জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর ঢাকার বাসভাড়া: নতুন হার কার্যকর, যাত্রীদের ফোনে রাখুন রুটভিত্তিক ভাড়া তালিকা
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর ঢাকার ডিজেলচালিত বাস ও মিনিবাসের ভাড়া নতুন করে নির্ধারণ করেছে সরকার। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে নতুন ভাড়া কার্যকর হয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে ডিজেলচালিত বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা হয়েছে। একই সঙ্গে মহানগরীর মিনিবাসের ভাড়া হয়েছে প্রতি কিলোমিটার ২ টাকা ৬০ পয়সা।
এদিকে যাত্রীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া নির্ধারণের পাশাপাশি রুটভেদে নির্দিষ্ট ভাড়া তালিকাও অনুসরণ করতে হবে। প্রকাশিত ভাড়া চার্টে মিরপুর-১২ থেকে মতিঝিলসহ বিভিন্ন স্টপেজের দূরত্ব ও ভাড়ার হিসাব দেখানো হয়েছে। তাই নিয়মিত যে রুটে যাতায়াত করেন, সেই রুটের অনুমোদিত ভাড়া তালিকার ছবি মোবাইলে সংরক্ষণ করে রাখা হলে ভাড়া নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে সেটি কাজে লাগতে পারে।
কেন আবার বাড়ল বাসভাড়া?
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের ২২ সেপ্টেম্বরের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বাস পরিচালনার বর্তমান ব্যয় বিবেচনায় ডিজেলচালিত বাস ও মিনিবাসের ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আগের ভাড়া-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন ও আদেশগুলোও রহিত করা হয়েছে।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে বাসের পুরোনো কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ছিল ২ টাকা ৫৩ পয়সা। নতুন হার ২ টাকা ৭০ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে বৃদ্ধি ১৭ পয়সা। আগের হারের তুলনায় এটি প্রায় ৬ দশমিক ৭২ শতাংশ বৃদ্ধি।
নতুন ভাড়ার মূল কাঠামো
| চলাচলের ধরন | আগের ভাড়া | নতুন ভাড়া |
|---|---|---|
| ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর বাস | ২.৫৩ টাকা/কিমি | ২.৭০ টাকা/কিমি |
| ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর মিনিবাস | ২.৪৩ টাকা/কিমি | ২.৬০ টাকা/কিমি |
| আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার বাস-মিনিবাস | ২.২৩ টাকা/কিমি | ২.৪০ টাকা/কিমি |
| ডিটিসিএ আওতাধীন নির্দিষ্ট এলাকার বাস-মিনিবাস | ২.৪৩ টাকা/কিমি | ২.৬০ টাকা/কিমি |
সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নতুন হার ২২ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে।
সর্বনিম্ন ভাড়ার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ
ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে ডিজেলচালিত বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা এবং মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে অল্প দূরত্বের যাত্রার ক্ষেত্রে কিলোমিটারভিত্তিক হিসাব ১০ টাকা বা ৮ টাকার নিচে হলেও সংশ্লিষ্ট যানবাহনের জন্য নির্ধারিত সর্বনিম্ন ভাড়া প্রযোজ্য হবে।
এখানে যাত্রীদের একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন—সব বাসের ক্ষেত্রে নতুন ভাড়া প্রযোজ্য নয়। সরকারি প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট করা হয়েছে, এই সংশোধিত ভাড়া ডিজেলচালিত বাস ও মিনিবাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; গ্যাসচালিত বাস ও মিনিবাসের ক্ষেত্রে এই নতুন হার প্রযোজ্য হবে না।
মিরপুর-১২ থেকে মতিঝিল: রুটভিত্তিক ভাড়ার হিসাব কেন গুরুত্বপূর্ণ?
প্রকাশিত ভাড়া তালিকায় মিরপুর-১২ থেকে মতিঝিল পর্যন্ত বিভিন্ন স্টপেজ ধরে ভাড়া নির্ধারণের একটি বিস্তারিত কাঠামো দেখা যায়। তালিকায় যাত্রাপথের বিভিন্ন পর্যায়, দূরত্ব এবং সংশ্লিষ্ট ভাড়া পাশাপাশি দেখানো হয়েছে।
অর্থাৎ শুধু ‘প্রতি কিলোমিটার ২ টাকা ৭০ পয়সা’ শুনে যাত্রীর কাছ থেকে যেকোনো অঙ্ক দাবি করার সুযোগ নেই। যাত্রীর প্রকৃত গন্তব্য, অনুমোদিত রুট এবং সংশ্লিষ্ট ভাড়া তালিকা বিবেচনা করেই ভাড়া নেওয়ার কথা।
এ কারণে নিজের নিয়মিত রুটের ভাড়া তালিকার ছবি মোবাইলে রেখে দেওয়া বাস্তবিক অর্থে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে ইতোমধ্যেই অভিযোগ
নতুন ভাড়া কার্যকর হওয়ার পর রাজধানীর বিভিন্ন রুটে সরকারি নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি আদায়ের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম আলোর সরেজমিন প্রতিবেদনে ধানমন্ডি থেকে গুলিস্তান, নতুনবাজার থেকে গুলিস্তান এবং পল্টন থেকে কারওয়ান বাজারসহ কয়েকটি পথে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনটিতে বিআরটিএ চেয়ারম্যানের বক্তব্যও এসেছে—সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে এক পয়সাও বেশি নেওয়া যাবে না এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতসহ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এখানেই রুটভিত্তিক ভাড়া তালিকা যাত্রীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ শুধু ‘ভাড়া বাড়ানো হয়েছে’—এমন সাধারণ তথ্য জানলে কোনো নির্দিষ্ট যাত্রায় কত টাকা দেওয়ার কথা, তা বোঝা কঠিন হতে পারে।
বাসে ভাড়ার তালিকা প্রদর্শনের নির্দেশ
সরকারি নির্দেশনায় প্রতিটি বাস ও মিনিবাসের দৃশ্যমান স্থানে নতুন ভাড়ার তালিকা প্রদর্শনের কথা বলা হয়েছে। ফলে যাত্রী বাসে উঠলে ভাড়ার তালিকা দেখতে চাইতে পারেন এবং নিজের গন্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারেন।
এছাড়া আরামদায়ক যাত্রার জন্য অনুমোদিত আসনসংখ্যা কমিয়ে কোনো বাস বা মিনিবাসে আসন পুনর্বিন্যাস করা হলে ভাড়াও আনুপাতিকভাবে পুনর্নির্ধারণের বিধান রাখা হয়েছে। এ ধরনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের বিষয়ও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ রয়েছে।
যাত্রীদের কী করা উচিত?
নতুন ভাড়ার বাস্তব প্রয়োগের পরিস্থিতিতে কয়েকটি বিষয় অনুসরণ করলে বিভ্রান্তি কমতে পারে—
১. নিজের নিয়মিত রুটের ভাড়া তালিকা ফোনে সেভ করুন।
বিশেষ করে প্রতিদিন অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা ব্যবসার কাজে একই পথে চলাচল করলে রুটভিত্তিক তালিকার স্ক্রিনশট বা ছবি রাখা সুবিধাজনক।
২. বাসের ভেতরে প্রদর্শিত ভাড়া তালিকা দেখুন।
সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ভাড়ার তালিকা দৃশ্যমান স্থানে থাকার কথা।
৩. ডিজেল নাকি গ্যাসচালিত বাস, সেটি খেয়াল করুন।
কারণ নতুন সংশোধিত হার ডিজেলচালিত বাস ও মিনিবাসের জন্য প্রযোজ্য; গ্যাসচালিত যানবাহনের ক্ষেত্রে একই হার স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য নয়।
৪. শুধু কিলোমিটারপ্রতি হার দেখে ভাড়া হিসাব করবেন না।
সর্বনিম্ন ভাড়া এবং নির্দিষ্ট রুটের অনুমোদিত ভাড়া তালিকাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
৫. অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করা হলে তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
ভাড়া নিয়ে বিরোধ হলে শান্তভাবে নির্ধারিত তালিকা দেখিয়ে বিষয়টি যাচাই করা যেতে পারে।
কেন ফোনে তালিকা রাখা এখন বেশি জরুরি?
সরকারি হিসাবে নতুন ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা বাড়লেও বাস্তবে কিছু রুটে যাত্রীদের কাছ থেকে ৫–১০ টাকা অতিরিক্ত নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ সরকারি হারে ভাড়া বৃদ্ধি এবং বাস্তবে কোনো কোনো যাত্রীর কাছ থেকে আদায় করা বাড়তি অর্থ—দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
এ কারণেই নিজের রুটের ভাড়া তালিকা মোবাইলে সংরক্ষণ করা শুধু তথ্য রাখার বিষয় নয়; এটি যাত্রীকে নির্ধারিত ভাড়া যাচাই করার একটি সহজ উপায়ও দিতে পারে।
এক কথায়
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ঢাকার ডিজেলচালিত বাসের নতুন কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ৭০ পয়সা এবং মিনিবাসের ২ টাকা ৬০ পয়সা। বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা, মিনিবাসের ৮ টাকা। তবে নতুন হার কেবল ডিজেলচালিত বাস-মিনিবাসের জন্য।
তাই যাত্রীরা যে রুটে নিয়মিত চলাচল করেন, সেই রুটের অনুমোদিত ভাড়া তালিকা এখনই ফোনে ছবি তুলে বা স্ক্রিনশট নিয়ে সংরক্ষণ করে রাখতে পারেন। এতে বাসে ওঠার পর নির্ধারিত ভাড়ার সঙ্গে দাবিকৃত ভাড়া মিলিয়ে দেখা সহজ হবে এবং অপ্রয়োজনীয় হয়রানি বা তর্ক এড়াতে তথ্যটি হাতের কাছেই থাকবে।


