এইমাত্র পাওয়া

গেজেট প্রকাশ: লিটারে ২০ টাকা বাড়ল সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম, নতুন দর কার্যকর ২১ সেপ্টেম্বর

দেশের বাজারে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম একসঙ্গে লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। নতুন মূল্য ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে এসব জ্বালানির দাম ছিল যথাক্রমে ১১৫, ১৩৫, ১৪০ ও ১৪৫ টাকা। ফলে প্রতিটি পণ্যের দামই আগের তুলনায় ২০ টাকা বেড়েছে।

নতুন ও পুরোনো দামের তুলনা

জ্বালানিআগের দামনতুন দামবৃদ্ধি
ডিজেল১১৫ টাকা১৩৫ টাকা২০ টাকা
কেরোসিন১৩৫ টাকা১৫৫ টাকা২০ টাকা
পেট্রোল১৪০ টাকা১৬০ টাকা২০ টাকা
অকটেন১৪৫ টাকা১৬৫ টাকা২০ টাকা

অর্থাৎ, ডিজেলের দাম প্রায় ১৭.৪ শতাংশ, কেরোসিনের প্রায় ১৪.৮ শতাংশ, পেট্রোলের প্রায় ১৪.৩ শতাংশ এবং অকটেনের প্রায় ১৩.৮ শতাংশ বেড়েছে।

গেজেটে কী বলা হয়েছে

২০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সরকারি গেজেটে জ্বালানি তেলের বিস্তারিত মূল্য কাঠামোও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে কর-উত্তর মূল্য, ব্যবসায়ী পর্যায়ের মুনাফা, ইনভয়েস/সরবরাহসংক্রান্ত ব্যয়, তেল বিপণন কোম্পানির মার্জিন, পরিবহন-সংক্রান্ত ব্যয় এবং ভোক্তা পর্যায়ের খুচরা মূল্য—বিভিন্ন উপাদান ধরে চূড়ান্ত দাম নির্ধারণের কাঠামো দেখানো হয়েছে।

গেজেটের শেষ সারিতে ডিপো থেকে ৪০ কিলোমিটারের মধ্যে ভোক্তা পর্যায়ের খুচরা মূল্য হিসেবে ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা ও পেট্রোল ১৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, পুনর্নির্ধারিত মূল্য যথাযথ কর্তৃপক্ষ অনুমোদন করেছে এবং ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে তা কার্যকর হবে

কেন হঠাৎ বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম?

জ্বালানি বিভাগের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এবং ফ্রেইট চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারে নতুন করে মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে।

সেপ্টেম্বরের শুরুতে সরকার জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রেখেছিল। তখন ডিজেল ১১৫, কেরোসিন ১৩৫, পেট্রোল ১৪০ এবং অকটেন ১৪৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের প্রথম ২০ দিন পুরোনো দামই কার্যকর ছিল।

এর আগে চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও কয়েক মাস দেশের বাজারে দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়।

স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতিতে আবারও বড় সমন্বয়

বাংলাদেশে ২০২৪ সাল থেকে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু রয়েছে। এ ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারের দাম, আমদানি ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার, কর-শুল্ক, ভ্যাট, বিপিসির মার্জিন ও অন্যান্য ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে দাম পর্যালোচনা করা হয়।

তবে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিটি ওঠানামার সঙ্গে দেশের বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে দাম পরিবর্তন করা বাধ্যতামূলক নয়। আগের মাসের দামও বহাল রাখার সুযোগ থাকে। সেপ্টেম্বর মাসে ঠিক এমনটাই হয়েছিল।

কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে সাম্প্রতিক অস্থিরতা এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এবার বড় ধরনের সমন্বয় করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ

সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ম্যাক্রো ইকোনমিক ফিসকাল ডেটা সংক্রান্ত তথ্যভান্ডারে প্রকাশিত বাজার প্রতিবেদনে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক সপ্তাহে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১২ শতাংশ বৃদ্ধির তথ্য তুলে ধরা হয়েছিল; সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও সরবরাহপথের ঝুঁকিকে বাজার অস্থিরতার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর জ্বালানি বাজারে আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি আমদানি ব্যয়ে পড়ে। ফলে দীর্ঘ সময় দেশের বাজারে দাম অপরিবর্তিত রাখলে সরকারি জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।

সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে ডিজেলে

চার ধরনের জ্বালানির মধ্যে ডিজেল বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরিবহন, কৃষি সেচ, পণ্য পরিবহন, বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ডিজেলের ব্যবহার রয়েছে। ফলে ডিজেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা হওয়ায় প্রতি ১০০ লিটারে অতিরিক্ত ব্যয় হবে ২ হাজার টাকা। আর কোনো যানবাহন বা প্রতিষ্ঠান মাসে ১ হাজার লিটার ডিজেল ব্যবহার করলে শুধু জ্বালানি বাবদ অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াবে ২০ হাজার টাকা

একইভাবে—

  • ৫০০ লিটার ডিজেলে অতিরিক্ত ব্যয়: ১০,০০০ টাকা
  • ১,০০০ লিটার ডিজেলে অতিরিক্ত ব্যয়: ২০,০০০ টাকা
  • ৫,০০০ লিটার ডিজেলে অতিরিক্ত ব্যয়: ১,০০,০০০ টাকা
  • ১০,০০০ লিটার ডিজেলে অতিরিক্ত ব্যয়: ২,০০,০০০ টাকা

ফলে পরিবহন ও উৎপাদন খাতের পরিচালন ব্যয়ের ওপর সরাসরি চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনে কী প্রভাব পড়তে পারে?

জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খাতের পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে ডিজেলচালিত বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, লঞ্চ ও অন্যান্য পরিবহন এতে প্রভাবিত হতে পারে।

তবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অর্থ এই নয় যে সব ধরনের গণপরিবহনের ভাড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে একই হারে বেড়ে যাবে। পরিবহন ভাড়া বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া প্রয়োজন।

অন্যদিকে পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়লে উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের পরিবহন খরচ বাড়তে পারে। এর ফলে বাজারে বিভিন্ন পণ্য পৌঁছানোর মোট ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কৃষি খাতেও বাড়বে ব্যয়ের চাপ

কৃষিতে সেচের জন্য ডিজেলচালিত পাম্প এখনও অনেক এলাকায় ব্যবহৃত হয়। ডিজেলের দাম ২০ টাকা বাড়ায় সেচ পরিচালনার খরচও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ট্রাক, পিকআপ বা অন্যান্য ডিজেলচালিত যানবাহনের ব্যয় বৃদ্ধি পাবে।

ফলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়, পণ্য পরিবহন এবং বাজারজাতকরণের ব্যয়ের ওপর পরোক্ষ চাপ তৈরি হতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট কৃষিপণ্যের দাম কত বাড়বে, তা কেবল জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না; উৎপাদন, সরবরাহ, চাহিদা, মৌসুম ও বাজার ব্যবস্থাপনাসহ একাধিক বিষয় এতে ভূমিকা রাখে।

সাধারণ ভোক্তার ব্যয়ের ওপরও প্রভাব

পেট্রোল ও অকটেন মূলত ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনে বেশি ব্যবহৃত হয়। ফলে এসব জ্বালানির ব্যবহারকারীদের সরাসরি মাসিক ব্যয় বাড়বে।

উদাহরণ হিসেবে, কোনো মোটরসাইকেলে মাসে ২০ লিটার পেট্রোল ব্যবহার হলে আগের তুলনায় অতিরিক্ত খরচ হবে ৪০০ টাকা। ৫০ লিটার ব্যবহার করলে অতিরিক্ত খরচ হবে ১,০০০ টাকা

একইভাবে অকটেনের ক্ষেত্রেও মাসিক ব্যবহার যত বেশি হবে, বাড়তি ব্যয়ের পরিমাণ তত বাড়বে।

দাম বাড়লেও এটি শুধু ভোক্তা পর্যায়ের বিষয় নয়

নতুন গেজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এখানে শুধু খুচরা বিক্রয়মূল্য ঘোষণা করা হয়নি; মূল্য কাঠামোর বিভিন্ন স্তরও প্রকাশ করা হয়েছে। অর্থাৎ সরকার কীভাবে বিভিন্ন ব্যয়, মার্জিন ও অন্যান্য উপাদান বিবেচনায় নিয়ে ভোক্তা পর্যায়ের চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণ করছে, তার একটি কাঠামো গেজেটে তুলে ধরা হয়েছে।

এ কারণে নতুন মূল্য কার্যকর হওয়ার পর বাজারে এর প্রভাব বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে শুধু পাম্পে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ার বিষয়টি দেখলেই হবে না। পরিবহন, কৃষি, শিল্প, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আমদানি ব্যয়ের ওপর এর সম্মিলিত প্রভাবও বিবেচনা করতে হবে।

এক নজরে নতুন দর

২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর নতুন ভোক্তা পর্যায়ের দাম—

🔹 ডিজেল: ১৩৫ টাকা/লিটার
🔹 কেরোসিন: ১৫৫ টাকা/লিটার
🔹 পেট্রোল: ১৬০ টাকা/লিটার
🔹 অকটেন: ১৬৫ টাকা/লিটার

অর্থাৎ চার ধরনের প্রধান জ্বালানি তেলের প্রতিটির দামই আগের তুলনায় ২০ টাকা করে বৃদ্ধি পেয়েছে

সারসংক্ষেপ

২০ সেপ্টেম্বরের এই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কয়েক মাস তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকার পর দেশের জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের মূল্য সমন্বয় হলো। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির চাপ, আমদানি ব্যয় এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের মূল্য কাঠামো—এসব বিবেচনার পর নতুন দর নির্ধারণ করা হয়েছে বলে সরকারি ব্যাখ্যা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলোতে উঠে এসেছে।

নতুন দাম ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়ায় সোমবার থেকেই ভোক্তাদের নতুন দরে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেন কিনতে হবে।

Source File

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *