চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত ‘বেকার ভাতা’ দেবে বিএনপি: নতুন আশার আলো শিক্ষিত যুবকদের
দেশের শিক্ষিত বেকার যুবকদের দীর্ঘদিনের দাবি ও অভাব অনটন নিরসনে এক যুগান্তকারী ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটি জানিয়েছে, তারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেলে দেশের শিক্ষিত বেকারদের জন্য ‘বেকার ভাতা’ চালু করবে। গত ৩ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে রংপুরে এক কর্মশালায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই পরিকল্পনার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
ভাতার পরিমাণ ও সময়সীমা
বিএনপির নীতি নির্ধারণী পর্যায় এবং নির্বাচনী ইশতেহারের তথ্যানুযায়ী, এই ভাতার বিষয়ে প্রধান পয়েন্টগুলো হলো:
-
শিক্ষিত বেকারদের অগ্রাধিকার: যারা উচ্চশিক্ষা শেষ করেও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন না, প্রাথমিকভাবে তাদের এই ভাতার আওতায় আনা হবে।
-
ভাতার মেয়াদ: তারেক রহমানের ঘোষণা অনুযায়ী, এই ভাতা আপাতত এক বছর (১২ মাস) পর্যন্ত প্রদান করা হবে।
-
কর্মসংস্থান সৃষ্টির চেষ্টা: ভাতা প্রদানের এই এক বছর সময়ের মধ্যে সরকার সংশ্লিষ্ট যুবককে কর্মসংস্থানে যুক্ত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবে। পাশাপাশি বেকার যুবকও নিজের জন্য কাজ খুঁজে নেবেন।
-
পরিমাণ: যদিও নির্দিষ্ট টাকার অঙ্ক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন আলোচনা হয়েছে, তবে বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে একটি সম্মানজনক মাসিক ভাতা নির্ধারণ করা হবে যা দিয়ে একজন শিক্ষিত যুবক তার প্রাথমিক খরচ মেটাতে পারেন। অনেক বিশ্লেষক ও নাগরিক প্ল্যাটফর্ম থেকে এই পরিমাণ মাসিক ১,০০০ থেকে ৩,০০০ টাকার মধ্যে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে, তবে চূড়ান্ত অঙ্কটি সরকারি বাজেটের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে।
কেন এই উদ্যোগ?
দেশের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) তথ্যমতে, বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করার পর দীর্ঘ সময় চাকরির অপেক্ষায় থাকতে হয় বিপুল সংখ্যক তরুণকে। এই সময়ে তাদের আর্থিক ও মানসিক চাপ কমাতে এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ‘বেকার ভাতা’ একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছে বিএনপি।
৩১ দফার অংশ হিসেবে ঘোষণা
উল্লেখ্য যে, বিএনপি ঘোষিত রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফার ২৫ নম্বর দফায় যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বেকার ভাতা প্রদানের এই অঙ্গীকার করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, “বেকারত্ব দূরীকরণের লক্ষ্যে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। শিক্ষিত বেকারদের এক বছর পর্যন্ত বা কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত বেকার ভাতা প্রদান করা হবে।”

দেশে সর্বমোট কত জনকে বেকার ভাতা দেওয়া হবে?
বিএনপি ঘোষিত রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘোষণা অনুযায়ী, দেশে সর্বমোট কতজনকে বেকার ভাতা দেওয়া হবে সে সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা বা তালিকা এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। তবে এ বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে:
১. যোগ্যতা ও লক্ষ্য: বিএনপি প্রাথমিকভাবে দেশের শিক্ষিত বেকারদের এই ভাতার আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে স্নাতক বা উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার। ধারণা করা হচ্ছে, এই উচ্চশিক্ষিত বেকারদের মাধ্যমেই এই কার্যক্রম শুরু হতে পারে।
২. সামগ্রিক বেকারের সংখ্যা: বিবিএস-এর একই জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে মোট বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ ২৪ হাজার। যদি এই কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানো হয়, তবে এই বৃহৎ অংশটি এর আওতায় আসতে পারে। তবে তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যে ‘শিক্ষিত বেকার’ শব্দটি বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
৩. নিবন্ধন প্রক্রিয়া: ভাতা পাওয়ার জন্য শিক্ষিত বেকারদের একটি নির্দিষ্ট ডেটাবেজ বা তালিকার মাধ্যমে নিবন্ধিত হতে হবে। সরকার গঠনের পর এই তালিকা প্রণয়নের কাজ শুরু হবে।
৪. সময়সীমা: প্রতিটি বেকার ব্যক্তিকে কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত অথবা সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত এই ভাতা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
৫. কর্মসংস্থান লক্ষ্যমাত্রা: বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তাদের মূল লক্ষ্য হলো আগামী দেড় বছরের মধ্যে প্রায় ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলে বেকার ভাতার ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমে আসবে।
সারসংক্ষেপ: নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা এখনো ঘোষণা করা হয়নি, তবে দেশের প্রায় ৯ লাখ উচ্চশিক্ষিত বেকারকে লক্ষ্য করে এই প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। চূড়ান্ত সংখ্যাটি নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশের সময় আরও স্পষ্ট হতে পারে।
৩০০০ টাকা হারে প্রতিমাসে ৫০ লক্ষ বেকার কে ভাতা দিতে কত টাকা বার্ষিক বাজেট প্রয়োজন হবে?
প্রতি মাসে ৩০০০ টাকা হারে ৫০ লক্ষ বেকারকে ভাতা দিতে যে পরিমাণ বাজেটের প্রয়োজন হবে তার একটি হিসাব নিচে দেওয়া হলো:
১. মাসিক বাজেট:
৩,০০০$ টাকা *৫০,০০,০০০ জন = ১,৫০০ কোটি টাকা।
২. বার্ষিক বাজেট (১২ মাস):
১,৫০০ কোটি টাকা *১২ মাস = ১৮,০০০ কোটি টাকা।
বিশ্লেষণ:
বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের প্রেক্ষাপটে (উদাহরণস্বরূপ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট প্রায় ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা), এই ১৮,০০০ কোটি টাকা মোট বাজেটের প্রায় ২.২৬%। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় এই পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা একটি উচ্চাভিলাষী কিন্তু বাস্তবায়নযোগ্য লক্ষ্য হতে পারে।
তবে এই বিশাল সংখ্যক মানুষকে ভাতা দেওয়ার পাশাপাশি তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।


