১৭ মাসের সফল যাত্রা: ড. ইউনূসের নেতৃত্বে বদলে যাচ্ছে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ভাগ্য
বাংলাদেশে গত ১৭ মাস ধরে রাষ্ট্র সংস্কারের যে মহাযজ্ঞ চলছে, তার অন্যতম সুফল পেতে শুরু করেছেন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা। ছাত্র-জনতার বিপ্লব পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, বিশেষ করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিশেষ নির্দেশনায় শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বৈষম্য নিরসনে বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
১. আর্থিক সুবিধা ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন
শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবির মুখে বাড়ি ভাড়া ও উৎসব ভাতায় বড় পরিবর্তন এনেছে বর্তমান সরকার।
বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি: এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের ‘৫০০ বা ১০০০ টাকার বাড়ি ভাড়া’র গ্লানি দূর করে তা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন কাঠামো অনুযায়ী এটি এখন মূল বেতনের নির্দিষ্ট শতাংশে উন্নীত করার প্রক্রিয়া চলছে।
উৎসব ভাতা: আগে শিক্ষকরা মাত্র ২৫% উৎসব ভাতা পেতেন, যা এখন বৃদ্ধি করে ৫০% এ উন্নীত করা হয়েছে। এছাড়া কর্মচারীদের ক্ষেত্রে এটি ৭৫% করার প্রস্তাবনা প্রক্রিয়াধীন।
বৈশাখী ভাতা ও ইনক্রিমেন্ট: বার্ষিক ৫% ইনক্রিমেন্ট এবং বৈশাখী ভাতার নিরবচ্ছিন্ন প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হয়েছে।
২. প্রশাসনিক সংস্কার ও স্বয়ংক্রিয় বদলি ব্যবস্থা
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে ‘স্বয়ংক্রিয় বদলি নীতিমালা-২০২৬’।
দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে বদলির কোনো সুযোগ ছিল না। সরকার এখন একটি বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে অনলাইন বদলি প্রক্রিয়া চালু করেছে, যা শিক্ষকদের নিজ জেলায় ফেরার পথ সুগম করেছে।
প্রতিষ্ঠান প্রধান (অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষক) নিয়োগের ক্ষমতা সরাসরি এনটিআরসিএ-এর অধীনে নেওয়ার মাধ্যমে নিয়োগ বাণিজ্যের পথ বন্ধ করা হয়েছে।
৩. পদোন্নতি ও পদমর্যাদা পুনরুদ্ধার
বিগত সরকারের আমলে শিক্ষকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে তৈরি হওয়া জটিলতা নিরসন করা হয়েছে:
সহকারী অধ্যাপক পদ পুনরুদ্ধার: উচ্চমাধ্যমিক কলেজে ‘সিনিয়র লেকচারার’ পদ বাতিল করে পুনরায় ‘সহকারী অধ্যাপক’ পদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে অভিজ্ঞ শিক্ষকরা তাদের প্রাপ্য মর্যাদা ফিরে পেয়েছেন।
অনুপাত প্রথা বিলোপের পথে: ৫:২ অনুপাত প্রথা বা পদোন্নতির বৈষম্য দূর করে কর্মদক্ষতা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতির নতুন নীতিমালা কার্যকর হয়েছে।
৪. নতুন প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক মাসে কয়েক ধাপে মোট ১,৭১৯টি নতুন স্কুল ও কলেজকে এমপিওভুক্তির প্রাথমিক তালিকায় আনা হয়েছে। এছাড়া ২,৬০০-এর বেশি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এই আওতায় আনার জন্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
৫. অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের সংকট নিরসন
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে সরকার ২,২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এতে করে বছরের পর বছর ঝুলে থাকা অবসর ভাতার আবেদনগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে।
শিক্ষক সমাজের মূল আকাঙ্ক্ষা: জাতীয়করণ
এত সব অর্জনের মাঝেও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের একটিই বড় দাবি এখনো টেবিল রয়েছে— ‘শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ’। শিক্ষক নেতাদের মতে, বর্তমান সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেছে, তার চূড়ান্ত রূপ হতে পারে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আয় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নিয়ে শিক্ষকদের সরকারি মর্যাদা প্রদান করা।
উপসংহার: ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার গত ১৭ মাসে শিক্ষকদের জন্য যা করেছে, তা বিগত ১৫ বছরেও সম্ভব হয়নি। তবে শিক্ষকরা আশা করছেন, একটি পূর্ণাঙ্গ ও বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়তে এই সরকারই জাতীয়করণের শক্ত ভিত্তি স্থাপন করে যাবে।



