এইমাত্র পাওয়া

জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনে ভুলের ধরন অনুযায়ী সময় আলাদা, কোন সংশোধনে কতদিন লাগতে পারে?

জাতীয় পরিচয়পত্র বা NID কার্ডে তথ্যের ভুল থাকলে সংশোধনের জন্য আবেদন করা যায়। তবে সব ধরনের ভুল একই পর্যায়ের নয়। ভুলের ধরন, প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র এবং সংশোধনের জটিলতার ওপর ভিত্তি করে আবেদন যাচাই ও নিষ্পত্তির সময়ও ভিন্ন হতে পারে। সম্প্রতি প্রচারিত একটি তথ্যচিত্রে সাধারণ, মাঝারি ও জটিল ভুলকে আলাদা করে সম্ভাব্য সময়সীমা দেখানো হয়েছে। তবে এসব সময়কে নির্দিষ্ট সরকারি নিশ্চয়তা হিসেবে না দেখে আনুমানিক সময় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কারণ নির্বাচন কমিশনের প্রক্রিয়ায় প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত কাগজপত্র, শুনানি বা তদন্তের প্রয়োজন হতে পারে।

সাধারণ ভুল হলে তুলনামূলক দ্রুত সংশোধন

NID-তে ছোটখাটো বানানভুল, রক্তের গ্রুপের মতো তুলনামূলক সরল তথ্য সংশোধন সাধারণত জটিল সংশোধনের চেয়ে সহজ। ছবিতে এ ধরনের সংশোধনকে ‘ক’ ক্যাটাগরি হিসেবে দেখিয়ে আনুমানিক ৭ থেকে ১৫ দিন সময়ের কথা বলা হয়েছে।

তবে সরকারি নিয়মে রক্তের গ্রুপ সংশোধনের জন্য মেডিকেল প্রতিবেদন প্রয়োজন হতে পারে। একইভাবে সংশোধনের আবেদন করার সময় যথাযথ সমর্থনকারী দলিল দিতে হয়। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, NID সংশোধনের ক্ষেত্রে SSC বা সমমানের সনদ, জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, বিবাহ/বিবাহবিচ্ছেদের কাগজসহ বিভিন্ন দলিল প্রয়োজন হতে পারে।

পিতা-মাতার নাম বা ঠিকানার ভুলে বাড়তে পারে যাচাই

ছবিতে পিতা-মাতার নাম বা ঠিকানার মতো মাঝারি ধরনের ভুলকে ‘খ’ ক্যাটাগরি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং আনুমানিক ১৫ থেকে ৩০ দিন সময়ের কথা বলা হয়েছে।

বাস্তবে এ ধরনের সংশোধনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, পিতা/মাতা বা স্বামী/স্ত্রীর নাম সংশোধনের ক্ষেত্রে SSC/সমমান সনদ, জন্মসনদ, নাগরিকত্ব সনদ, পাসপোর্ট, নিকাহনামা কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির NID-এর কপি—প্রয়োজন অনুযায়ী—দাখিল করতে হতে পারে। এসব দলিল সত্যায়িত করার বিষয়ও রয়েছে।

ঠিকানার ক্ষেত্রে ভোটার এলাকা পরিবর্তন না করে শুধু ঠিকানার নম্বর বা বানান সংশোধনের জন্য পরিবারের সদস্যের NID, গ্যাস/বিদ্যুৎ/টেলিফোন বিল, কর পরিশোধের কাগজ কিংবা চেয়ারম্যান/ওয়ার্ড কমিশনারের প্রত্যয়নপত্রের মতো প্রমাণপত্র প্রয়োজন হতে পারে।

নাম বা বয়সের বড় পরিবর্তন হলে সময় বেশি লাগতে পারে

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জটিল সংশোধন। প্রচারিত তথ্যচিত্রে পুরো নাম পরিবর্তন, বয়সের বড় ধরনের সংশোধন ইত্যাদিকে ‘গ’ ও ‘ঘ’ ক্যাটাগরির আওতায় দেখিয়ে আনুমানিক ৩০ থেকে ৯০ দিন বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষ করে জন্মতারিখ বা বয়সের বড় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের নিয়মে অতিরিক্ত যাচাইয়ের সুযোগ রয়েছে। SSC বা সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলে জন্মতারিখ সংশোধনের জন্য সংশ্লিষ্ট সনদের সত্যায়িত কপি দিতে হয়। বয়সে অস্বাভাবিক পরিবর্তন থাকলে মূল সনদ প্রদর্শন বা ব্যক্তিগত শুনানিতে অংশ নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। SSC-এর নিচে শিক্ষাগত যোগ্যতা হলে সার্ভিস বুক, এমপিও, ড্রাইভিং লাইসেন্স, জন্মসনদ, নিকাহনামা বা পাসপোর্টের মতো পুরোনো প্রমাণপত্র চাওয়া হতে পারে। প্রয়োজনে সাক্ষাৎকার বা সরেজমিন তদন্তও হতে পারে।

