দেশে মাথাপিছু ঋণ ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা, সংসদে জানালেন অর্থমন্ত্রী
দেশের প্রতিটি নাগরিকের গড় ঋণের দায় ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা ১৯ পয়সা—৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত হিসাব তুলে ধরে জাতীয় সংসদকে এ তথ্য জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) কুষ্টিয়া-১ আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহাম্মেদের লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য দেন।
তবে ‘মাথাপিছু ঋণ’ শব্দটি শুনে মনে করার সুযোগ নেই যে প্রত্যেক নাগরিককে এখন সরাসরি ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা করে ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এটি মূলত দেশের সরকারি ঋণের মোট দায়কে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে পাওয়া গড় হিসাব। অর্থাৎ এটি একটি অর্থনৈতিক সূচক, ব্যক্তিগত ব্যাংকঋণের মতো প্রত্যেক নাগরিকের নামে থাকা ঋণ নয়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই হিসাব?
মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ২৯ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা। কারণ সরকারের ঋণ বাড়লে শুধু মূলধন পরিশোধের দায়ই বাড়ে না, এর সঙ্গে যুক্ত হয় সুদ পরিশোধের ব্যয়। ফলে ভবিষ্যৎ বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা কিংবা অন্যান্য উন্নয়ন খাতে ব্যয়ের পাশাপাশি ঋণ ও সুদ পরিশোধের জন্যও বড় অঙ্কের অর্থ সংস্থান করতে হয়।
অর্থাৎ ঋণ নিজে সবসময় খারাপ বিষয় নয়। উন্নয়ন প্রকল্প, অবকাঠামো নির্মাণ বা অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতে ঋণ বিনিয়োগ করা হলে তা ভবিষ্যতে আয় ও প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারে। কিন্তু ঋণের অর্থ যদি অপরিকল্পিত বা কম ফলপ্রসূ খাতে ব্যয় হয়, তখন সেই ঋণের বোঝা অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
সরকার কীভাবে ঋণের চাপ কমাতে চায়?
সংসদে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, জনগণের ওপর ঋণের বোঝা কমাতে সরকার কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরও সুশৃঙ্খল করা।
সরকারি ব্যয়কে আরও সাশ্রয়ী ও ফলপ্রসূ করা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণের কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত ও অপরিকল্পিত ঋণ নেওয়া এড়াতে ‘অ্যানুয়াল বোরোয়িং প্ল্যান’ অনুসরণ এবং সরকারের নগদ প্রয়োজন, রাজস্ব-ব্যয়ের প্রবাহ ও ঋণ পরিশোধের সময়সূচি বিবেচনায় ক্যাশ ফোরকাস্টিং ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া সরকারি ঋণের সুদ ব্যয় ও ঝুঁকি কমাতে বাজারভিত্তিক ও সুশৃঙ্খল ঋণ ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ ঋণবাজারের উন্নয়ন এবং সরকারি সিকিউরিটিজের বাজার আরও কার্যকর করার উদ্যোগের কথাও জানানো হয়েছে।
মাথাপিছু ঋণ বাড়লে সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব কী?
মাথাপিছু ঋণ সরাসরি নাগরিকের পকেট থেকে আদায় করা হয় না। কিন্তু এর পরোক্ষ প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পড়তে পারে।
সরকারের ঋণের সুদ ও মূলধন পরিশোধের প্রয়োজন যত বাড়বে, বাজেটে অন্যান্য খাতে ব্যয়ের জন্য তত বেশি অর্থের প্রয়োজন হবে। রাজস্ব ঘাটতি থাকলে সরকারকে নতুন করে ঋণ নিতে হতে পারে। আবার রাজস্ব বাড়াতে করের আওতা বা আদায় বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে।
ফলে একটি দেশের ঋণের স্থায়িত্ব শুধু মোট ঋণের অঙ্ক দিয়ে বিচার করা যায় না। দেখতে হয়—ঋণের তুলনায় অর্থনীতির আকার কত, সরকারের রাজস্ব কত, ঋণের সুদ কত, ঋণ কোন খাতে ব্যবহার হয়েছে এবং ভবিষ্যতে সেই বিনিয়োগ থেকে কতটা আয় বা উৎপাদনশীলতা তৈরি হবে।
আরেকটি বড় উদ্বেগ—রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ
একই সংসদীয় প্রশ্নোত্তর পর্বে অর্থমন্ত্রী রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের খেলাপি ঋণের একটি বড় চিত্রও তুলে ধরেছেন। ৩০ জুনের হিসাব অনুযায়ী এসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণই সবচেয়ে বেশি—প্রায় ৭৫ হাজার ৩৯৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বাড়লে ব্যাংকিং খাতের আর্থিক সক্ষমতা ও সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে ঋণশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ঋণ কমানোর আসল পথ কোথায়?
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শুধু নতুন ঋণ নেওয়া বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। একই সঙ্গে তিনটি জায়গায় উন্নতি প্রয়োজন—
প্রথমত, রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে।
সরকারের নিজস্ব আয় যত বাড়বে, বাজেট ঘাটতি পূরণে ঋণের ওপর নির্ভরতা তত কমবে।
দ্বিতীয়ত, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়াতে হবে।
যে প্রকল্প অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয় বা দীর্ঘমেয়াদে মানুষের আয় ও উৎপাদনশীলতা বাড়ায় না, সেসব খাতে ঋণের অর্থ ব্যয় করলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে।
তৃতীয়ত, ঋণের টাকা কোথায় যাচ্ছে, তার কঠোর হিসাব রাখতে হবে।
ঋণ নিয়ে যদি এমন অবকাঠামো ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা যায়, যেখান থেকে কর্মসংস্থান, রপ্তানি, রাজস্ব ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ে, তাহলে ঋণ অর্থনীতির জন্য বোঝা না হয়ে বিনিয়োগে পরিণত হতে পারে।
শেষ কথা
৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী মাথাপিছু ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা ১৯ পয়সা ঋণ—এই তথ্য নিঃসন্দেহে দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। তবে এটিকে সরাসরি ‘প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত ঋণ’ হিসেবে দেখলে বিষয়টি ভুলভাবে বোঝা হবে।
মূল প্রশ্ন হলো—এই ঋণের অর্থ কতটা উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহৃত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে সরকার কতটা রাজস্ব আয় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তৈরি করতে পারবে। ঋণের পরিমাণের পাশাপাশি ঋণের গুণগত ব্যবহার, সুদ ব্যয়, রাজস্ব সক্ষমতা এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে এই ঋণ দেশের জন্য বিনিয়োগ নাকি দীর্ঘমেয়াদি বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
সংক্ষেপে:
➡️ ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত মাথাপিছু ঋণ: ১,২৯,২৩৯.১৯ টাকা
➡️ তথ্য দিয়েছেন: অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী
➡️ তথ্যটি এসেছে: জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে
➡️ ঋণের চাপ কমানোর কৌশল: রাজস্ব বৃদ্ধি + ব্যয় নিয়ন্ত্রণ + সুশৃঙ্খল ঋণ ব্যবস্থাপনা
➡️ রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ: ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।


