ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ । সংবিধান ও রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো। গত জুলাই-আগস্টের সফল গণঅভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন দেশের রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের লক্ষ্যে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ প্রকাশ করেছে । ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোটের আলোচনার ভিত্তিতে প্রণীত এই সনদে সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ এবং দুর্নীতি দমন ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কারের জন্য মোট ৮৪টি সুপারিশের উপর বৃহত্তর ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ।
পটভূমি ও কমিশন গঠন
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ১৬ বছরেরও বেশি সময়ের ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দোসররা ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান । জনগণের বিজয়ের ফলস্বরূপ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয় । রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে ছয়টি কমিশনের সুপারিশ বিবেচনার লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সভাপতি করে ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ তারিখে ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’ গঠিত হয় । এই কমিশন ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে এবং পরবর্তীতে ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে মোট ৭২টি বৈঠকে মিলিত হয় ।
মূল সাংবিধানিক সংস্কারসমূহে ঐকমত্য
সনদে সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনার বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে:
-
প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদসীমা: একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন ।
-
সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া: সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদের নিম্নকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে ।
-
গণভোটের মাধ্যমে মৌলিক পরিবর্তন: প্রস্তাবনাসহ সুনির্দিষ্ট কিছু অনুচ্ছেদ (যেমন ৮, ৪৮, ৫৬, ১৪২ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা) সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের প্রয়োজন হবে ।
-
৭ক ও ৭খ অনুচ্ছেদ বিলুপ্তি: সংবিধান বিষয়ক অপরাধ ও সংবিধান সংশোধনের সীমাবদ্ধতা বিষয়ক বিদ্যমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ক এবং ৭খ বিলুপ্ত করা হবে । (২৯টি রাজনৈতিক দল ও জোট এই বিষয়ে একমত) ।
-
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও ক্ষমতা বৃদ্ধি: রাষ্ট্রপতি আইনসভার উভয় কক্ষের সদস্যদের গোপন ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্বাচিত হবেন । এছাড়া, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই রাষ্ট্রপতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, প্রধান তথ্য কমিশনার, বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ও বিইআরসি-সহ ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও সদস্যদের নিয়োগ দিতে পারবেন ।
নাগরিকত্ব, মূলনীতি ও জরুরি অবস্থা
-
নাগরিকের পরিচয়: বিদ্যমান সংবিধানের ৬(২) অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপন করে বাংলাদেশের নাগরিকদের পরিচয় ‘বাংলাদেশি’ বলিয়া পরিচিত হওয়ার বিধান যুক্ত হবে । (২৯টি দল একমত) ।
-
রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি: সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অংশে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি’ যুক্ত করার বিষয়ে ২৪টি রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে ।
-
জরুরি অবস্থা ঘোষণা: জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষেত্রে ‘অভ্যন্তরীণ গোলযোগ’ শব্দের পরিবর্তে ‘রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি হুমকি বা মহামারি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত হবে । জরুরি অবস্থা ঘোষণার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতিস্বাক্ষরের পরিবর্তে মন্ত্রিসভার অনুমোদন প্রয়োজন হবে ।
-
নাগরিক অধিকার অলঙ্ঘনীয়: জরুরি অবস্থাকালীন নাগরিকের ‘জীবনের অধিকার’ এবং ‘বিচার ও দণ্ড সম্পর্কে সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে বর্ণিত মৌলিক অধিকারসমূহ’ খর্ব করা যাবে না ।
ঐকমত্য সনদ ঘোষণা
অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল ও জোটের প্রতিনিধিরা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের বীর শহীদ ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই সনদকে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং এই সনদে ঐকমত্যে উপনীত হওয়া কাঠামোগত, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছেন ।

জুলাই সনদের কত টুকু বাস্তবায়ন হয়েছে এখনও পর্যন্ত?
জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ (July National Charter 2025) বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে সনদের প্রধান ও কাঠামোগত সংস্কারগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়নের জন্য গণভোটের ফলাফলের ওপর নির্ভর করতে হবে।
আপনার তথ্যানুযায়ী এবং সাম্প্রতিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিম্নরূপ:
১. সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি স্থাপন
জুলাই সনদের সাংবিধানিক সংস্কার সংক্রান্ত অংশ বাস্তবায়নের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপটি নিয়েছে।
-
বাস্তবায়ন আদেশ জারি: রাষ্ট্রপতি কর্তৃক গত ১৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়েছে এবং এর গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। এটি সনদের সাংবিধানিক সংস্কারগুলোর আইনি ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
২. গণভোটের প্রস্তুতি
সনদে বর্ণিত মৌলিক সাংবিধানিক পরিবর্তনগুলো কার্যকর করতে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার অনুমোদন প্রয়োজন, তাই গণভোট অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
-
একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট: প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণা করেছেন যে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই এই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন এবং গণভোট ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে একই দিনে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
-
গণভোটের প্রশ্ন: গণভোটে একটি একক প্রশ্নের মাধ্যমে জনগণের মতামত চাওয়া হবে:
“আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন? (হ্যাঁ/না)”
-
গণভোট অধ্যাদেশ অনুমোদন: গত ২৫ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে উপদেষ্টা পরিষদ ‘গণভোট অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর খসড়াটি চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। এই অধ্যাদেশে গণভোট পরিচালনার বিস্তারিত পদ্ধতি ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
৩. বাস্তবায়ন আদেশের তাৎক্ষণিক কার্যকর অংশ
বাস্তবায়ন আদেশের কিছু অনুচ্ছেদ অবিলম্বে কার্যকর করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে:
-
তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা ও নির্বাচন কমিশন গঠন: জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন গঠন সংক্রান্ত বিধানাবলী অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে।
-
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন (শর্ত সাপেক্ষে): আদেশে বলা হয়েছে যে গণভোটে ইতিবাচক ফল এলে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। এই পরিষদ নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত হবে এবং সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনে ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। এই পরিষদ সংবিধান সংস্কারের কাজ ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করবে।
৪. কাঠামোগত সংস্কারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
জুলাই সনদের অধিকাংশ মূল ও কাঠামোগত সংস্কার, যেমন:
-
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমাবদ্ধ করা।
-
সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষ ও গণভোটের শর্ত যুক্ত করা।
-
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ক্ষমতা।
-
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট (Bicameral) সংসদ প্রতিষ্ঠা (নিম্নকক্ষ ও ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ)।
এগুলো সবই গণভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে এবং পরবর্তীতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ কর্তৃক সংবিধান সংশোধন সম্পন্ন হওয়ার পরই চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত হবে। গণভোটে এই প্রস্তাবনাগুলো অনুমোদিত হলে সংস্কারের পথ সুগম হবে।
সারসংক্ষেপ:
এখন পর্যন্ত, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন মূলত প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি ভিত্তি তৈরি করার স্তরে রয়েছে। সনদের মূল সংস্কারগুলো জনগণের সম্মতির অপেক্ষায় আছে, যা আসন্ন গণভোটের মাধ্যমে চূড়ান্ত হবে।