নিজের নাম পরিবর্তন আরও জটিল হতে পারে

NID-তে শুধু বানান সংশোধন আর নিজের নাম পরিবর্তন—দুটি বিষয় এক নয়। ডাকনাম বা অন্য নামে নিবন্ধিত তথ্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে SSC/সমমান সনদ, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে স্বামী/স্ত্রীর NID, ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের এফিডেভিট এবং জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপনের কপি প্রয়োজন হতে পারে। এরপর মূল কাগজপত্র নিয়ে ব্যক্তিগত শুনানিতে উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজনও হতে পারে।

অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি যদি শুধু একটি অক্ষরের বানান ভুল ঠিক করতে চান, সেটিকে পুরো নাম পরিবর্তনের আবেদনের সঙ্গে এক করে দেখলে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।

আবেদন করার আগে যেসব বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি

NID সংশোধনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যে তথ্যটি সঠিক বলে দাবি করা হচ্ছে, তার পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ দেওয়া। নির্বাচন কমিশনও স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, সংশোধনের জন্য আবেদন করার সময় সমর্থনকারী দলিল দিতে হবে এবং SSC সনদ থাকলে সেটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

এ ছাড়া—

  • আবেদন করার আগে NID, জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাগজের তথ্য মিলিয়ে দেখা উচিত।
  • পিতা-মাতার নাম সংশোধনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পিতা-মাতার NID ও নিজের কাগজপত্রের তথ্য মিলিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
  • জন্মতারিখ পরিবর্তনের আবেদন হলে পুরোনো ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণপত্র প্রস্তুত রাখা জরুরি।
  • ঠিকানা সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি বিল, করের কাগজ বা প্রত্যয়নপত্র প্রস্তুত রাখা ভালো।
  • রক্তের গ্রুপ সংশোধনের ক্ষেত্রে চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রমাণপত্র প্রয়োজন হতে পারে।
  • অসম্পূর্ণ বা ভুল তথ্য দিয়ে আবেদন করলে আবেদন বাতিল হতে পারে।

ক্যাটাগরি পরিবর্তন হলেও নতুন করে সময় লাগতে পারে

NID সংশোধন প্রক্রিয়ায় কোনো আবেদন এক ক্যাটাগরি থেকে অন্য ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরিত হতে পারে। ২০২৩ সালের সরকারি গেজেটের তথ্য অনুযায়ী, কোনো সংশোধনী আবেদন বাতিল হওয়ার পর পুনরায় আবেদন করলে সেটি Re-Modified হিসেবে প্রদর্শিত হতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পুনরায় ক্যাটাগরি নির্ধারণ করতে পারেন। এমন পুনরায় দাখিল করা আবেদনের ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধানও উল্লেখ রয়েছে।

এ কারণে শুধু আবেদন জমা দেওয়ার পর ছবিতে দেখানো ৭, ১৫, ৩০ বা ৯০ দিনের হিসাব ধরে নিশ্চিতভাবে NID সংশোধন হয়ে যাবে—এমনটা বলা ঠিক হবে না।

আবেদনকারীর মোবাইলে আসতে পারে স্ট্যাটাসের তথ্য

NID সংশোধনের আবেদন ইলেকট্রনিকভাবে গ্রহণ করা হলে আবেদনকারীকে SMS-এর মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন নম্বর ও আবেদনের ক্যাটাগরি সম্পর্কে জানানো হতে পারে। অতিরিক্ত কাগজপত্র প্রয়োজন হলে সেটিও SMS-এর মাধ্যমে জানানো এবং আবেদন অনুমোদিত বা বাতিল হলে পরবর্তী SMS দেওয়ার বিধান রয়েছে।

আবার আবেদন অনুমোদিত হলে Card Management System-এর মাধ্যমে NID মুদ্রণের ব্যবস্থা করা যায় এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিস থেকে তা বিতরণ করা হয়।

মূল কথা

প্রচারিত তথ্যচিত্র অনুযায়ী NID সংশোধনের ক্ষেত্রে সাধারণ ভুলে প্রায় ৭–১৫ দিন, মাঝারি ভুলে ১৫–৩০ দিন এবং জটিল ভুলে ৩০–৯০ দিন বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। কিন্তু এটি আনুমানিক শ্রেণিবিন্যাস—প্রতিটি আবেদনের ক্ষেত্রে একই সময় লাগবে এমন সরকারি নিশ্চয়তা নয়।

বিশেষ করে নিজের নাম, পিতা-মাতার নাম, জন্মতারিখ বা বয়সের বড় ধরনের পরিবর্তন হলে প্রমাণপত্র যাচাই, ব্যক্তিগত শুনানি কিংবা তদন্তের প্রয়োজন হতে পারে। তাই দ্রুত সংশোধনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক ক্যাটাগরিতে আবেদন করা এবং দাবিকৃত তথ্যের পক্ষে শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য কাগজপত্র জমা দেওয়া। নির্বাচন কমিশনের অফিসিয়াল তথ্যেও সংশোধনের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় দলিল ও যাচাইয়ের বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *