলাকা সিগারেটের দাম ৬২ টাকা, মধ্যম স্তর ৯২ টাকা, উচ্চ স্তর ১৬০ টাকা এবং অতি উচ্চ স্তরের দাম ১৮৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২১০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া নিকোটিন গ্র্যানুলস ও পাউচের ওপর ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

২. এমএস রড ও নির্মাণ সামগ্রী রড তৈরির বিভিন্ন উপকরণের ওপর ভ্যাট বাড়ানোর প্রস্তাব আসায় আবাসন খাতের প্রধান উপাদান এমএস রডের দাম বাড়তে পারে।

৩. আমদানি করা বিদেশি খাদ্যপণ্য ও ফল বিদেশি কাজুবাদাম (অপ্রক্রিয়াজাত ও প্রক্রিয়াজাত) আমদানিতে শুল্ক ১ থেকে ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সরাসরি ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া বিদেশি পাঙাশ মাছের ফিলের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক এবং বিদেশি সুপারি ও প্রাকৃতিক মধুর শুল্কায়ন মূল্য বাড়ানো হয়েছে। কফি, সুগার কনফেকশনারি ও তৈরি খাবার আমদানিতেও খরচ বাড়বে।

৪. জ্বালানি চালিত গাড়ি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ সিসির ইন্টারনাল কম্বাশন ইঞ্জিনচালিত (তেলচালিত) গাড়ি আমদানির ওপর করভার ১৩২.৩৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে প্রায় ১৫৬ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করায় সাধারণ গাড়ির দাম বাড়বে। তবে পরিবেশবান্ধব হাইব্রিড বা ইলেকট্রিক গাড়িতে করছাড় বজায় থাকতে পারে।

৫. বিদেশি প্রসাধনী ও এলপিজি সিলন্ডার লিপ লাইনার, লিপ জেলসহ সমজাতীয় বিদেশি প্রসাধনী পণ্যের শুল্কায়ন মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি আমদানি করা কম্পোজিট এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর ভ্যাট আরোপের কারণে এর দামও বাড়তে পারে।

অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষণ: > অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্য অনুযায়ী, বিগত বছরগুলোর লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এনে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফেরানোই এবারের কর কাঠামোর মূল লক্ষ্য। তবে করের হার না বাড়িয়ে করের আওতা বাড়ানোর যে নীতি সরকার গ্রহণ করেছে, তা কতটুকু বাস্তবায়ন হয়— বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *