‘আমরা হাফ ভাড়া নিলেও, তারা তো আমাদের হাফ ভিজিট নেয় না’: এক বাস ড্রাইভারের আকুতি ও আমাদের বিবেক
আমাদের সমাজে প্রতিটি মানুষের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু আমরা কি সবাইকে তার প্রাপ্য সম্মান বা মূল্যায়ন দিতে পারছি? সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় এক বাস চালকের আবেগঘন কিছু কথা এবং এক যাত্রীর আত্মোপলব্ধিমূলক একটি ফেসবুক পোস্ট ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। পোস্টটি আমাদের শিক্ষা, পেশাগত মর্যাদা এবং সামাজিক বৈষম্যের এক নির্মম বাস্তবতাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
২০ বছরের সেবা ও একপাক্ষিক ‘ভাতিজা’ সম্পর্ক
অভিজ্ঞ ওই বাস চালক দীর্ঘ ২০ বছর ধরে শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়ায় যাতায়াত করাচ্ছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “পান থেকে চুন খসলেই ভার্সিটির মোড়ে একদল বন্ধুবান্ধব নিয়া গাড়ি আটকাইয়া পিডায়। তবুও নিজের ভাই-ভাতিজার মত মনে কইরা সব মাইন্যা নিছি।”
শিক্ষার্থীদের এই অন্যায় আচরণ মুখ বুজে সহ্য করার পেছনে চালকদের এক অদ্ভুত অভিভাবকত্বসুলভ ভালোবাসা কাজ করে। অথচ, এই শিক্ষার্থীরাই যখন পরবর্তীতে পড়ালেখা শেষ করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে—ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হচ্ছে—তখন তাদের আচরণ বদলে যাচ্ছে। চালক ভাই ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন:
“তারা যে বড় হইয়া প্রতিষ্ঠিত হইছে, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হইছে, আমরা বাসড্রাইভার বা শ্রমিকদের জন্য কী করছে? তারা কিন্তু আমরা শ্রমিকদের বাবা বা চাচার মত মনে কইরা কোনোদিন হাফ ভিজিট নেয়না। শ্রমিক আইছে শুনে কখনো কখনো তাদের চেহারাও পাল্টে যায়!”
পর্দার ওপারের বাস্তব চিত্র: চালকদের উদারতা
পোস্টদাতার নিজস্ব অভিজ্ঞতাও এই নির্মম সত্যকে সমর্থন করে। তিনি জানান, ঢাকা শহরে দীর্ঘদিন থাকার সুবাদে তিনি দেখেছেন যে, স্টুডেন্ট কার্ড থাকলে চালকেরা কখনোই ফুল ভাড়া নেন না। এমনকি অনেক সময় অসচ্ছল যাত্রী কিংবা শিক্ষার্থীরা ভাড়া নিয়ে ঝামেলা করলে, হেল্পার রেগে গেলেও ড্রাইভাররাই উল্টো ধমক দিয়ে বলেন, “বাদ দে।”
শিক্ষার্থীদের যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে হেল্পারকে থামিয়ে শান্ত রাখার মূল ভূমিকাটি পালন করেন এই চালকেরাই।
আমাদের আত্মোপলব্ধি ও দায়বদ্ধতা
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সমাজের কাছে একটি বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—আমরা কি আসলেই এই শ্রমজীবী মানুষদের সঠিক মূল্যায়ন করতে পেরেছি?
একটি শিশুর বড় হওয়া এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পেছনে কেবল বাবা-মা বা শিক্ষকের অবদানই শেষ কথা নয়। প্রতিদিন নিরাপদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানো এবং ঘরে ফেরার পেছনে এই পথেঘাটের পরিবহন শ্রমিকদের অবদানও সমপরিমাণ। তারা রোদ, বৃষ্টি, ঝড় কিংবা তীব্র ট্রাফিক জ্যাম উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীদের গন্তব্যে পৌঁছে দেন বলেই আজ অনেকে সফল ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা আমলা হতে পেরেছেন।
সামাজিক বার্তা ও উপসংহার
সোশ্যাল মিডিয়ার এই পোস্টটি কেবল একটি চালকের আক্ষেপ নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক সমাজের বিবেকের প্রতি একটি চপেটাঘাত। পেশা দিয়ে মানুষকে বিচার করার এই নোংরা মানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
যে চালক আজ একজন শিক্ষার্থীকে ‘সন্তান’ বা ‘ভাতিজা’ মনে করে হাফ ভাড়ায় যাতায়াতের সুযোগ দিচ্ছেন, সেই শিক্ষার্থী ডাক্তার বা প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি হওয়ার পর ওই চালককে ‘বাবা’ বা ‘চাচা’ ভেবে একটুখানি সম্মান বা সুযোগ কেন দিতে পারবেন না?
আসুন, পেশাগত অহংকার ভুলে এই মেহনতি মানুষদের অবদানকে স্মরণ করি। সমাজের সকল চালক ও পরিবহন শ্রমিক ভাইদের প্রতি রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।


