জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত এমপি গাজী নজরুলের সংসদ সদস্যপদ নিয়ে আইনি বিতর্ক ও বিশ্লেষণ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে জামায়াতে ইসলামী। এই বহিষ্কারের পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে—তাঁর সংসদ সদস্যপদ থাকবে কি না। ১৯৭৫ বছর বয়সী গাজী নজরুল ইসলাম ১৯৯১ সালে প্রথম এবং পরবর্তীতে তৃতীয়বারের মতো এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দলীয় সিদ্ধান্ত ও নির্বাচনী এলাকার ক্ষোভ-বিক্ষোভের মুখে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ জরুরি সভা ডেকে তাঁকে বহিষ্কারের এই সিদ্ধান্ত নেয় এবং বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) জানানোর কথা জানিয়েছে।
সংবিধান ও আইনের বিধান কী বলছে?
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা-অযোগ্যতা এবং সংসদ সদস্যপদ হারানোর বিষয়টি মূলত নির্ধারিত হয় সংবিধানের ৬৬ ও ৭০ অনুচ্ছেদ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী।
নৈতিক স্খলন ও ফৌজদারি অপরাধ: সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্তত দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে এবং মুক্তিলাভের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হলে তিনি সংসদ সদস্য থাকার অযোগ্য হবেন। কিন্তু গাজী নজরুলের ক্ষেত্রে এখনো আদালতের এমন কোনো দণ্ডাদেশ বা রায় হয়নি। জামায়াত ‘নৈতিক স্খলনের’ কথা বলে বহিষ্কার করলেও আইনিভাবে এটি সরাসরি সদস্যপদ হারানোর কারণ হিসেবে গণ্য হতে আইনি প্রক্রিয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
দলত্যাগ বা বিপক্ষে ভোট (অনুচ্ছেদ ৭০): সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে কেউ যদি দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে ওই দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তবে তাঁর আসন শূন্য হবে।
আইনি অস্পষ্টতা ও অতীতের নজির
সংবিধানে দল থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ বা দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট থাকলেও, কোনো সংসদ সদস্যকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলে তাঁর সদস্যপদ থাকবে কি না, তা সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। তবে এ সংক্রান্ত সাংবিধানিক জটিলতা নিরসনে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে প্রেরণের বিধান রয়েছে, যেখানে ইসির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়।
১. আবু হেনার ঘটনা:
বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আবু হেনাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও তৎকালীন স্পিকার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার তাঁর সংসদ সদস্য পদ বহাল রাখার সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। তবে সেটি ২০০৮ সালের রাজনৈতিক দল নিবন্ধন আইন ও আরপিওতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আগের ঘটনা।
২. লতিফ সিদ্দিকীর ঘটনা:
দশম জাতীয় সংসদে বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হন লতিফ সিদ্দিকী। তখন আওয়ামী লীগ স্পিকারের কাছে তাঁর সদস্যপদ বাতিলের সুপারিশ করে এবং বিষয়টি ইসি পর্যন্ত গড়ায়।
আওয়ামী লীগের যুক্তি ছিল: দল থেকে বহিষ্কার হওয়ায় তিনি আর দলের কেউ নন এবং নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সুযোগ না থাকায় তিনি সদস্যপদ আইনগতভাবে হারিয়েছেন।
লতিফ সিদ্দিকীর যুক্তি ছিল: সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে উল্লেখিত সুনির্দিষ্ট কারণগুলো (যেমন- দেউলিয়া হওয়া, দুই বছরের সাজা ইত্যাদি) ছাড়া সদস্যপদ হারানোর সুযোগ নেই এবং ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও সংসদের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সদস্যপদ বহাল থাকে।
শেষ পর্যন্ত ইসিকে এই বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে হয়নি, কারণ শুনানি শুরুর আগেই লতিফ সিদ্দিকী নিজেই পদত্যাগপত্র জমা দেন এবং তাঁর আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়।
বর্তমান পরিস্থিতি ও বিশেষজ্ঞদের মত
গাজী নজরুল ইসলামের বহিষ্কারের পর সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী নৈতিক স্খলনের বিষয় উল্লেখ করে বহিষ্কার করলেও, আদালতের সুনির্দিষ্ট দণ্ড ছাড়া সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের সরাসরি প্রয়োগ এখানে কঠিন।
এ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেনের মতে, দলীয় মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচিত হওয়ার পর দল যদি কাউকে বহিষ্কার করে, তবে তিনি আর দলে থাকেন না এবং নির্বাচিত হওয়ার পর স্বতন্ত্র সদস্য হওয়ার সুযোগও থাকে না। সেই যুক্তিতে তিনি মনে করেন, গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করায় তাঁর সংসদ সদস্যপদও শূন্য হয়ে যাওয়ার কথা।
সার্বিকভাবে, বিষয়টি শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন বা আইনি ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করছে, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংসদ সদস্য পদ টিকিয়ে রাখার আইনি নজিরকে আরও একবার আলোচনায় নিয়ে এসেছে।



