খেলাপি ঋণের ভারে জর্জরিত ৩৬ ব্যাংক: লভ্যাংশ বঞ্চিত হতে পারেন অধিকাংশ শেয়ারহোল্ডার
দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের চিত্র ক্রমেই ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। সম্প্রতি প্রকাশিত ৩৬টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হারের একটি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ব্যাংক খাতের বড় একটি অংশ এখন খাদের কিনারে অবস্থান করছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নির্দেশনার কারণে খেলাপি ঋণের উচ্চ হারের দায়ে এবার অনেক ব্যাংকই তাদের শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ (Dividend) দিতে পারবে না।
লভ্যাংশ বিতরণে বাংলাদেশ ব্যাংকের লাল কার্ড
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ গাইডলাইন অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার (NPL Ratio) ১০ শতাংশের উপরে থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ওই বছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের কোনো প্রকার লভ্যাংশ প্রদান করতে পারবে না। মূলত ব্যাংকিং খাতের আর্থিক ভিত শক্তিশালী করতে এবং আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
পরিসংখ্যানের চিত্র: খাদের কিনারে যারা
প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে অর্ধেকের বেশি ব্যাংকের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। তালিকায় দেখা যায়:
নিরাপদ অবস্থানে (১০% এর নিচে): ইস্টার্ন ব্যাংক (৩.০৯%), ব্র্যাক ব্যাংক (৩.৫৮%), সিটি ব্যাংক (৪.৭৬%) এবং ডাচ-বাংলা ব্যাংকসহ (৪.৯২%) ১৮টি ব্যাংক এখনো ১০ শতাংশের নিচে খেলাপি ঋণের হার বজায় রাখতে পেরেছে। এই ব্যাংকগুলো লভ্যাংশ প্রদানের যোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে (১০% – ২০%): ইউসিবি (১১.৬৯%), ওয়ান ব্যাংক (১৩.৪৯%) এবং এনআরবিসি (১৭.১১%) সহ বেশ কিছু ব্যাংক লভ্যাংশ প্রদানের যোগ্যতা হারিয়েছে।
ভয়াবহ সংকটে (৫০% এর উপরে): তালিকার শেষ দিকে থাকা ব্যাংকগুলোর অবস্থা উদ্বেগজনক। এবি ব্যাংক (৫০.৮৮%), ন্যাশনাল ব্যাংক (৫১.৯৯%), আইএফআইসি (৫৩.১২%), এক্সিম (৬২.৪৫%) এবং এসআইবিএল (৮০.৩৮%) এর মতো ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার আকাশচুম্বী।
সর্বোচ্চ খেলাপি: ইউনিয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার প্রায় শতভাগ ছুঁইছুঁই (৯৭.৬৪%), যা পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি অশনিসংকেত।
প্রভাব পড়বে পুঁজিবাজারে
লভ্যাংশ দিতে না পারার এই ঘোষণা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর শেয়ারের দরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যারা লভ্যাংশের আশায় ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগ করেছেন, তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন।
বিশেষজ্ঞ অভিমত
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বড় গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধে অনীহা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকির অভাবই খেলাপি ঋণ এই পর্যায়ে যাওয়ার মূল কারণ। বর্তমান পরিস্থিতিতে যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার বেশি, তাদের মূলধন পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হতে পারে। লভ্যাংশ বন্ধের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে নিজস্ব মূলধন বাড়ানোর সুযোগ দিলেও, দীর্ঘমেয়াদী সংস্কার ছাড়া এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ব্যাংকগুলোকে ঋণ আদায়ে কতটা বাধ্য করতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।



