আজ পবিত্র শবে মেরাজ: ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের ইবাদত-বন্দেগিতে মুখরিত হবে দেশ
যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে আজ শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) দিবাগত রাতে সারা দেশে পালিত হচ্ছে পবিত্র লাইলাতুল মেরাজ বা শবে মেরাজ। হিজরি ১৪৪৭ সনের রজব মাসের ২৬ তারিখ দিবাগত এই রাতটি মুসলিম উম্মাহর কাছে অত্যন্ত মহিমান্বিত ও তাৎপর্যপূর্ণ।
মেরাজের গুরুত্ব ও প্রেক্ষাপট
ইসলামিক তথ্যানুযায়ী, নবুওয়াতের দশম বছরে পবিত্র এই রাতে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মহান আল্লাহর বিশেষ মেহমান হিসেবে আরশে আজিমে গমন করেছিলেন। এই অলৌকিক ভ্রমণে তিনি সাত আসমান পাড়ি দিয়ে মহান রবের সান্নিধ্য লাভ করেন এবং উম্মতের জন্য ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম ‘নামাজ’-এর বিধান নিয়ে ফিরে আসেন। এই মহান সফর মূলত দুটি অংশে বিভক্ত: ‘ইসরা’ (মক্কা থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস সফর) এবং ‘মেরাজ’ (ঊর্ধ্বাকাশে গমন)।
দেশজুড়ে প্রস্তুতি ও কর্মসূচি
শবে মেরাজ উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন ও মসজিদসমূহ বিশেষ আলোচনা সভা, ওয়াজ মাহফিল এবং দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
-
বায়তুল মোকাররম: জাতীয় মসজিদে বাদ মাগরিব ‘মেরাজের গুরুত্ব ও তাৎপর্য’ শীর্ষক আলোচনা ও বিশেষ মোনাজাতের আয়োজন করা হয়েছে।
-
মসজিদে মসজিদে ইবাদত: রাতভর নফল নামাজ আদায়, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দরুদ পাঠের মাধ্যমে মহান আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা প্রার্থনা করবেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা।
-
পারিবারিক আবহে ইবাদত: অনেকে নিজ নিজ বাসগৃহেও রাতভর ইবাদত-বন্দেগির মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করবেন।
আবহাওয়া ও পরিবেশ
আবহাওয়া দপ্তরের তথ্যমতে, দেশের উত্তরাঞ্চলসহ কিছু এলাকায় মৃদু শৈত্যপ্রবাহ ও কুয়াশা বিরাজ করছে। এই শীতল আবহাওয়া উপেক্ষা করেই ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা মসজিদে জামাতে শরিক হচ্ছেন। সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থানগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ নজরদারি রয়েছে।
পরদিন অর্থাৎ ১৭ জানুয়ারি (শনিবার) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ঐচ্ছিক ছুটি পালিত হবে। তবে অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় দিনটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, শান্তি ও দেশের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনায় আজ রাতে বিশেষ প্রার্থনা করা হবে।
পবিত্র শবে মেরাজ এর ইতিহাস কি?
পবিত্র শবে মেরাজ বা লাইলাতুল মেরাজ ইসলাম ধর্মের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত বিস্ময়কর ও অলৌকিক ঘটনা। ‘মেরাজ’ শব্দটি আরবি, যার অর্থ হলো ‘ঊর্ধ্বগমন’ বা ‘মই’। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, নবুয়তের দশম বছর অর্থাৎ ৬২১ খ্রিষ্টাব্দের রজব মাসের ২৬ তারিখ দিবাগত রাতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) অলৌকিক এক সফরের মাধ্যমে মহান আল্লাহর দিদার (সাক্ষাৎ) লাভ করেছিলেন।
এই সম্পূর্ণ সফরটি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত ছিল:
১. ইসরা (মক্কা থেকে ফিলিস্তিন সফর)
সফরের প্রথম অংশকে বলা হয় ‘ইসরা’। পবিত্র কোরআনের সূরা বনী-ইসরাঈলের প্রথম আয়াতে এই ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে মহান আল্লাহ একটি দ্রুতগামী বাহন ‘বোরাক’ পাঠান। সেই বোরাকে চড়ে রাসূল (সা.) চোখের পলকে মক্কার পবিত্র কাবা শরীফ থেকে ফিলিস্তিনের বায়তুল মুকাদ্দাসে (মসজিদুল আকসা) পৌঁছান। সেখানে তিনি পূর্ববর্তী সকল নবী-রাসূলদের ইমামতি করে নামাজ আদায় করেন।
২. মেরাজ (ঊর্ধ্বাকাশে গমন)
বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে শুরু হয় সফরের দ্বিতীয় অংশ বা ‘মেরাজ’। রাসূল (সা.) সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে যান এবং এরপর থেকে একা মহান আল্লাহর আরশে আজিমের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এই সফরে তিনি একে একে সাতটি আসমান অতিক্রম করেন এবং বিভিন্ন নবীদের সাথে সাক্ষাত করেন।
-
জান্নাত ও জাহান্নাম দর্শন: এই দীর্ঘ সফরে রাসূল (সা.)-কে জান্নাতের শান্তি এবং জাহান্নামের কঠোর আজাব সচক্ষে দেখানো হয়।
-
আল্লাহর সাথে কথোপকথন: সিদরাতুল মুনতাহার পর এক পর্যায়ে রাসূল (সা.) মহান আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্যে পৌঁছান এবং সরাসরি কথোপকথন করেন।
উম্মতের জন্য শবে মেরাজের উপহার
এই মহিমান্বিত সফর থেকে ফেরার সময় মহানবী (সা.) মুসলিম উম্মাহর জন্য দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপহার নিয়ে আসেন: ১. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ: প্রথমে ৫০ ওয়াক্ত নামাজের বিধান দেওয়া হলেও পরবর্তীতে তা কমিয়ে ৫ ওয়াক্ত করা হয়, যা আদায় করলে ৫০ ওয়াক্তেরই সওয়াব পাওয়া যাবে। ২. সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত: মহান আল্লাহ সরাসরি এই আয়াতগুলো নাযিল করেন। ৩. শিরক না করা মুমিনদের ক্ষমার সুসংবাদ।
কেন এই সফর হয়েছিল?
রাসূল (সা.)-এর জীবনের অন্যতম কঠিন সময়ে এই মেরাজ ঘটেছিল। সেই বছরটি ছিল ‘আমুল হুজুন’ বা ‘দুঃখের বছর’, কারণ সে সময় তিনি তার প্রিয় স্ত্রী বিবি খাদিজা (রা.) এবং পরম শ্রদ্ধেয় চাচা আবু তালিবকে হারান। শোকাতুর নবীকে সান্ত্বনা দিতে এবং আল্লাহর অসীম ক্ষমতা প্রদর্শন করতেই এই অলৌকিক সফরের আয়োজন করা হয়েছিল।


